বুধবার, ০৪ অগাস্ট ২০২১, ০১:০৮ অপরাহ্ন

নজিরবিহীন অস্থিরতা সোনার বাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১
দেশে সোনার বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে। করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর দেড় বছরে দেশে ২০ বার দাম ওঠানামা করেছে। আলোচ্য সময়ে ভরিতে সোনার দাম বেড়েছে ১৩ হাজার টাকা। এ সময়ে বিশ্ববাজারেও

দেশে সোনার বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে। করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর দেড় বছরে দেশে ২০ বার দাম ওঠানামা করেছে। আলোচ্য সময়ে ভরিতে সোনার দাম বেড়েছে ১৩ হাজার টাকা। এ সময়ে বিশ্ববাজারেও অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়েছে। বতর্মানে ৭১ হাজার ৯৬৬ টাকায় ২২ ক্যারটের (ভালো মানের) প্রতি ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে।

তবে দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্যটির ক্রেতা একেবারে কমে গেছে। উলটো যাদের হাতে মজুত আছে তারা সোনা বিক্রি করে দিচ্ছেন। দুবাইয়ের বাজারে প্রতি গ্রাম সোনা ৫৭ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় এর দাম ৫৬ হাজার ৫১২ টাকা।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম  বলেন, সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণে বিশ্ববাজারে সোনার দাম ওঠানামা করছে। এরমধ্যে রয়েছে- করোনা সংক্রমণ ও ডলারের ব্যাপক দরপতন। ফলে মানুষ ডলারের বিকল্প হিসাবে সোনায় বিনিয়োগ করছে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বন্ডের সুদহার হ্রাস, ব্যাংকে আমানতের সুদহার হ্রাস প্রভৃতি সোনার দাম বৃদ্ধির কারণ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ সবকিছু মিলে বিনিয়োগকারীরা সোনায় বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছেন।

এতে সোনার চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়। তবে অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ায় পণ্যটির দাম কমে যায়। তিনি বলেন, দেশের বাজারে দুই কারণে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যটির দাম বাড়ছে। প্রথমত বিশ্ববাজারের প্রভাব এবং দ্বিতীয়ত ব্যাগেজ রুলে বিদেশ থেকে স্বর্ণ আসা বন্ধ হওয়া।

জুয়েলারি সমিতির সাবেক সভাপতি গ্রামীণ জুয়েলার্সের মালিক ড. দিলীপ কুমার রায়  বলেন, বিশ্ববাজারের কারণেই দেশে সোনার দাম বাড়ছে। মানুষ বিনিয়োগের জন্য সোনা কিনে মজুত করছে। তিনি বলেন, খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লেও কেউ আর সোনা কিনছেন না। উলটো যাদের কাছে সোনা ছিল, বাড়তি দামের জন্য তারা বিক্রি করছেন।

দাম কমলে তারা হয়তো আবার কিনবেন। তিনি বলেন, অন্য সব দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সোনা কিনতে পারে। কিন্তু আমাদের ওই সুবিধা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আমাদের কিছুটা তারতম্য হয়। সাধারণত, অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে বিনিয়োগ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণ বাড়ায় মার্কিন ডলার ঝুঁকিতে পড়ে। এজন্য ডলারের দাম পড়ে যাচ্ছে। দেড় বছরে অন্যসব প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দর ৯ শতাংশ কমেছে। সোনার দামে এর প্রভাব পড়ে। ২০২০ সালের শুরুতে বিশ্ববাজারে প্রতি গ্রাম সোনার দাম ছিল ৪১ ডলার। সোমবার পর্যন্ত তা বেড়ে ৫৭ ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ হিসাবে এক বছরে সোনার দাম বেড়েছে ৩৯ শতাংশ।

পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ একটি। আর তা হলো করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি খারাপ অবস্থায় ছিল। এতে ডলারের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। বিনিয়োগকারীরা আর ডলারে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না।

তাই বিকল্প হিসাবে তারা স্বর্ণে বিনিয়োগ করছেন। তিনি বলেন, স্বর্ণের প্রতি ভোক্তাদের চাহিদা বাড়েনি। কারণ করোনায় মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই স্বর্ণের মতো বিলাসী পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির কথা নয়। কিন্তু স্বর্ণে বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে তিনি বলেন, স্বর্ণের দাম বাড়লেও তা বেশি দিন থাকে না।

এদিকে দেড় বছরে দেশে সোনার দাম ২০ বার ওঠানামা করেছে। ২০২০ সালের শুরুতে ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরি ছিল ৫৯ হাজার ১৯৪ টাকা। বর্তমানে তা ৭১ হাজার ৯৬৬ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ হিসাবে দেশের বাজারে ভরিতে ১৩ হাজার টাকা বেড়েছে সোনার দাম। সোমবার বিশ্ববাজারে প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম ছিল ৫৭ ডলার। প্রতি ডলার ৮৫ টাকা টাকায় প্রতি ভরির দাম পড়ে ৫৬ হাজার ৫১২ টাকা। অর্থাৎ বিশ্ববাজারের সঙ্গে ভরিতে পার্থক্য ১৫ হাজার ৪০০ টাকা।

মানভেদে দেশে চার ধরনের সোনা বিক্রি হয়। এর মধ্যে ২২ ক্যারেটে ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা থাকে। ২১ ক্যারেটে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৮ ক্যারেটে ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা থাকে। আর পুরোনো স্বর্ণালঙ্কার গলিয়ে তৈরি করা হয় সনাতন পদ্ধতির সোনা। এক্ষেত্রে বিশুদ্ধ সোনার পরিমাণ নির্দিষ্ট করা নেই।

তবে ব্যবসায়ীরা বলেন, এতে ৬০ শতাংশের মতো পাওয়া যায় বিশুদ্ধ সোনা। বর্তমানে দেশে ২২ ক্যারটের প্রতি ভরি সোনার দাম ৭১ হাজার ৯৬৬ টাকা। ২১ ক্যারটের প্রতি ভরি ৬৮ হাজার ৮১৭ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৬০ হাজার ৬৯ টাকা এবং সনাতন ৪৯ হাজার ৭৪৬ টাকা। ১৯ জুন এ দাম নির্ধারিত হয়।

দেশের বাজারে প্রতি বছর স্বর্ণের চাহিদা প্রায় ২১ টন। অর্থাৎ কমবেশি এ পরিমাণের স্বর্ণ বা অলঙ্কার কেনাবেচা হয়। কিন্তু স্বর্ণের নীতিমালা হওয়ার পর দেড় বছরে ২০ কেজির মতো স্বর্ণ আমদানি করেছে একটি প্রতিষ্ঠান। কাস্টম কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী এর আগে ২০ বছরে দেশে এক তোলাও স্বর্ণ আমদানি হয়নি। বৈধ আমদানি না থাকায় এ খাত থেকে কোনো শুল্কও আদায় হয়নি। ব্যবসায়ীরাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন, বৈধভাবে সোনা আমদানি হয় না। এতে হুন্ডির মাধ্যমে একদিকে শত শত কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। অপরদিকে সরকার হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব।

সূত্র জানায়, চাহিদার বেশিরভাগ সোনাই দেশে চোরাচালান থেকে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের বিমানে স্বর্ণের বার, স্বর্ণালঙ্কার পাচার হয়ে আসছে। এসব দেশে বাংলাদেশের একটি চক্রের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। এছাড়া বৈধভাবে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনা আনা যায়।

তবে তা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম। জুয়েলারি সমিতি বলছে, অব্যাহত লোকসানের মুখে কয়েক বছরে ৩০ ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। এছাড়া নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষ মৌলিক চাহিদা মিটিয়ে সোনার মতো বিলাসী পণ্য কিনতে পারছেন না। বাড়তি দামের কারণে ক্রেতারা সিটি গোল্ডের দিকে ঝুঁকছেন। এছাড়া গোল্ড প্লেটেড নামে এক ধরনের পণ্য রয়েছে। রুপার ওপর স্বর্ণের প্রলেপ দিয়ে তৈরি অলঙ্কারও বিক্রি হচ্ছে।

জানা গেছে, বিশ্বের সব দেশেই কেন্দ্রীয় রিজার্ভে স্বর্ণ মজুত রাখে। স্বর্ণ রিজার্ভে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বতর্মানে দেশটির রিজার্ভে ৮ হাজার ১৩৩ টন স্বর্ণ রয়েছে। যা ওই দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com