মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০৪:৪১ অপরাহ্ন

মহামারিতে অর্থনীতির বীরদের জন্য বিবেচিত হোক অর্থনৈতিক ন্যায্যতা

নিউজ ডেস্ক:
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২১
মহামারিতে অর্থনীতির বীরদের জন্য বিবেচিত হোক অর্থনৈতিক ন্যায্যতা

বাংলাদেশ অর্থনীতির বর্তমান দুই মহানায়কের সঙ্গে সঙ্গে অন্য সহযোদ্ধারাও করোনাভাইরাসের হামলায় বিপর্যস্ত। এই দুই মহানায়কের একটি হলো পোশাকশ্রমিক, অন্যটি হলো প্রবাসী শ্রমিক। বাংলাদেশের পোশাকের বড় ক্রেতা এবং ইউরোপ-আমেরিকায় হাজার হাজার বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তৈরি পোশাক বিক্রয় করে থাকে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো এইচঅ্যান্ডএম, জারা ইত্যাদি।

তবার সেসব বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়েছি, বাংলাদেশে তৈরি পোশাকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখে গর্বিত হয়েছি, আনন্দিত হয়েছি। এই গর্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পোশাকশ্রমিকেরা। পোশাক বিনিয়োগে মালিকদের অবদান তো রয়েছেই, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তুলনামূলক সুবিধাতত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশ পোশাকশিল্পের উন্নয়নের পেছনের বড় নিয়ামক হলো আমাদের সস্তা শ্রমিক।

করোনাভাইরাসের প্রথম ওয়েভে বাংলাদেশ গার্মেন্টসশিল্প ক্রেতাদের দিক থেকে বড় ধাক্কা পেয়েছে। দুঃখজনক, আমরা সেই সময় আমাদের পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের একধরনের নোংরা খেলা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। দেখেছিলাম পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করতে। সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর বিশ্ববাসী দেখেছিল, আমাদের পোশাকমালিকেরা কী পরিমাণ সুপার নরমাল মুনাফা অর্জন করে থাকেন শ্রমিকদের শোষণের মাধ্যমে। অথচ করোনাকালে পোশাকশ্রমিকদের অসহায় অবস্থায় তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাদানে চরম ব্যর্থ হয়েছি, হচ্ছি।

বাংলাদেশের আরেক মহানায়ক হলো প্রবাসী শ্রমিকেরা, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হয়। অথচ করোনার আঘাতে যখন গোটা বিশ্বঅর্থনীতির চাহিদা ও জোগান প্রতিনিয়ত ধাক্কা খাচ্ছে, বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকেরা চাকরিচ্যুত হয়ে দেশে ফিরছেন, তখন তাঁদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাদানে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। যুগে যুগে বাংলাদেশের প্রত্যেক সরকারই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে তাদের নিজেদের অবদানের কথা বললেও মূলত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় দুটি সূচক বেকারত্ব ও দরিদ্র পরিস্থিতির উন্নয়নে ব্যর্থতাই দেশের লাখো মানুষকে যেকোনোভাবে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে নিজেদের বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ঘোচাতে বাধ্য করে। প্রতিবছর বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যে পরিমাণ চাকরিপ্রত্যাশীরা যুক্ত হন, তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে পাড়ি জমিয়ে অমানবিক কষ্ট আর অনিশ্চয়তায় কাটানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের বেকারত্বের হারকে কমিয়ে রাখছেন। তাঁদের অনেকে আবার লাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন, তা না হলে যুগের পর যুগ পরিবারবিচ্ছিন্ন হয়ে বিদেশে একাকী জীবন যাপন করেন।

বাসী শ্রমিকেরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে শুধু দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তি আমদানিতে সাহায্য করছেন না, বরং তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে দেশের বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করছেন, দরিদ্রতাকে ঘোচাচ্ছেন। করোনাকালে বাংলাদেশের যখন রপ্তানি আয় কমছে, ঠিক তখনই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, ঋণের বোঝা কমিয়েছে, আবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য ঋণদাতা সংস্থার কাছে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বা সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথাগত সংজ্ঞায় দরিদ্রতার শুধু আর্থিক দিকের কথা বলা থাকলেও পরিবারবিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবাসে যুগ যুগ ধরে কাটানো বাংলাদেশিদের মানসিকতার দিকটাকে বিবেচনা করা হয় না।

দিক থেকে বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়নকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভালো দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না, সেটা ভাবার বিষয়।

করোনাকালে বড় প্রশ্ন হলো, ৫০ বছরে গড়ে উঠা অর্থনীতি উন্নয়নের এসব নায়ক, মহানায়ক—গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক, ফরমাল ও নন-ফরমাল সেক্টর থেকে চাকরিচ্যুত নতুন বেকারদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে পারছে কি না। দুঃখজনক যে বছরের পর বছর ধরে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বাংলাদেশ দুঃসময়ে তার বীর সন্তানদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দানে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থনৈতিক যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়ে আশ্বস্ত করতে পারছে না যে আপনারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার ছিলেন, দুঃসময়ে আপনার অর্থনীতি আপনাদের অভুক্ত রাখবে না।

আসলেই কি সংকট মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতি তার এমন মহানায়কদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে অপারগ, নাকি আমাদের চিন্তাভাবনায় ফারাক রয়েছে? আমি মনে করি, আমাদের নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি বর্তমান সমস্যার সমাধানে নিম্নোক্ত উপায়গুলো বিবেচনা করতে পারে—

১.
মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য মানুষের সবচেয়ে বেশি দরকার ক্রয় ক্ষমতা বা অর্থ, সরকার রাজস্বনীতির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থের একটি অংশ জোগান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সরকার যদিও একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যা, কিনা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার রাজস্ব আদায়ে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং দেশীয় বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ করে অর্থের পর্যাপ্ত জোগান দেওয়া খুব কঠিন, সে ক্ষেত্রে অর্থের বড় জোগান আসতে পারে দুর্নীতিবাজদের কালো অর্থ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারীদের সম্পত্তি, ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তসহ যদি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো হয়, তবে লাখো কোটি টাকা উদ্ধার সম্ভব এবং সেই অর্থ করোনাকালে অসহায়-চাকরিচ্যুত মানুষের সহায়তার মাধ্যমে নৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

২.
সদ্য নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ করোনা মহামারির আগে বলেছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অর্থের জোগান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। সে সময় বিষয়টি বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি সরকার উপরিউক্ত রাজস্বনীতির মাধ্যমে বেকার-অসহায়দের সহায়তা দিতে না পারে, তবে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন টাকা ছাপিয়ে জনগণের মধ্যে সরাসরি হস্তান্তর করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশে জরুরি ভিত্তিতে গৃহীত ব্যবস্থাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে প্রয়োগ করলে মুদ্রাস্ফীতিজনিত সমস্যাসহ সম্ভাব্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক জটিলতাসমূহকে নিয়ন্ত্রণে রেখেই উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

দাহরণস্বরূপ, কানাডায় কানাডা ইমার্জেন্সি রেসপন্স বেনিফিটের (সিইআরবি) মাধ্যমে চাকরিচ্যুত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক অর্থসহায়তা দেওয়া হচ্ছে কয়েক মাসের জন্য। আমরা বাংলাদেশে এই নীতির একটু সংশোধনীর মাধ্যমে ইমার্জেন্সি রেসপন্স বেনিফিট দিতে পারি কয়েক মাসের জন্য, যাতে তাঁরা চাকরি হারিয়ে তাৎক্ষণিক হতাশায় পর্যবসিত হয়ে দিশেহারা না হন। যেহেতু করোনা মহামারির কারণে কৃষিখাদ্য উৎপাদন খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বর্তমান চিত্র এমন যে একদিকে খাবারের জন্য ক্রয়ক্ষমতাহীন মানুষের হাহাকার আর অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও ধনী চাষিদের গুদামে শস্যের ভান্ডার।

নতুন টাকা ছাপিয়ে জনগণের কাছে হস্তান্তরে মুদ্রাস্ফীতি খুব বেশি হবে না বরং অর্থনীতিতে গতিশীলতা বাড়বে বলে মনে করি। কারণ, জনগণের প্রধান চাহিদা হলো খাবার, কৃষি উৎপাদনও তেমনটি বাধাগ্রস্ত হয়নি। গরিব মানুষদের কাছে হস্তান্তরিত অর্থ গুণগতভাবে ব্যবহৃত হবে, তারা অপচয়ের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করবে না এবং খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়ী ও ধনী চাষিদের গুদামজাত শস্যের জোগান বাড়বে। এভাবে অর্থনীতিতে বিদ্যমান সম্পদের কাঙ্ক্ষিত বণ্টন ঘটবে এবং মানুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফলতাকে টের পাবে। এরপরও যতটুকু মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে, তাতে সামষ্টিক অর্থনীতি একটু ডিস্টার্বড হলেও আমরা দীর্ঘকালে তা পুষিয়ে নিতে পারব, যদি ছাপানো অর্থ অসহায় মানুষের মধ্যে ঋণ আকারে বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ, যাঁরা এখন অর্থসহায়তা নেবেন, তাঁরা চুক্তি অনুযায়ী করোনাপরবর্তী সময়ে উপার্জন করা শুরু করলে সমপরিমাণ অর্থ (সুদবিহীন) ধীরে ধীরে পরিশোধ করবেন। ফলে বর্তমানে ছাপানো অর্থের জোগান ভবিষ্যতে কমে যাবে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতিজনিত সমস্যার সমাধান করবে। এরপরও যদি সামষ্টিক অর্থনীতিতে টাকা ছাপানোর খারাপ প্রভাব কিছুটা রয়ে যায়, সেটা গ্রহণযোগ্য। কারণ, মহামারিকালে আমাদের উচিত ‘সামষ্টিক অর্থনীতির’ চেয়ে বরং ‘উন্নয়ন অর্থনীতিকে’ বেশি প্রাধান্য দেওয়া, যা কিনা মানবতার পক্ষে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধানের চারটি মূলনীতির একটি হলো সমাজতন্ত্র। তাই সামষ্টিক অর্থনীতিকে পুরোপুরি প্রাধান্য না দিয়ে বরং সংকটকালে সামষ্টিক অর্থনীতির চালকদের, অর্থাৎ বিপর্যস্ত শ্রমিকদের প্রাধান্য দিতে চাই। এভাবেই অর্থনীতির নায়ক, মহানায়কদের প্রতি নৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার করা সম্ভব।
* মো. শহিদুল ইসলাম, পিএইচডি গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা এবং প্রভাষক (শিক্ষানবিশ), অর্থনীতি বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com