মঙ্গলবার, ২০ অগাস্ট ২০১৯, ০৪:৫৮ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে রাজি করাতে চেষ্টা করবে চীন

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে রাজি করাতে চেষ্টা করবে চীন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে রাজি করাতে চেষ্টা ও দ্রুত প্রত্যাবাসনে তাগাদা দেবে চীন। দেশটিতে সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের মধ্যে বৃহস্পতিবার এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বেইজিং এ আশ্বাস দেয়।

 

 

বেইজিংয়ে এদিন উভয় নেতার উপস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিতরণে উন্নয়নসহ দুই দেশের মধ্যে ৯টি চুক্তি ও স্মারক সই হয়। এছাড়া ঋণচুক্তির শর্ত সহজ করার বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে চীন। বাংলাদেশে দেশটিকে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

 

 

বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত সমাধানে শেখ হাসিনার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। বরাবরের মতো বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কেকিয়াং বলেন, চীন এই সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে।

 

 

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক চীনের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ে চীনের বন্ধু। আমরা এর আগে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দুই দেশকে সহায়তা করেছি এবং আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।

 

 

চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কেকিয়াং উল্লেখ করেন, চীন তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দু’বার মিয়ানমারে পাঠিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনে আমরা আবারও আমাদের মন্ত্রীকে মিয়ানমারে পাঠাব।

 

 

শহীদুল হক বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হচ্ছে। তিনি বলেন, যতই সময় যাবে এই সমস্যা ততই বড় আকার ধারণ করবে এবং এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন।

 

 

কেন রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চায় না? উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারকে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু করার নেই।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবার্তনে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা করেছে। আমরা এ ব্যাপারে সব ধরনের প্রয়াস চালাচ্ছি। কিন্তু রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে চায় না। কারণ তারা শঙ্কিত যে, তাদের ওপর আবারও নৃংশসতা চালানো হবে। এই শঙ্কা দূর করতে এবং রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে, মর্যাদা ও নিজস্ব পরিচয়ে নিজ দেশে ফেরত যেতে পারে সেজন্য অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে চীনের ভূমিকা পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন শেখ হাসিনা।

 

 

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জমি-সম্পত্তির ওপর অবশ্যই তাদের অধিকার থাকতে হবে। শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার দেশ এটা বুঝতে পেরেছে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা সংকটে মানবিক সাড়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

 

 

পররাষ্ট্র সচিব জানান, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সাধারণভাবে পাঁচটি বিষয়ের ওপর অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো হল অর্থনৈতিক বিকাশ এবং বাণিজ্য, প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিষয়, বিসিআইএম বা যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভিসা সংক্রান্ত এবং রোহিঙ্গা ইস্যু।

 

 

তিনি জানান, চীনা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। লি কেকিয়াং বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মূল্যবান বলে মনে করি এবং এটি আরও উচ্চ স্তরে নিতে চাই। আমাদের মাঝে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, আমরা আশা করি, এই সম্পর্ক আগামীতে আরও গভীর ও জোরদার হবে।

 

 

এ সময় চীনা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকার এবং এ ব্যাপারে চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের কল্যাণে তার সরকার শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আলোচনার শুরুতে চীনা প্রধানমন্ত্রী চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান।

 

 

অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রসঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জবাবে শেখ হাসিনা একই সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে তা দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, চীনের উচিত বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করা এবং ফিরতি ক্রয়ের গ্যারান্টিসহ আরও কলকারখানা গড়ে তোলা। বাংলাদেশ ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনকে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

 

 

এ প্রসঙ্গে লি কেকিয়াং বলেন, তারা ভারসাম্যহীন বাণিজ্য সম্পর্ক চান না এবং বাণিজ্য বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করবেন বলে আশ্বাস দেন। বর্তমানে ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্য চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে উল্লেখ করে কেকিয়াং বলেন, তারা বাকি ৩ শতাংশ পণ্যের শুল্কও ছাড় দেয়ার চেষ্টা করবে। তিনি বলেন, চীন নিবিড়ভাবে এফটিএ সম্ভব সমীক্ষার ফল মনিটর করছে।

 

 

প্রকল্প বাস্তবায়ন ইস্যু প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকালে ঢাকা বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশকিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেন। তিনি এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া গতিশীল করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

 

প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রতি ঋণচুক্তির শর্তাবলী সহজ করার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সঠিক সময়ে তহবিল ছাড়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন বিষয়টি বিবেচনা করবে। শেখ হাসিনা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়ন, জলবায়ু অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপন এবং তিস্তা নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পদ সংগ্রহে চীনের সহযোগিতা কামনা করেন। এছাড়া তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দ্রুতগামী ট্রেন যোগাযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া গতিশীল করতেও চীনের সহায়তা কামনা করেন।

 

 

ভিসা ইস্যু প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ‘অন অ্যারাইভেল ভিসা’ ব্যবস্থার আওতায় চীনের নাগরিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভিসা প্রদান করে থাকে। কিন্তু চীন ভ্রমণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের একই সুবিধা দেয়া হয় না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চীন বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী বিশেষ করে ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করবে। বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর প্রসঙ্গে দুই প্রধানমন্ত্রী এ অঞ্চলের বাজারগুলোকে সংযুক্ত করতে এর গুরুত্ব ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, উভয় দেশ বিসিআইএম করিডর দ্রুত বাস্তবায়নে সম্মত।

 

 

ব্রিফিংকালে চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. ফজলুল করিম ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ লেখক মো. নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের সময় বাংলাদেশ পক্ষে অটিজম অ্যান্ড নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারসের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. ফারুক খান উপস্থিত ছিলেন।

 

 

বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব পিপল’-এ বৈঠক শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে ৯টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। উভয় দেশের মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এতে সই করেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য সাহায্য সংক্রান্ত এলওসি। এর আওতায় মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য চীন ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করবে।

 

 

বাকি চুক্তি ও স্মারকগুলো হল- সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পর্যটন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা স্মারক, ইয়ালু ঝাংবো ও ব্রহ্মপুত্র নদের তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্র্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট, বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি, ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমঝোতা স্মারক, পিজিসিবি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যুৎ গ্রিড নেটওয়ার্ক জোরদার প্রকল্পের জন্য ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্র্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন এগ্রিমেন্ট, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্র্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ নিয়ে প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট লোন এগ্রিমেন্ট।

 

 

 

এর আগে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব পিপলে পৌঁছলে তাকে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা জানানো হয়। বেলা ১১টায় সেখানে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। পরে সেখানে তার সম্মানে লি কেকিয়াং আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন শেখ হাসিনা।

 

 

দি গ্রেট হল অব পিপল বেইজিংয়ের তিয়েন আনমেন স্কয়ারের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি সরকারি ভবন। এটি চীন সরকার এবং শাসক চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আইন প্রণয়ন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রসঙ্গত, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভায় যোগদানসহ চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ দিনের সফরে দেশটিতে যান।


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com