মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১, ০৩:৫২ পূর্বাহ্ন

ভাষাসৈনিক ইউসুফ হোসেন কালু আর নেই

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০২১
ভাষাসৈনিক ইউসুফ হোসেন কালু আর নেই

ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউসুফ হোসেন কালু (৯১) আর নেই।

গতকাল সোমবার (২৯ মার্চ) বিকেল পৌনে ৬টায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কেলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিাহি ওয়া লিল্লাহি রাজিউন)।

বেশ কয়েক দিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

১৯৩১ সালের ১৭ জানুয়ারি বর্তমান ঝালকাঠী জেলার রাজাপুরের কানুদাসকাঠী মিয়াবাড়ি জন্মগ্রহণ করেন ইউসুফ হোসেন কালু। তারঁ পিতার নাম ওবায়দুল করিম (রাজা মিয়া) ও মা ফাতেমা খাতুন। তিন ছেলে ও দুই মেয়ের ইউসুফ হোসেন কালু সবার ছোট। তাঁর পড়াশুনার প্রথম পাঠ গ্রামের পাঠশালায়। এরপর এসে ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে (বিএম স্কুল )।

১৯৪৮ সালে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ওই বছর প্রগ্রেসিভ ছাত্রফ্রন্টের নেতা এমায়দুলের নেতৃত্বে তিনি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আন্দোলনে যোগ দেন এবং পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হন। ১৯৫১ সালে মেট্রিকুলেশন পাস করে বিএম কলেজে হায়ার সেকেন্ডারি কমার্স বিভাগে ভর্তি হন তিনি।

তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি ও বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ গোলাম কিবরিয়াকে আহ্বায়ক করে বি এম কলেজে গঠিত ২৫ সদস্যের ভাষা সংগ্রাম পরিষদেও তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের জন্য দেশ উত্তাল হয়ে উঠলে ৮১ সদস্য বিশিষ্ট বৃহত্তর বরিশাল ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ওই কমিটিতেও তাঁকে সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বরিশালে প্রচারণায় পাকিস্তান মুসলিম লীগ সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খান আব্দুল কাইউম আসলে ইউসুফ কালু ও তাঁর সহযোদ্ধারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও স্বৈরাচারী সরকার নিপাত যাওয়ার দাবিতে কালো পতাকা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শহরের কাউনিয়ার নিবাসী মালেক নামের একজন মারা যান। ওই ঘটনায় ইউসুফ কালুসহ ৩৫ জনের গ্রেপ্তার হন। ২২ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হন তাঁরা। বের হয়ে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের হয়ে কাজ শুরু করেন তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২৫ এপ্রিল ভোর থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী বরিশালে আক্রমণ শুরু করলে আমির হোসেন আমু, খগেন্দ্র নাথ সাহা, রেজাউল মালেক খানের সঙ্গে আত্মরক্ষার্থে একটি জিপে করে ঝালকাঠির দিকে যাচ্ছিলেন কালু। কালিজিরা পৌঁছামাত্রই তাঁদের জিপ লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা করে। তাঁরা জিপ থেকে নেমে জঙ্গলের ভেতর আশ্রয় নেন। বিকেলে হামলা বন্ধ হলে সুগন্ধা নদী দিয়ে তাঁরা শেখেরহাট হয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি মালেক খানের অবস্থানস্থল জুনুহারে গেলে তাঁর দেওয়া নৌকায় করে স্বরূপকাঠী হয়ে হুলারহাট পৌঁছান তাঁরা।

হুলারহাট থেকে পিরোজপুরের পাড়েরহাটে গিয়ে দালাল ধরে ভারতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন কালুরা। মালবোঝাই একটি বড় নৌকায় করে আমির হোসেন আমু, খগেন্দ্র নাথ সাহা আর ইউসুফ কালু ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। নৌকাটি বলেশ্বর নদ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রচণ্ড ঢেউয়ের কবলে পড়লে স্বরূপকাঠী-বানারীপাড়ার ভেতরের ছোট খাল দিয়ে মধুমতি নদী ধরে বাগেরহাট পৌঁছান। সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের হিঙ্গলগঞ্জ পৌঁছন।

ভারতে গিয়ে শ্যামবাজারের বাংলাদেশ মিশনে অবস্থান নেন কালু ও তাঁর সহযোগীরা। ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরলে কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা আর তেভাটার এলাকায় বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন কালু। যুদ্ধের সময় তিনি পাকবাহিনীর আঘাতে কয়েকবার আহতও হন। একপর্যায়ে তিনি জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় একমাস হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ২২ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফেরেন।

প্রথম জীবনে শিশু কিশোর সংগঠন মুকুলফৌজ করা এই প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি আন্দোলনেই দেশ ও মানুষের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী ও প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন সক্রিয়ভাবে।

১৯৬২ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন ইউসুফ হোসেন কালু। প্রথমে আজাদ ও পরে দৈনিক পয়গামের বরিশাল সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। বরিশাল প্রেসক্লাবের (বর্তমানে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাব ) সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল খেলায় পারদর্শী কালু ১৯৬২-১৯৭৩ পর্যন্ত বরিশাল ক্রীড়া সংস্থারও সদস্য ছিলেন।

গুণী এই মানুষটির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক (মন্ত্রী) আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রি জাহিদ ফারুক শামীম, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো.ছাদেকুল আরেফিন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, খেলাঘর বরিশাল জেলা কমিটি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেস ক্লাব, বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি, বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন, বরিশাল হেলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বরিশাল কোর্ট রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
     12
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com