বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ০৯:০৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের এমডিজি ও অন্যান্য সাফল্যের কাহিনী – ড. আব্দুল মোমেন

বাংলাদেশের এমডিজি ও অন্যান্য সাফল্যের কাহিনী - ড. আব্দুল মোমেন

গোড়ার কথা: ২০১৫ সাল বিশ্ব নেতৃত্ব ও জাতিসংঘের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনাবহুল বছর বিশেষ। নানা কারণে এ বছরটি বৈশ্বিক ইতিহাসের এক স্মরণযোগ্য অধ্যায়। এ বছর জুড়ে আমরা দেখেছি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভয়াবহ উগ্র মৌলবাদী জঙ্গী হামলায় সিরিয়া-ইরাক এবং আফ্রিকার উল্লেখ্যযোগ্য অংশ জুড়ে মানবতার অবমাননা, প্রত্মতাত্ত্বিক পুরকীর্তি ধ্বংস, ইউরোপ-আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা, ভয়াবহ অভিবাসী সংকট, চীনের জিডিপির আকস্মিক উত্থান-পতন । আবার ঠিক তেমনি এ বছরেই আমরা দেখেছি দক্ষিণ এশিয়ার এক উন্নয়নকামী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি। বৈশ্বিক মন্দার মাঝেও জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬.৩ শতাংশের উপরে থাকার বিষ্ময়কর চমক। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জনের ক্ষেত্রে দেশটির সাফল্য কেবল দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, সারা বিশ্বে প্রসংশিত হয়েছে। এসবের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সর্বশেষ প্রমাণ – মাত্র কয়েকদিন আগেই (২০১৫’র ১৩ অক্টোবর) জাতিসংঘ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ভূষিত করলো অত্যন্ত সম্মানজনক Champions of the Earth পুরস্কারে। এছাড়াও, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স ইউনিয়ন তাঁকে আই.টি.ইউ. পুরস্কারে সম্মানিত করবে “ডিজিটাল বাংলাদেশ” -এর জন্য। সাবাশ বাংলাদেশ, জয়তু বাংলাদেশের জনগণের নেতা শেখ হাসিনা।

এ বছরের জুলাই মাসে ‘আদ্দিস আবাবা এ্যাকশন এডেন্ডা’ (Addis Ababa Action Agenda – AAAA) গৃহীত হয় এবঙ জাপানের সেন্দাইতে বৈশ্বিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকরণ কন্ফারেন্স আয়োজিত হয়েছে এবং এ বছরেই প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তনের আবশ্যক বিধিমালা প্রণীত হতে চলেছে।

বাংলাদেশসহ আরও বেশ কিছু দেশের সাফল্যগাঁথার উপর ভর করেই জাতিসংঘ আগামী ২৫-২৭ সেপ্টেম্বর গৃহীত ২০১৫-উত্তর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goals – SDGs) গ্রহণ করতে চলেছে। এই লক্ষ্যমাত্রার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরও জনবান্ধব, পরিবেশ বান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমতাভিত্তিক শান্তি ও উন্নয়ন সকলের জন্য সমতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যেখানে কেউই পিছিয়ে থাকবে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ২০১২ সালে জাতিসংঘে উপস্থাপিত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ (‘Peoples Empowerment’) মডেলের মূল প্রতিপাদ্যও কিন্তু ছিলো তা-ই। একথা আজ বিশ্ববিদিত যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ মডেলকে জাতিসংঘের সকল সদস্যরাষ্ট্র ঐকমত্যের ভিত্তিতে ২০১২ সালে সাধারণ পরিষদে গ্রহণ করেছে।

সরকার গৃহীত উন্নয়ন নীতিমালার আলোকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন ২০১০ সালে Ô4-P StrategyÕ গ্রহণ করে। এগুলো হচ্ছে – জাতীয় স্বার্থের প্রথমতঃ সুরক্ষা (Protection), দ্বিতীয়তঃ সম্প্রসারণ (Promotion), তৃতীয়তঃ বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রদান (Providing global leadership), এবং চতুর্থতঃ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন (help achieving global Peace)। আমাদের এ নীতিমালার পর আমারা দেখতে পাই জাতিসংঘ Ô5-P Strategy’ বা পঞ্চ-পি কৌশল গ্রহণ করেছে – যেগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১. মানুষ (People), ২. পৃথিবী (planet), ৩. শান্তি (Peace), ৪. সমৃদ্ধি (Prosperity) এবং ৫. অংশীদারিত্ব (Partnership)। এই পঞ্চ-পি কৌশলের সবগুলোরই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (Sustainable Development Goals – SDGs) ১৭টি লক্ষ্যের এবং সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৬৯টি লক্ষ্যের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত বাংলাদেশ।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDG) মূলতঃ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য হলেও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা Sustainable Development Goals (SDGs) সকল দেশের জন্য প্রযোজ্য। তবে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ নয় – বজ্রকঠিন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, যথাযথ অংশীদারিত্ব এবং সকলের ব্যাপক সহযোগিতা এজন্য একান্ত আবশ্যক। তা সম্ভব না হলে এ অধরা, আনফিনিশড্ এজেন্ডা-ই থেকে যাবে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় অংশীদারিত্বের সাথে জড়িত আটটির অষ্টমটির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী অগ্রগতি ছিল দুর্বল। মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নের কোন স্বয়ংসম্পূর্ণ মেকানিজম না থাকায় তা পূর্ণাঙ্গরূপে (বিশ্বব্যাপী) বাস্তবায়িত হয়নি। সুতরাং ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী সুসংহত অংশীদারিত্বের উপর সবচাইতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। লক্ষ্যমাত্রাগুলোর বাস্তবায়ন করবে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো। এজন্য প্রয়োজন হবে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার (বিলিয়ন নয়)। এমডিজি’র বেলায় বিলিয়ন ডলারই ছিলো যথেষ্ট। তাই এক্ষেত্রে সম্পদের বহুমূখী উদ্ভাবনী ব্যবহার এবং প্রযুক্তির উদ্ভাবনী বিনিময় নিশ্চিত করা জরুরী। এছাড়াও দক্ষিণ-দক্ষিণ দেশগুলোর উন্নয়ন সম্বভাবনার সদ্ব্যাবহার করা প্রয়োজন। ২০১২ সালে এই সাউথ-সাউথ দেশগুলোই বিশ্ব জিডিপি’র অর্ধেকের যোগান দিয়েছে এবং এ সময়ের মধ্যে তাদের বাণিজ্য দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ-দক্ষিণের এ দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির অর্ধেক, তাদের রিজার্ভের পরিমাণ ৬.১ ট্রিলিয়ন ডলার, বিশ্ব বাণিজ্যের ৪৭ শতাংশ সম্পাদিত হয় এ দেশগুলোর দ্বারা এবং ২০১৫ সালে তাদের মোট ভোগকৃত পণ্যের মূল্য ৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। তাই সুসংবদ্ধভাবে দক্ষিণ-দক্ষিণ দেশশুলোর জটিল ইস্যুগুলোর দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। এ মানসে এবং টেকসই লক্ষ্যমাত্রার সঠিক পর্যবেক্ষন ও বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ২০১৫ সালের ১৭-১৮ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-সাউথ সহযোগিতা সংক্রান্ত জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠকে অর্থ ও উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রীদের ফোরাম গঠনের প্রস্তাব করে। এর ফলো-আপ হিসেবে গত ২৫-২৬ আগস্ট ২০১৫ গণচীনের ম্যাকাউয়ে উচ্চ পর্যাযের স্টেকহোল্ডার মিটিং অনুষ্ঠিত হয় যাতে সভাপতিত্ব করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সাফল্যগাঁথা:

বিশ্বব্যাপী এমডিজি অর্জনের এসকল চিত্রের মধ্যে আশার কথা এবং ব্যতিক্রম হচ্ছে বাংলাদেশ। ১৬০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী, সর্বাধিক ঘনত্বের জনবসতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার ক্ষেত্রে অতি সীমিত সম্পদের দেশ, বিশ্বের সর্ববৃহ স্বল্পোন্নত দেশ, বাংলাদেশ। তবে সেই দেশই আজ সহ¯্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা উন্নয়নে বিশ্বের চমক। একসময়ে পশ্চিমা বিশ্বের পন্ডিতেরা যাকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে দেশটি টিকবে কি না সেই প্রশ্ন তুলে ব্যাঙ্গ করেছিলো, সেই সমালোচনা আর ভ্রুকুটির উচিত জবাব দিয়ে আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রগাঢ়, বিচক্ষণ ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ দারিদ্র্য দূরীকরণে শুধু সফলই হয়নি, ১৯৯১ সালের ৫৭.৬% থেকে তা ২০১৫তে ২৪.৪% এ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, যা পৃথিবীর অনেক দেশের পক্ষেই ব্যাপক ভাবনার বিষয়। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নানাবিধ সামাজিক সুরক্ষামূলক কার্যক্রমের দ্বারা বাংলাদেশ এ অর্জনে সক্ষম হয়েছে। দারিদ্র্যের আনুপাতিক হার ১৮.৫% থেকে ৬.৫% এ নেমে এসেছে। বর্তমানে অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মােট জনসংখ্যার ১২% যা ২০২১ সালের মধ্যে শূন্যতে নেমে আসবে বলে বাংলাদেশ আশা করে। জাতিসংঘের এসডিজি’র বহু আগেই বাংলাদেশ এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী।

সমতার ভিত্তিতে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে (এমডিজি-২)। স্কুলে ভর্তিও নীট হার বেড়ে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ঝড়ে পড়ার হারও কমেছে । এখন ছেলেদের তুলনায় বেশি মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। কন্যাশিশুদের স্কুলে যাওয়া নিশ্চিতকরণে সরকারের নানাবিধ উদ্যোগের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সবগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করেছেন (শুধু ২০১৩ সালেই ২৬,১৯৩টি স্কুল সরকারী করা হয়েছে)। সেই সাথে ১লক্ষ ৪ হাজার ৭৭৬ জন প্রাথমিক শিক্ষকের চাকুরী জাতীয়করণ করা হয়েছে। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে ও যথাযথ দিকনির্দেশনার কারণে ২০১৫ সালের প্রথম দিনেই (১লা জানুয়ারী) বিনা পয়সায় ৩২৬ মিলিয়ন বই শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। শিশুদের জন্য সরকার প্রধানের এ এক চমকপ্রদ উপহার। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে এবং ছাত্রীদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিদ্যালয়ে সরকারীভাবে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে যার দ্বারা ঝরে পড়ার হার ব্যাপক হারে কমে এসেছে।

এমডিজি-৩ হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত লক্ষ্যমাত্রা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাপক। মেয়েদের স্কুলে ভর্তির হার প্রাথমিকে ৫১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৫৩ শতাংশ, যা ছেলেদের তুলনায় বেশী (যথাক্রমে ৪৯ এবং ৪৭শতাংশ)। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হওয়াতে মেয়েদের চাকুরীর হার দশের নীচ থেকে বেড়ে এখন ৩৪শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পখাত, তৈরি পোশাকে যে বিশাল শ্রমগোষ্ঠী কাজ করছে, তাদের ৯৩ শতাংশই নারী। সরকারী চাকুরীতে নারীদের জন্য ১০% কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ফলে প্রজাতন্ত্রের কর্মবিভাগে ও উর্দ্ধত পর্যায়ে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা আগের চাইতে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যায়ের ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, বিচারপতি, সরকারের সচিব, রাষ্ট্রদূত, পুলিশ বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা সকল পর্যায়েই নারীরা কাজ করছেন। সবচাইতে বিষ্ময়কর এবং গৌরবের বিষয় হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশই পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে সরকার প্রধান, বিরোধী দলীয় নেতা, প্রাক্তন বিরোধী দলের নেতা, সংসদের স্পীকার, ডেপুটি লীডার – সবাই নারী। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। তবে এখানেই বাংলাদেশ থেমে থাকেনি। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ পুলিশের নারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে কাজ করছেন এবং দেশে-বিদেশে আমাদের সম্মান ও সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের পাশাপাশি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটেছে গত কয়েক দশকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত – ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সরকারে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করানোতে আজ ১৪,০০০ নারী জনপ্রতিনিধি সারা দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বে এবং স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে পৃথিবীল ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আজ দশম স্থানে রয়েছে।

শিশুমৃত্যু হ্রাসকরণ সংক্রান্ত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এমডিজি-৪ এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অত্যন্ত সাফল্যজনক। ৭২শতাংশ শিশুমৃত্যুহার রোধে সক্ষম হয়েছে দেশটি। তাই ২০১২ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের এমডিজি-৪ পুরস্কার অর্জন করে। একই সাথে এমডিজি-৫ (মাতৃমৃত্যুহার হ্রাসকরণ) এরক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাপক অগ্রগাতি অর্জন করেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে প্রতি হাজারে ৫৭৪ জন প্রসূতি মায়ের মৃত্যু ঘটতো, সেখানে ২০১৩ সালে সে হার ১৭০এ নেমে এসেছে (প্রায় ৭০ শতাংশ কম)। প্রশিক্ষিত ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের হার প্রায় আটগুণ বেড়েছে। বিকল্প সেবাযতেœর হার বেড়ে ২০১৪ সালে ৭৯ শতাংশে এসেছে ।

এসকল অর্জন কোন হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা নয়, বরং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সুদূরপ্রসারী কর্মদ্যোগের কল্যাণেই সম্ভব হয়েছে। সারা দেশে ১৩,৮০০ টি কমিউনিটি হেলথ্ ক্লিনিক স্থাপনের মাধ্যমে অত্যন্তু অগ্রাধিকারের সাথে তিনি এ কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বি¯তৃত এসকল কিøনিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ, সেবা প্রদান এবং তথ্য-প্রযুক্তির সর্বাত্মক সদ্ব্যবহারে মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষতঃ গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের সেবা নিশ্চিত করেছেন তিনি, যার সুফল আজ পাচ্ছে তৃণমূলের বাংলাদেশ। এর স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে প্রযুক্তির উদ্ভাবনী প্রয়োগের ক্ষত্রে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্মানজনক “সাউথ-সাউথ পুরস্কারে” ভূষিত হন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে যে ১৩টি দেশ এমডিজি-৫ অর্জনে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম।

এইচআইভি/এইডস, ম্যালেরিয় এবং অন্যান্য জটিল রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত এমডিজি-৬ এর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্জন কম নয়, ছোঁয়াচে রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান ভালো। এইচআইভি/এইডস সংক্রমনের হার বাংলাদেশে ০.১শতাংশেরও কম। প্রতি ১ লক্ষ জনে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব, ২০০৮ সালে, ছিলো ৮০০ যা এখন অর্ধেকে অর্থাৎ ৪০০তে নেমে এসেছে। যক্ষা প্রতিরোধে আমাদের কার্যক্রমও যথেষ্ট সফল।

যদিও বেশিরভাগ এমডিজি লক্ষ্য আমারা অর্জন করতে পেরেছি, তথাপি এসব সাফল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে আশংকা ও সংশয় রয়েই যাচ্ছে কারণ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ব্যাপক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যদি সমুদ্রসীমার পানির উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পায় তাহলে আমাদের দেশের ২০ থেকে ৩০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী বাস্তুুচ্যূত হবেন এবং অর্থনৈতিক উপার্জনক্ষমতা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হবেন। পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ হওয়াতে এ বিপুলসংখ্যক বাস্তুুচ্যূত মানুষকে কোন আশ্রয় দেবার উপায়ও বাংলাদেশের থাকবে না। তাই যে সকল দেশ বৈশ্বিক উষœায়নের জন্য দায়ী তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিক ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোকে এক্ষেত্রে অধিকতর সহযোগিতা করা, জলবায়ু-অভিবাসী বা Climate-Migrant জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তাদের নীতিমালা পরিবর্তন করা, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে পরিবেশ সংরক্ষণে আর্থিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা আর সর্বপোরি তাদের স্ব-স্ব রাষ্ট্রের দুষণ ও কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ব্যাপক হারে কমিয়ে আনা। এ ব্যাপারে তাদের বিশ্বব্যাপী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে, যার কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া এটা নিতান্ত প্রয়োজন যে, যারা জলবায়ূ উষœতার জন্য দায়ী, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে।

জলবায়ুর ঝুঁকির হ্রাসকরণ সংক্রান্ত সেন্দাই সম্মেলনে জানানো হয়েছে যে, প্রতি বছর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই সারা বিশ্বে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। ২০১২ সালে নিউইয়র্কে ‘স্যান্ডি’ নামক ভায়বহ জলোচ্ছাসের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের একার ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিলো ৬৫ বিলিয়ন ডলারে। আমেরিকার মতো বৃহৎ শক্তির ও অর্থনীতির দেশের এ দশা হলে এহেন দুর্যোগে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কী হাল হতে পারে তা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়। বাংলাদেশে দুর্যোগের কারণে প্রতি বছরে জিডিপি’র ২ শতাংশ অর্থ খরচ করতে হয়, তূল্য বিচারে যা অনেক। কাজেই দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলা আর উন্নয়ননিন্তা এক ও অভিন্ন সূত্রে গাঁথা, অন্ততঃ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ব্যাপক হারে প্রযোজ্য। সুতারাং সে ভাবেই বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে তৈরি হতে হবে, তা না হলে এমডিজি লক্ষ্য পূরণে যে সফলতা এসেছে, তা ধরে রাখা যাবে না।

বাংলাদেশ – এক উদীয়মান অর্থনীতি:

এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক সূচকেও ব্যাপক অর্জন করেছে, বিশেষতঃ গত কয়েক বছরে। টানা ছয় বছর ধরে গড়ে ৬.৩ % প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পৃথিবীকে বিস্মিত করেছে। আজ বিশ্বে চীনের পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে অন্যতম গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। সার্বিক অর্থনীতির আকার ২০০৬ সালে যেখানে ছিলো মাত্র ১০.৫ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলার। বিদেশ থেকে প্রেরিত রেমিট্যান্স ২০০৬ সালে যেখানে ছিলো ৫.৪ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০১৫ সালে তা ১৪.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২০১৫ সালে সাত গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার (২০০৬ সালে যা ছিলো মাত্র ৪.৩বিলিয়ন ডলার)।

খাদ্য উৎপাদনে চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। অতীতে বছরের পর বছর যে দেশ খাদ্য ঘাটতির মধ্যে ছিলো সেই দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু তাই নয়, আমরা আজ খাদ্য রপ্তানীও করছি। চাল ও মাছ উৎপাদনে আজ বাংলাদেশ পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম রাষ্ট্র। আসলে গত কয়েক বছরে খাদ্য উৎপাদনে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে, ৩.৫ গুণ উৎপাদন বেড়েছে যদিও মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কিন্তু কমে এসেছে। দেশের বৃহৎ উত্তরাঞ্চলে সেই বহু পরিচিত ‘কার্তিকের মঙ্গা’ আর ক্ষুধা এখন আমাদের অতীতের গল্পমাত্র।

মাথাপিছু আয় আজ বেড়ে ১,৩১৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সার্বিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, তাই বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের থেকে ‘নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ’ -এর কাতারে স্থান দিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের পাশাপাশি আমেরিকার প্রভাবশালী ম্যাগাজিন, ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল, দ্রুত মানব উন্নয়নের সাফল্যের জন্য বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছে ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানদন্ডের ধারক’ হিসেবে। এ স্বীকৃতিকে বাংলাদেশ ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এবং ২০৪২ সালের মধ্যে ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে বিশ্বের বুকে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য স্থির করেছি। মাাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

এমডিজি-৮ লক্ষ্যমাত্রার আলোকে উন্নয়স সহযোগী রাষ্ট্রসমূহ আর্থিক সহায়তাদানে সম্মত হয়েছিলো। তাদের পক্ষ থেকে তখন বারংবার বলা হয়েছিলো যে, তাদের মোট জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ তারা এমডিজি লক্ষ্য পূরণে প্রদান করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তারা এ পর্যন্ত মাত্র ০.৩% অর্থ ছাড় করেছে, যার পরিমাণ ১৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ৪৮টি এলডিসি’র রাষ্ট্র এ সহায়তার মধ্যে ৩৮ থেকে ৪২ বিলিয়ন পর্যন্ত সহায়তা পেয়ে থাকে। জাতিসংঘের ইন্টার গভর্ণমেন্টাল টাস্ক ফোর্সের তথ্য মতে, প্রতি বছর এসডিজি অর্জনে ৫ থেকে ১১ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। প্রতি বছর কেবল দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্য পূরণেই দরকার হবে ৬৬ বিলিয়ন ডলার। স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজন হবে ৩৭ বিলিয়ন ডলার এবং সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজন হবে ৪২ বিলিয়ন ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাব মতে, পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য শুধু এশীয় রাষ্ট্রগুলোরই প্রয়োজন হবে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।

এত বিশাল অংকের অর্থ আসবে কীভাবে? কোথা থেকে? এটিই এখন সবচাইতে বড় চিন্তার বিষয়। তবে আশার কথা এই যে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার দেশগুলোর জোট বেশ কিছু উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (Asian Infrastructure Investment Bank -AIIB) মাধ্যমে ৪০ বিলিয়ন ডলার এবং ‘ব্রিক্স’ (Brazil, Russia, India, China and South Africa) ব্যাংকের মাধ্যমে ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যা শীঘ্রই আলোর মুখ দেখবে বলে আমরা আশাবাদী। এছাড়াও ডিউটি ফ্রি-কোটা ফ্রি বাজার প্রবেশাধিকার, মুদ্রা প্রেরণের বিধিনিষেধ শিথিলকরণ, অভিবাসন খরচ হ্রাস, অবৈধ অর্থ পাচার প্রতিরোধ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের যথাযথ ব্যাবহারের মাধ্যমে বেশ কিছু তহবিল সংগৃহীত হবে। সামরিক খাতে বিপুল ব্যায়ে কিছু অংশ মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ব্যায়ের মাধ্যমেও এ তহবিলে অর্থের যোগান বাড়ানো যেতে পারে। সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা সংস্থা (Stockholm International Peace Research Institute – SIPRI) তাদের এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে যে, ২০১২ সালে পৃথিবীর রাষ্ট্রসমূহ তাদের সামরিক খাতে ব্যয় করেছে ১,৭৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এ বিশাল ব্যয় থেকে শান্তি রক্ষা বা নিরাপত্তা বৃদ্ধি কোনটাই সম্ভব হয়নি। দ্যাগ হ্যার্মাশ্যল্ড ইন্সটিটিউট অব সুইডেনের মতে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বারংবার উদ্যোগ ও রেজ্যুলেশন সত্ত্বেও সংঘাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহ বেড়ে চলেছে। উন্নত দেশগুলো যদিও বলছে যে এসডিজির ক্ষেত্রে অর্থ ছাড়করণে তাদের সমস্যা রয়েছে, কিন্তু একথা সত্য যে বিশ্বের বড় বড় ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বৈশ্বিক সঞ্চয়ের পরিমাণ এখন ২৩ট্রিলিয়ন ডলার। এর মাত্র ২০ শতাংশও যদি এসডিজির লক্ষ্য পূরণে ব্যয় করা যেতো, তাহলে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার তহবিল গঠন সম্ভব। সারা বিশ্বে ব্যাবসায় ও বাণিজ্যিক খাতে ৪০০ ট্রিলিয়ন ডলার ফান্ড ভাসমান রয়েছে। তাই জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক নেতারা এসব ব্যবসায়িক জায়ান্টদের কাছে পৌঁছুতে সচেষ্ট রয়েছেন যাতে করে তাদের কিছু অংশ এই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার খাতে আনা সম্ভব হয়। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য মতে, বিশ্বেও মাত্র ৮৫ জন ধনকুবের ব্যক্তির হাতে সারা পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্পদ কুক্ষিগত রয়েছে। সেই অর্থ যদি কিছুটা হলেও মানব উন্নয়নে ব্যয় করা হতো তাহলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন অসম্ভব নয়। সুতরাং আমরা আশাবাদী হতে পারি।

এসডিজি ও বাংলাদেশের নেতৃত্ব ঃ

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) প্রায় সবগুলো জটিল ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হয়েছে। তাই এটিও আশা করা যায় যে, ২০১৫-উত্তর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সফলকাম হবে। আর সেক্ষেত্রে মূল ভিত্তিটি হবে “Transforming our World: The 2030 Agenda for Sustainable Development’ শীর্ষক জাতিসংঘের দলিল। এখানে গুরুত্বের সাথে দেখা বিষয়গুলো হচ্ছে – (১) দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ; (২) জ্বালানী নিরাপত্তা; (৩) খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়ন; (৪) অভিবাসন ও উন্নয়ন; (৫) জলবায়ু পরিবর্তন; (৬) গুণগত শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়ন; (৭) লৈঙ্গিক সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন; (৮) শিল্পায়ন; (৯) অবকাঠামো উন্নয়ন; (১০) উৎপাদন ও ভোগের ধরণ পরিবর্তন; (১১) আন্তসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা; (১২) সমুদ্র, নীল অর্থনীতি, জীব-বৈচিত্র্যের টেকসই ব্যবহার; (১৩) সুশাসন ও আইনের শাসন; এবং (১৪) কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশল – ইত্যাদির প্রতিটি বিষয় বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রায় সংযোজন করতে পেরেছে। এ তার ব্যাপক সাফল্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে জাতিসংঘে দাবী করেছেন বৈশ্বিক উন্নয়নে সকল রাষ্ট্রের সম-অংশগ্রহন নিশ্চিত করার। তিনি বলেছেন বৈষম্য ও অসমতার সবকিছু দূরীকরণের। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি দাবী তুলেছেন প্রযুক্তির যথাযথ হস্তান্তর; যুব শ্রমগোষ্ঠীর চাকুরীর সুযোগ নিশ্চিতকরণের; বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহনের সুযোগ, ডিউটি-ফ্রি/কোটা-ফ্রি বাজার প্রবেশাধিকার; বহনযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা; শক্ত অংশীদারিত্ব; উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি; মানুষ ও পৃথিবীর জন্য যতœ নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বিষয়ের। তাঁর সুযোগ্যা কন্যা, গ্লোবাল পাবলিক হেলথ্্ ইনিশিয়েটিভের চেয়ারপার্সন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন দাবী করেছেন অটিজম ও অন্যান্যা অক্ষমতায় আক্রান্ত ব্যাক্তিদের সমাজের সর্বস্তরে অংশগ্রহনের সুযোগ নিশ্চিতকরণের, যা জাতিসংঘ ঘোষিত উপরোক্ত দলিলেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ দুটো প্রস্তাব রাখে যার একটি হচ্ছে “জনগণের ক্ষমতায়ন” সংক্রান্ত; আরেকটি হচ্ছে “অটিজম ও অন্যান্য অক্ষমতায় আক্রান্তদের যতœ সংক্রান্ত”। এই দুটোর মূল প্রতিপাদ্যগুলো ২০১৫-উত্তর এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও জাতীয় সংলাপের ড. কাজী খলিকুজ্জামান প্রণীত মাধ্যমে ১১ দফা প্রস্তাব যা মিশনের মাধ্যমে জাতিসংঘে পেশ করেছে বাংলাদেশ, সেগুলোও উপরে বর্ণিত দলিলে সন্নিবেশিত হয়েছে। আনন্দের বিষয় এই যে, অক্লান্ত প্রয়াসের দ্বারা গত দুই বছর ধরে যে আলোচনা চলেছে ও যার ভিত্তিতেই ২০১৫-উত্তর উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দলিল প্রণীত হয়েছে, বাংলাদেশ সেই নোগোসিয়েশনের অন্যতম সদস্য ছিলো। সুতরাং বাংলাদেশ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশীদার হিসেবে গর্ব করতে পাওে এবং এর বাস্তবায়নে এমডিজির মতোই সফল হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

উপসংহার:

বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপথ কখনোই মসৃন ছিলো না। নানান চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে পার হতে হয়েছে আমাদের এই বিপুল জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি। স্বল্প আয়তনের দেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে কোটি কোটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো। সকলের জন্য অন্ন আর বস্ত্রের সংস্থান করার যে সংগ্রামী জাতীয় জীবন আমাদের ছিলো তা এখন অতীত। এখন পৃথিবীর সর্বত্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পরে মানুষ চলছে। সেই দেশটির উন্নয়নের যে স্বপ্ন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন, তা আজ সত্যি হবার পথে। আর সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে তাঁরই সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে। দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার যে দেশগুলো বিগত চার দশকে বিষ্ময়করা উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে, যেমন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন – এদের সকলেরই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এ সবগুলো দেশই দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল সরকার এবং একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পথ চলেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। গত ছয় বছর ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে স্থিতিশীল একটি সরকার বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে মূলতঃ এ কারণেই জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর গতিশীল ও স্থিতিশীল নেতৃত্ব বাংলাদেশকে একটি মানব উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিশ্বের বুকে পরিচিতি দিয়েছে। সেই সাথে দেশে এসেছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি। বেড়েছে শ্রমশক্তির মর্যাদা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, বেড়েছে শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ (ক্ষেত্রবিশেষে মেয়েদের বেশি), কমেছে সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্য এবং বেড়েছে জীবনযাত্রার মান ও জীবনাকাক্সক্ষা। আমাদের মহান স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বর্ষে, ২০২১ সালের মধ্যে, মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের লক্ষ্য নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশকে নিয়ে চলেছেন সম্মুখপানে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের “সোনার বাংলা” অর্জনে এভাবেই তাাঁর নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ প্রয়াস এবং দেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যাবার স্বপ্ন কেবল স্বপ্ন নয়, বরং উজ্জ্বল সম্ভাবনার এক বাস্তব সত্য। এ স্বপ্ন দেশে এবং সারা বিশ্বে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মাঝে স্ফুরণ ঘটাবে এক নতুন দেশাত্মবোধ ও জাতীয় চেতনার। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন চেতনার। মালয়েশিয়ার মহাথির মোহাম্মাদ বা সিঙ্গাপুরের লী কুয়ান ইউ যেভাবে তাঁদের দেশকে নিয়ে গেছেন বিশ্বের প্রথম সারিতে, সেভাবে আমাদের জাতীয় নেতা দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবেন সেই কাক্সিক্ষত উন্নয়নের লক্ষ্যে। সৃজন করবেন নতুন এক ইতিহাস। বাংলাদেশ হবে নতুন এক সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ। জাতির পিতার স্বপ্নের সেই সোনার বাংলাদেশ।

আসুন, আমরা সকলে আজ জননেত্রেী শেখ হাসিনার এই সুদূরপ্রসারী কর্মদ্যোগে শামিল হই। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা অর্জনে তাঁর হাতকে শক্তিশালী করি এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই স্বপ্নের সেই সোনার বাংলার পথে।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ড. আব্দুল মোমেন : জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত।


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com