রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ০৪:৪৯ পূর্বাহ্ন

খুনি ভাড়া’ করেন বাবুল আক্তার

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ মে, ২০২১
  • ০ বার পাঠিত
খুনি ভাড়া’ করেন বাবুল আক্তার

পুলিশে চাকরি হওয়ার পর পারিবারিকভাবে মাহমুদা খানম মিতুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তখনকার সহকারী পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের। বাবুলের বাবা মো. আব্দুল ওয়াদুদ ছিলেন পুলিশের উপপরিদর্শক। আর মিতুর বাবা মো. মোশারফ হোসেন ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক। পুলিশের দুই সদস্যের পরিবারের ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিয়ে হয়েছিল আনন্দঘন পরিবেশেই। দাম্পত্যজীবনে দুই সন্তানের জনক-জননী হয়েছিলেন বাবুল-মিতু। কিন্তু বিয়ের তিন-চার বছরের মধ্যেই অশান্তি তৈরি হয়েছিল তাঁদের দাম্পত্যজীবনে। পরে এর সঙ্গে যোগ হয় আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার কর্মী এক নারীর সঙ্গে বাবুলের সম্পর্কের ঘটনা। এতে আরো তীব্র হয়েছিল তাঁদের দাম্পত্য কলহ। এরই জের ধরে বাবুল মিতুকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে এমন তথ্যই উঠে আসছে।

 

যদিও পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকা বাবুল আক্তার গতকাল রবিবার পর্যন্ত স্ত্রীকে হত্যার জন্য তাঁর সোর্স কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুছাকে ভাড়া করা এবং বিকাশে টাকা পাঠানোর তথ্য স্বীকার করেননি। তবে গত ১১ মে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম শফিউদ্দীনের আদালতে বাবুলের ব্যাবসায়িক অংশীদার সাইফুল হক ও গাজী আল মামুন যে জবানবন্দি দিয়েছেন, সেখানে মুছাকে টাকা পাঠানোর বিষয় এসেছে।

সাইফুল হক জানিয়েছেন, মিতু হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর বাবুল আক্তারের নির্দেশে গাজী আল মামুনের মাধ্যমে মুছার কাছে তিন লাখ টাকা পাঠানো হয়। মামুনও বিকাশের মাধ্যমে মুছাকে টাকা পাঠানোর তথ্য আদালতকে জানিয়েছেন।

সাইফুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি ও বাবুল বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধু। তাঁর প্রিন্টিং ব্যবসায় বাবুল আক্তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর নামে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই বিনিয়োগের টাকা থেকে বাবুলের নির্দেশে মুছাকে ওই তিন লাখ টাকা পাঠানো হয়।

সাইফুল ও গাজী মামুন দুজন অভিন্ন সাক্ষ্য দেওয়ার পরই বাবুল যে খুনের নির্দেশদাতা এবং ভাড়াটে খুনি দিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করিয়েছেন এই বিষয়ে নিশ্চিত হন তদন্তকারী কর্মকর্তা। এ তথ্য পাওয়ার কথা বাবুল আক্তার বাদী হয়ে দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন এই কর্মকর্তা। গত ১২ মে চট্টগ্রাম মহানগর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। এরপরই মিতুর বাবা বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারসহ আট জনকে আসামি করে নতুন মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় বাবুলকে ওই দিনই গ্রেপ্তার করা হয়। এই মামলারও তদন্ত কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা।

বাবুল-মিতুর দাম্পত্যজীবনে কলহ থাকার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন। তিনি এজাহারে গায়ত্রী অমর সিং নামের এক নারীর সঙ্গে বাবুলের পরকীয়া প্রেমের তথ্য দিয়েছেন। গায়ত্রীর বিষয়ে এখন অনুসন্ধান চালাচ্ছে পিবিআই। বাংলাদেশ থেকে তিনি জার্মান গিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।

২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ের কাছে মুছা সিকদারসহ ভাড়াটে খুনিরা মিতুকে সন্তানের সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছিল। ওই সময় বাবুল আক্তার পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে ছিলেন। পরে চট্টগ্রামে গিয়ে তিনি পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত শুরু করে ডিবি। ওই সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বাবুল আক্তারকে ঢাকায় পুলিশের গোয়েন্দা কার্যালয়ে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওই সময়ই তদন্তে মোড় ঘুরে যায়। মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুলের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। মিতুর মা-বাবাও দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডে বাবুল জড়িত। গত বছর মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মিতুর বাবার করা নতুন মামলায় বাবুলকে প্রধান আসামি করা হয়। এ ছাড়া আরো সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছা, এহতেশামুল হক ভোলা, মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খায়রুল ইসলাম কালু ওরফে কসাই কালু, মো. সাইদুল ইসলাম শিকদার ওরফে সাকু ও শাহজাহান মিয়া। আগের মামলায় ওয়াসিম ও আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের দুজনকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া সাকু তিন দিনের রিমান্ডে আছেন।

আগের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন, সেখানে হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বাবুল আক্তারের মাধ্যমে সোর্স মুছা কিভাবে যুক্ত হয়েছেন, সেই বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে।

নতুন মামলায় বাবুল আক্তারের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। আজ সোমবার রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে হাজির করা হবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্তোষ চাকমা।

রিমান্ডে নেওয়ার পরপরই বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একাধিক দল গঠন করে পিবিআই। কোন দলে কে থাকবেন, কে কী প্রশ্ন করবেন, কোন দল কখন জিজ্ঞাসাবাদ করবে এমন প্রতিটি বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রশ্নের জবাবে বাবুল কী উত্তর দিচ্ছেন, সেটাও সার্বক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে।

যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত সংস্থা : বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু পরকীয়া প্রেমের বলি হয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পিবিআই। মিতুর বাবা যে মামলাটি দায়ের করেছেন, সেখানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) কর্মী গায়ত্রী অমর সিং নামে এক নারীর তথ্য এসেছে। আর তদন্ত পর্যায়ে পিবিআই জানতে পেরেছে যে এই নারীর সঙ্গে বাবুল আক্তারের শারীরিক সম্পর্ক ছিল। মিতু তাঁর এই সম্পর্কের বিষয়টি জানার পরই তাঁদের দাম্পত্য কলহ তীব্র হয় বলে তথ্য পেয়েছে পিবিআই।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, পিবিআই এমন দুটি বই পেয়েছে, যেগুলো বাবুলকে উপহার দিয়েছিলেন গায়ত্রী। সেই বইয়ে গায়ত্রী ও বাবুল কিছু বিষয় লিখেছেন, যেগুলো এখন মিতু হত্যা মামলায় বাবুলের দায় প্রমাণে সহায়ক বলে পিবিআই মনে করছে। আবার মিতুর একটি ডায়েরি পাওয়া গেছে, যেখানে দাম্পত্য কলহ এবং গায়ত্রী সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। হাতের লেখাগুলো মিলিয়ে দেখার পর এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মিতুর বাবা এজহারে উল্লেখ করেছেন যে কক্সবাজার জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে কর্মরত থাকার সময় ২০১৩ সালে ইউএনএইচসিআর কর্মী গায়ত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বাবুল। এ নিয়ে ঝগড়ার পর মিতুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেন বাবুল। এরই মধ্যে ২০১৪ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সুদানে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে ছিলেন বাবুল। এই সময় তাঁর মোবাইল ফোনসেটটি চট্টগ্রামের বাসায় ছিল। ওই মোবাইল ফোনে মোট ২৯ বার বার্তা পাঠান ভারতীয় নাগরিক গায়ত্রী।

এজাহারের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গায়ত্রী যে দুটি বই বাবুল আক্তারকে উপহার দিয়েছিলেন তার একটির তৃতীয় পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে ‘05/10/13, Coxs Bazar, Bangladesh. Hope the memory of me offering you this personal gift. shall eternalize our wonderful bond, love you. Gaitree.’

একই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা ২৭৬-এর পরের পাতায় তিনি লিখেছেন (বাবুল) ‘First Meet : 11 Sep, 2013, First Beach walk 8th Oct 2013, G Birth day 10 October, First kissed 05 October 2013, Temple Ramu Prayed together, 13 October 2013, Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk.’

বিমর্ষ বাবুল চুপ, কখনো কাঁদছেন : মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি বেশির ভাগ প্রশ্নের জবাবে চুপ থাকছেন। কখনো কখনো কাঁদছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রিমান্ড শেষে আসামিকে সোমবার আদালতে সোপর্দ করা হবে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাবুল আক্তার জেরার মুখে স্বীকার করেছেন যে তাঁদের সাংসারিক জীবনে অশান্তি ছিল। কিন্তু খুনি ভাড়ার বিষয়ে এখনো মুখ খোলেননি। আর পারিপার্শ্বিক যেসব প্রশ্ন করা হচ্ছে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন কৌশলে নিজকে না জড়িয়ে। একাধিক প্রশ্নের উত্তরে বাবুল আক্তার বির্মষ হয়ে থাকছেন, নীরব থাকছেন কিংবা নীরবে কাঁদছেন। মুছা সিকদারকে চেনেন কি না এবং সোর্স ছিলেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বাবুল জানিয়েছেন, মুছা তাঁর সোর্স ছিলেন। তবে শুধু তাঁর (বাবুলের) নয়, অন্য দুই সংস্থার সোর্সও ছিলেন মুছা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরো জানান, বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানতে পেরেছেন যে বাবুল-মিতুর দাম্পত্য কলহের কারণে দুই পরিবারের মধ্যেই অশান্তি দেখা দিয়েছিল। ওই সময় মিতুর বাবা যে জেলায় কর্মরত ছিলেন সেই জেলার পুলিশ সুপারও বিষয়টি জানতেন। এমনকি ওই পুলিশ সুপারের বাসায় বৈঠকও হয়েছিল। ওই পুলিশ সুপার দুই পুলিশ পরিবারের মধ্যে মিলেমিশে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাবুল আক্তারকেও নানা ইতিবাচক পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বাবুল আক্তার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা বলেছেন, ‘আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন আসামি।’
সুত্রঃ কালের কণ্ঠ

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
   1234
19202122232425
2627282930  
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com