বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:১৪ পূর্বাহ্ন

দক্ষ প্রযুক্তির ক্যাপটিভ চালু রাখা হবে

দক্ষ প্রযুক্তির ক্যাপটিভ চালু রাখা হবে

নিউজ ডেস্ক: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘যদি ব্যবসায়ীরা ইফিশিয়েন্ট ওয়েতে এনার্জি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে তাহলে আমরা সেগুলো চালু রাখব। সেসব ক্যাপটিভে ২৪ ঘণ্টা গ্যাস দেব।’ শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহের লক্ষ্যে শনিবার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত ব্যবসায়ী নেতাদের সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি আছে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অধিকাংশ সময় ব্যবসায়ীরা সেই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। দিনে কমপক্ষে ২ ঘণ্টা অধিকাংশ জায়গায় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে করে তাদের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক জায়গায় আরও বেশি সমস্যা আছে। এসব সমস্যার সমাধানে দ্রুত একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হচ্ছে।’

এদিকে সভা শেষে কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা যুগান্তরকে বলেন, বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সভায় ক্যাপটিভ পাওয়ারের ব্যাপারে সরকারের আগের অবস্থান পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। যারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তারা ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট করতে চাইলে শিল্পের স্বার্থে তাদের অনুমতি দেয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী সভায় আরও বলেন, গ্যাস সংযোগের জন্য কেন ব্যবসায়ীদের মন্ত্রণালয়ে আসতে হয়, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস বা বিদ্যুৎ কেন সরবরাহ করা যাচ্ছে না, ইভিসি মিটার কেন পায় না, বিষয়গুলো উভয়পক্ষ বসেই সমাধান করা সম্ভব। এজন্য বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (ইপিআরসি) চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার (শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির) সমন্বয়ে একটি কমিটি করা হবে। এ কমিটিই বিদ্যমান অসঙ্গতি, সম্ভাব্য সমাধান বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন এবং মানসম্পন্ন সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে শিল্পমালিকদের মধ্যে। এ সমস্যা নিরসনে দফায় দফায় আলোচনা এবং আশ্বাস পেলেও সমাধান মেলেনি। শিল্প-কারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান এবং লোড বৃদ্ধিতে ২০১১ সালে জ্বালানি উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। মে মাসে ওই কমিটি বাতিলের পর শনিবারের সভায় আরও বড় পরিসরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা নিরসনে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের ঘোষণা এলো।

ব্যবসায়ী নেতাদের সভায় নসরুল হামিদ বলেন, ২ সপ্তাহের মধ্যে এ কমিটি গঠন করা হবে। ২ মাসের মধ্যে কমিটিকে সরকারের কাছে সুপারিশ উপস্থাপন করতে হবে। এরপর ৮ থেকে ১০ মাসের মধ্যে সরকার সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে। তিনি জানান, বিইপিআরসির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার (শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির) সমন্বয়ে গঠিত কমিটি বিদ্যমান অসঙ্গতি, সম্ভাব্য সমাধান বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে।

জানা গেছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শিল্পমালিকরা নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। এতে গ্রিডের অনেক বিদ্যুৎ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এ নিয়ে এখন সরকারের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সরকার দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে শিল্পে এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে সংকট সামাল দেয়া সহজ হতো। কিন্তু দেশব্যাপী দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে বিতরণ কোম্পানিগুলো শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারছে না।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আগামী ১০ বছরেও এ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ঠিক করা সম্ভব হবে না। সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের অবস্থা এতটাই খারাপ যে একটু ঝড়-বৃষ্টি হলেই লাইন ট্রিপ (গ্রিড স্টেশনের সার্কিট পড়ে যাওয়া) করে। গাছের ডালপালার আঘাত, এমনকি ছোটখাটো পাখির ডানা ঝাপটানোয়ও ট্রিপ করছে গ্রিড লাইন। এ কারণে ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা চাইছেন। এটি এখনও সরকারের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা এবং বড় শিল্পমালিকদের সঙ্গে শনিবার আলোচনায় বসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

সভায় টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, শিল্পে যে ধরনের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে তা নিরবচ্ছিন্ন ও কোয়ালিটিসম্পন্ন নয়। ভোল্টেজ আপ-ডাউন ও লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ রফতানি কাজে ব্যবহৃত মেশিনগুলো খুবই সংবেদনশীল। ভোল্টেজ আপ-ডাউনের কারণে অনেক ডিভাইস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি মেশিনে ব্যবহৃত কোটি কোটি টাকার কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তথ্য-উপাত্তসহ এসব বিষয় জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার নজরে আনা হয়। পিডিবি এবং আরইবি এ বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেনি। তারাও এ বাস্তব সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। এ সমস্যা সমাধানে দুই সচিব, উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি ছোট কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ক্যাপটিভ পাওয়ারের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে। আমাদের বলা হয়েছে, যারা ক্যাপটিভ চায় তাদের অনুমতি দেয়া হবে। তাছাড়া গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্যাপটিভে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ১১-১২ সেন্ট বেশি হচ্ছে, সেটা দেখানো হয়েছে।

এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি একে আজাদ বলেন, অন্য দেশের তুলনায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম যে বেশি তা সভায় তুলে ধরা হয়েছে। তারপরও গ্যাস সংযোগ পেতে অনেক হয়রানি হতে হয়। অনেক আগের সিস্টেমে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হচ্ছে। এটা আধুনিকায়ন করা দরকার। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি যুক্তিসঙ্গত নয়, সেটা সরকারকে জানিয়েছি। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগী সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে রফতানি খাত।

তিনি আরও বলেন, এমনিতেই সরকার শিল্পের গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। বাধ্য হয়েই উদ্যোক্তারা ক্যাপটিভ জেনারেটর ব্যবহার করছেন। ক্যাপটিভে গ্যাসের দাম যে পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে তা বয়লারের চেয়ে বেশি। উদ্যোক্তারা তো ইচ্ছে করে ক্যাপটিভ চালান না। এক দিনে কত ঘণ্টা, কত মিনিট লোডশেডিং হয়, সেগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। লোডশেডিং বন্ধ না করে ক্যাপটিভে গ্যাসের দাম যেন না বাড়ানো হয় সেজন্য অনুরোধ করা হয়েছে। যেটা বাড়ানো হয়েছে সেটা যুক্তিসঙ্গতভাবে সমন্বয় করার অনুরোধ জানিয়েছি। আর শিল্পের ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানো ও ডলারের দাম শিল্পের জন্য সহায়ক পর্যায়ে রাখতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ফয়সাল সামাদ বলেন, সভায় শিল্পের বিদ্যমান গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা তুলে ধরা হয়। লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় নিরবচ্ছিন্ন ও গুণগত গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। এ সংকটের সমাধান করে কিভাবে উৎপাদন খরচ কমানো যাবে সেটিও বলেছি।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরী (বীর বিক্রম) বলেন, শিল্পোদ্যোক্তাদের ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী হতে হবে। এজন্য কেন্দ্রগুলোকে কো-জেনারেশন বা ট্রাই-জেনারেশন অর্থাৎ কেন্দ্রগুলো থেকে যে তাপ নির্গত হবে সেই তাপ পুনর্ব্যবহার করতে হবে। এজন্য তিনি একটি কমিটি গঠন করে মানোন্নয়নের নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্টদের। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক কোম্পানিতে হ্যাপিনেস ডেস্ক থাকা উচিত। চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করতে পারলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আরও বিকশিত হবে।

অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমরা ২৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ দিতে চাই। সেজন্য কাজ করা হচ্ছে। তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে আমরা আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রামে কিছু সমস্যা দেখছি। এখনও সেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার, যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে অনেকখানি সহায়ক হবে। এছাড়া সরকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এতে দুই-তিন বছরের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যাবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ জ্বালানির মূল্য সম্পর্কে আগাম ধারণা চেয়েছেন। কিভাবে এ ধারণা দেয়া যেতে পারে- তা নিয়ে চিন্তা করছি। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখন সরকারি- বেসরকারি মিলিয়ে চার হাজার কোটি টাকার গ্যাসের বিল বকেয়া রয়েছে। এ বকেয়া পরিশোধে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে সরকার। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো আমাদের আশ্বস্ত করেছে বকেয়া বিল পরিশোধে তারা সহযোগিতা করবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পক্ষ থেকে বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। ব্যবসায়ী নেতারা এ সময় গ্যাস সংযোগে দীর্ঘসূত্রতা, ঘন ঘন গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, ইভিসি মিটার না দেয়া, ২৪ ঘণ্টার পরিবর্তে ১৬ ঘণ্টা গ্যাস দেয়া, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়াসহ নানা বিষয়ে অভিযোগ তুলে ধরেন।

ইপিআরসির চেয়ারম্যান সুবীর কিশোর চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রাহমাতুল মুনিম, বিডার চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বিটিএমএ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন, বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফয়সাল সামাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

©2014 - 2019. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com