মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯, ০৬:৫৩ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :

ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলের অবাদি জমি

ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলের অবাদি জমি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইটভাটায় গিলে খাচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলের উর্বর ফসলি জমি। এছাড়া ভাটায় পুড়ছে কাঠ ও নিম্নমানের কয়লা। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অননুমোদিত ভাটায় চালু রয়েছে এই অঞ্চলে। এতে পরিবেশ দুষণ ছাড়াও নষ্ট হচ্ছে ফসলের ক্ষেত, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন হাজারো কৃষক।

এনিয়ে কঠোর অবস্থানে পরিবেশ অধিপ্তর। নিয়মিত অভিযানে নেমে জেল-জরিমানাও হচ্ছে বিধি ভঙ্গকারীদের। তবে ভাটা মালিকরা বলছেন, তারা সব প্রক্রিয়া মেনে বৈধভাবে ভাটা চালাতে চান।
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইটভাটা রয়েছে ৩৭৫ টি। এর মধ্যে ২১৭টি পরিবেশবান্ধব। এর বাইরেও শতাধিক অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে।

এগুলোর বেশিরভাগই গড়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। নাটোরের ইটভাটাগুলোর অধিকাংশই আধুনিক। পর্যায়ক্রমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি চালু হচ্ছে রাজশাহীর ভাটাগুলোতেও।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে ১৯৫টি, নাটোরে ১০৩টি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৩৯টি ইটভাটা রয়েছে। এর বাইরে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের আরেক জেলা নওগাঁয় ইটভাটা রয়েছে ২৭০টি। তবে এই ইটভাটার কতগুলো পরিবেশবান্ধব তার তথ্য নেই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে।
কৃষি দপ্তর আরো জানিয়েছে, রাজশাহীতে ৩২৫ হেক্টর, নওগাঁয় ৪৭০ হেক্টর, নাটোরে ৪০৫ হেক্টর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৩০ হক্টর কৃষি জমিতে ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এর আগে ২০১৭ সালে এই চার জেলায় এক হাজার ৬১৬ হেক্টর কৃষিজমি ইটভাটা দেখানো হয়। এই অঞ্চলে মোট আবাদি জমি ১৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩২ হেক্টর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে উঠেছে উর্বর ফসলি জমিতে। শুকনো মৌসুমে যেসব বিলে পানি থাকে না, সেসব বিলের ফসলি জমিতে ইটভাটা গড়ে উঠেছে বা উঠছে। অবৈধ পুকুর খনন করে সেই মাটি চলে যাচ্ছে ভাটায়। এতে ফসলি জমি কমছে, চাপ পড়ছে কৃষির ওপর। জলাবদ্ধতা তৈরী হয়ে ঘটছে ফসলহানি। লোকালয় ইটভাটা গড়ে ওঠায় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ।

পরিবেশ অধিদদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাকুল্যে চারদিনে ১৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এতে বিভিন্ন বিধি ভঙ্গের দায়ে জরিমানা আদায় হয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা। এরপর ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ১৩ অভিযানে ২২টি মামলা হয়। আদায় করা হয় ৭ লাখ ৮২ হাজার টাকা জরিমানা।

গত নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবারের ইট পোড়ানোর মৌসুম। কিন্তু নির্বাচনের কারণে জোরালো অভিযানে নামতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। তবে ১৫ নভেম্বর জেলার তানোরে দুটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমান আদালত।

এরপর ২১ জানুয়ারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের সদরের ভবানীপুর এলাকার হিরো ব্রিকস, ২৯ জানুয়ারী একই উপজেলার মেসার্স নোভা ব্রিক্স ও মেসার্স তাজ ব্রিক্স এবং ১ ও ৬ ফেব্রুয়ারী জেলার বাগামারার অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালানো হয়।

চার দিনের এই অভিযানে সবমিলিয়ে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় হয়। একই সাথে প্রতিটি ভাটার অবৈধ ড্রাম চিমনী গুড়িয়ে দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। এই ইটভাটার প্রত্যেকটিতে কাঠ পোড়ানোর প্রমাণ মিলেছে।

কয়েক দফা চেষ্টা করে রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মামুনুর রশীদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সেখানকার জুনিয়র কেমিস্ট রফিকুল ইসলাম বলেন, কঠোর নজরদারির পর পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়া হয়। ছাড়পত্র পাওয়া ভাটাগুলোতেও চলে নিয়মিত নজরদারি। যারা বিধি ভাঙছে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জনস্বার্থে এই অভিযান চলমান।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন জানান, ইটভাটার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে এই অঞ্চলের ফলচাষে। ভাটা থেকে নির্গত ছাই ও বস্তুকণা গাছের পাতার পত্ররন্ধন বন্ধ করে দিচ্ছে। এতে ব্যহত হচ্ছে উদ্ভিদের শ্বষণ প্রক্রিয়াকে। নির্গত ছাই নষ্ট করছে ফল ও ফসলের রেণু। ফলে উৎপাদন কমছে মারাত্মকভাবে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল ইসলাম। যদিও কৃষি দপ্তরের অনুমতির পরই গড়ে উঠছে উঠভাট। এই বিষয়ে জানতে চাইলে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, নাবাদি কিংবা এক ফসলি জমিতে ইটভাটা নির্মাণ করা যায়।

অনেক সময় ভাটা মালিকরা জমি কিনে নিয়ে কয়েক বছর অনাবাদি ফেলে রাখছেন। পরে তা অনাবাদি দেখিয়ে ছাড়পত্র নিচ্ছেন। ভাটা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় কৃষি দপ্তরের কিছুই করার থাকেনা বলে স্বীকার করেন তিনি।

তবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ এবং জটিল হওয়ায় তারা ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি শফিকুল আলম। তার দাবি, মোটা বিনিয়োগের পর পুরো প্রক্রিয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। আর এ জন্যই অনেকেই ইটভাটা চালু করছেন। যদিও অনেকেই এই প্রক্রিয়াতে নিবন্ধন পেয়েছেন। সব প্রক্রিয়া মেনে বৈধভাবে তারা ব্যবসা করতে চান বলেও জানান এই ইটভাটা মালিক।


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com