রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

একজন রাতের নারী

রোজিনা রাখী :
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ এপ্রিল, ২০২১
যাদের আমরা বেশ্যা বা পতিতা বলি ওরাও কিন্তু নারী । ডাক্তার যেমন পেশার নাম , পতিতাও কিন্তু একটা পেশার নাম ।দু’জনের পেশার ধরণ শুধু দু’রকম।একজন মহিলা ডক্টর রাত জেগে

যাদের আমরা বেশ্যা বা পতিতা বলি ওরাও কিন্তু নারী । ডাক্তার যেমন পেশার নাম , পতিতাও কিন্তু একটা পেশার নাম ।দু’জনের পেশার ধরণ শুধু দু’রকম।একজন মহিলা ডক্টর রাত জেগে অসুস্থ মানুষের সেবা করেন আর একজন রাতের নারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে চোখে মুখে রঙ মেখে পেটের তাগিদে পুরুষ খদ্দেরের সেবা দেবার অপেক্ষায় থাকেন।ডাক্তার হওয়া একটা মেয়ে এবং তার বাবা মায়ের কাছে যেমন এক স্বপ্ন কিন্তু রাতের নারী হওয়া বোধহয় পৃথিবীর কোনো মেয়ের কাছেই স্বপ্ন তো দূরে থাক দুঃস্বপ্নও নয় ।কিন্তু এ জগতটা খুব কঠিন এক জায়গা।এখানে কেউ কারো জন্য নয়।এ এক স্বার্থপতার দুনিয়া।এখানে কে যে কখন কোন পথে ছিটকে পড়ে তা এক ওপরওয়ালা ছাড়া কেউ জানেন না।

 

এই তো কিছু দিন আগে যখন মিম নামের ফুল বিক্রি করা ছোট্র মেয়েটা রাতের অন্ধকারে শহীদ মিনারের মতো জায়গায় ধর্ষিত হয়ে পাশবিক ভাবে খুন হলো তার জন্য কি মিম দায়ী নাকি ওর মেয়ে হওয়া -ওর একটা যোনী পথ থাকা দায়ী-কোনটা? ওর জন্য কিন্তু বেগুনী রঙ এর শাড়ি পড়া কোনো নারীবাদেরই শাহবাগ কিম্বা প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের আগুন ঝরাতে দেখিনি।কেউ কেউ হয়তো রাস্তায় বেড়িয়েছিলেন তবে তাদের মধ্যে কোনো নারী সেলিব্রিটি মুখ দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

 

তাছাড়া মিমদের মতো কিশোরীদের জন্মই তো রাস্তায়।কে বাপ কে মা তার হিসেব কে রাখে – এসব মিমদের ঠিকানাই তো পথে ঘাটে ।এদের ধর্ষন হলেই বা কি আর খুন হলেই বা কি।এদের পুনর্বাসন কে করবে? আমি- আপনি- আমরা ? আমরা নিজেরাই তো নিরাপদ নই।একটু রাত হলে কাজ থেকে ফিরতে দেরি হলে ভয়ে বুক কাঁপে ।বাসে ভয় ,সিএনজি তে ভয়, এমনকি উবারেও ভয়। তাহলে কেন বলি আজ বিশ্ব নারী দিবস ? দিবস হোক মানবিক দিবস হোক নারী –পুরুষ উভয়ের জন্য নিরাপদ ।সমঅধিকার নয় সম মর্যাদা থাক প্রতিটি মানুষের প্রতিটি কাজের ।

 

একটা মেয়ে শার্ট প্যান্ট পড়লে দোষ ,সিগারেট খেলে দোষ,একা থাকা একটা মেয়ের বাসায় ছেলে বন্ধু এলে সে মেয়ে খারাপ ,কত রকম প্রতিবন্ধকতা আমাদের এই আধুনিক রুপি সমাজে।অথচ দেখুন,ঘুস খাওয়া ,হারাম পথে আয় করা,নারী নিয়ে ফূর্তি করা,মাদকের মতো চোরকারবারি করা এসব কিন্তু অন্ধ সমাজে হালাল।।এমনকি অনেক অশিক্ষিত বর্বর পুরুষ আছেন যাদের ভাষায় এসন মেয়েরা বেশ্যা ।একটা মেয়ে কি সাধ করে এই পথে নামে ,বলুন? একজন প্রেমিকাও নিজেকে সমর্পন করে তার প্রেমিকের কাছে সেই প্রেমিক কে ভালোবেসে ,তাকে নিজের করে পাবার আশায় সেখানে একজন রাতের নারী কেন নিজের শরীরকে বিক্রি করবে, কেন নিজের শরীর টাকে কুকুরের মতো ঘাবলে ছিঁড়ে খেতে দেবে এক অচেনা দানবের কাছে, একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখি না চলুন!

আপনারা যারা নিয়মিত পেপার পত্রিকা পড়েন তারা নিশ্চয়ই দেখে বা জেনে থাকবেন ,জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী একবার তার জীবনের গল্পে বলেছিলেন ,তার মা একজন দেহ ব্যবসায়ী এবং সেই টাকা দিয়ে তিনি মেয়েকে মাস্টার্স পাশ করিয়েছেন।কতটা সাহস আর মানসিক শক্তি থাকলে একজন মেয়ে অহংকার করে এমন মায়ের গল্প বলতে পারেন তা সত্যি সমাজের এক বিরল দৃষ্টান্ত ।তবে কেন সেই মাকে কে বেশ্যা বা পতিতা বলে গালি দিব বলুন ?

সারা বাংলাদেশের মানুশ জানেন একজন হাজেরা বেগমের গল্প ।যিনি এক সময় যৌন কর্মী ছিলেন । যৌন পল্লীতে জন্ম নেয়া ৪০ জন সন্তানের মা তিনি আজ। কি অসামান্য চাওয়া কি অদ্ভুত মায়াবতী এক নারী এই হাজেরা বেগম ।বুকভরা ভালোবাসা , হৃদয় জুড়ে বিছানো স্নেহের আঁচল ।রাজধানীর আদাবরে একটি ভাড়া বাসায় হাজেরা বেগম এই ৪০ জন সন্তান নিয়ে পেতেছেন নিজের সংসার ।যদিও এক সময় যৌন কর্মী ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে সেসব ছেড়ে দায়িত্ব নিয়েছেন এইসকল বাচ্চাদের লেখাপড়া ,খাবার এবং নিরাপদ আশ্রয়ের। মায়েদের মতো ওদের ও যেন এই কঠিন পথ বেছে নিতে না হয় তার জন্য এই ৪০ জন বাচ্চাকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন নিজের খরচে এই মহিয়সী নারী হাজেরা বেগম। ভেবে দেখুন একজন যৌন কর্মীও নারী –মা এবং মানবিক মানুষ ।

আমাদের অনেকেরই তো অঢেল পয়সা কড়ি আছে কিন্তু আছে কি একজন হাজেরা বেগমের মতো মহৎ হৃদয় ?তাই আমার মনে হয় কোন পেশাই নোংরা নয় কোনো কাজই অসম্মানের নয়।শুধু শাড়ি চুড়ি পড়ে ফেসবুকে ছবি দিয়ে ,সভা সমিতি করে বড় বড় নারীবাদী কথাতেই সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় কি?

মানুষের জন্য করতে হলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার শিক্ষক বা বিত্তশালী হতে হয় না ।যে কোন পেশায় থেকেই সেটা করা সম্ভব ।আর বিশেষ দিবস থাকতেই পারে তবে সেটা লোক দেখানোর জন্য নয় সেটা হতে হবে মানবিক- সামাজিক এবং সর্বপরি দেশের স্বার্থে দেশের মানুষের স্বার্থে ।
এ সমাজ আজ ও পুরুষের দাপটে চলে।একজন পুরুষ চাইলেই সব হয় কিন্তু একজন নারী হাজারো বার লাখো বার চাইলেও তার বাস্তবায়ন কখনই হয় না।আমাদের সমাজে নারীদের মূল্যায়ন সত্যি অনেক পিছিয়ে।তবে ভালো লাগছে বর্তমান প্রেক্ষাপটের চিত্র দেখে।

 

এই তো মাত্র কদিন আগেই দেখলাম একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির চাকরি হলো নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে ,আরেকজন হলেন অভিনেত্রী ।এটা সত্যি সমাজের এক নতুন সুর্যের উদয়।
সমাজ বদলে যাক দেশ বদলে যাক আর সেই বদল হোক কেবলই মানবতার জয়গানের।নারী দিবস- পুরুষ দিবস থাক না ,তবে সবার জন্য সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য থাক ভালোবাসা আর অপার মহানুভবতা।যেখানে নারী কে আলাদা করে গণ্য করা হবে না ।নারী তার স্বমহিমায় আলোকিত হবে জগৎ জুড়ে ।নারীর বদলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির তবেই হবে নারীর বিজয়।

লেখকঃ রোজিনা রাখী
সিনিয়র এক্সিকিউটিভ
এসইউবি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
     12
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com