রবিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২২, ১১:৩৫ অপরাহ্ন

পবায় আবারো পুকুরখননে চলছে মহোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০২১

বছরের শুরুতেই রাজশাহীর পবায় আদাজল খেয়ে অপরিকল্পিত পুকুর খনন শুরু করেছে এক শ্রেণির মুনাফা লোভিরা। উপজেলার বাগধানি ও তেতুলিয়া মৌজায় নুন্যতম দুইশো’ বিঘা কৃষি জমিতে দিনরাত চলছে এ খননের কাজ। অভিযোগ উঠেছে এ কাজে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে চলেছেন প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও থানা পুলিশ। প্রেক্ষিতে পুকুর খনন বন্ধে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এতে একে অপরের ওপর দোষারোপ করে আখের গোছাচ্ছে অনেকে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কিছু অসাধু ব্যক্তি আবাদী জমিতে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় দেদারসে চলছে খননযজ্ঞ। যেন পুকুর খননের মহাকরণ চলছে। কমছে কৃষি জমি বাড়ছে কৃষি শ্রমিকের বেকারত্ম। ভেঙ্গে পড়ছে গ্রামীণ নিরাপত্ত বেষ্ঠনী। আবাদের ফাঁকে ফাঁকে গরু ছাগল পালনের তৃণভূমি থাকছে না। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত পুকুর খননে বিলগুলোর পানি নিস্কাশণে সমস্যা এবং শতশত বিঘা জমি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে অনাবাদি রয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পুকুর কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজন জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহায়তা কামনা করেছেন।

জানা গেছে, গত এক বছরে রাজশাহী জেলায় বাণিজ্যিক মাছের খামার বেড়েছে প্রায় ৩ গুন। মাছের উৎপাদন বাড়ায় একে সাফল্য হিসেবে দেখছে মৎস দপ্তর। তবে কৃষি দপ্তর বলছে, বাণিজ্যিক এসব পুকুর খনন হয়েছে অবাদি জমিতেই। অপপরিকল্পিত পুকুর খননে জলাবদ্ধতায় প্রতি বছরই ব্যাপক ফসলহানি হচ্ছে। পরিবেশের উপর বাড়ছে চাপ।

জেলা মৎস্য দপ্তর জানিয়েছে, ২০১৭ সালে জেলায় মোট জলাশয়ের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২৯৪ হেক্টর। এর মধ্যে বাণিজ্যিক মাছের খামার ছিল ৩ হাজার ৪৬২ হেক্টর। ২০১৮ সালে বাণিজ্যিক খামার গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৩০৯ হেক্টর। এখন জেলায় বাণিজ্যিক মাছের খামার ৪৩ হাজার ১৯৬টি। মৎস বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৯ সালে জেলায় মাছের উৎপাদন ছিল ৫২ হাজার ১৭১ টন। ২০১৮ সালে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৮৯৯ টনে। এ ক’বছরে উৎপাদন বেড়েছে ৫৫ শতাংশের উপরে। চাষের পরিধি বৃদ্ধিসহ মৎস বান্ধব নানান কর্মসূচি বাড়িয়েছে উৎপাদন। তবে মাছ চাষের জন্য কি পরিমাণ আবাদি জমি কমছে সেই তথ্য নেই মৎস দপ্তরে।

অন্যদিকে, রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে জেলায় মোট জমির পরিমাণ ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৩১ হেক্টর। এক শতাংশও আবাদযোগ্য পতিত জমি নেই। ২০০৭-২০০৮ সালেও জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৯১ হাজার ৭৮০ হেক্টর। ২০১২-২০১৩ মেয়াদে তা গিয়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৯০ হাজার ৮১০ হেক্টরে। এখন আবাদযোগ্য জমি রয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ৭৫৮ হেক্টর। এক দশকে আবাদযোগ্য জমি কমেছে ৩ হাজার হেক্টরের উপরে। এর একটি বড় অংশ চলে গেছে বাণিজ্যিক পুকুর খননে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রেণি পরিবর্তন করে আবাদযোগ্য জমিতে পুকুর খননের সুযোগ নেই। তারপরও এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি নানান কৌশলে পুকুর খনন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিল ও নিচু এলাকাগুলোতে অনাবাদি কিংবা এক ফসলি দেখিয়ে পুকুর খনন করছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুকুর-দীঘি খনন করতে পূর্বানুমতি লাগে না এমন তথ্যের ভিত্তিতে মুনাফালোভীরা সেই সুযোগটিই নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, মৎস্য খামারিরা সাধারণত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জমি বছর মেয়াদি লিজ নিচ্ছেন কাউকে জমি বিক্রি করতে বাধ্যও করছেন। তাছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে চাষাবাদ না হওয়ায় চাষিরাও জমি লিজ অথবা বিক্রি করছেন। পুকুর খনন করে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা রাখছেন না খামারিরা। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ। বিভিন্ন পত্রিকায় নিউজ প্রকাশিত হলেও কিছুতেই থামছেনা পবা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অপরিকল্পিত পুকুর খননের কাজ। এতে বিশ্লেষকরা মনে করছেন প্রশাসনের উদাসীনতা ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতা না থাকায় এ কাজ অব্যাহত রয়েছে। অনেকে ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারিদের দোষারোপ করতে ছাড়ছে না।

 

এলাকার সচেতনমহল, পরিবেশবাদি ও ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মদদেই চলছে এই পুকুর খনননের মহোৎসব। পানি নিস্কাশনের ক্যানেল না রাখায় কৃষিজীবিদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাজশাহী জেলায় দিন দিন বেড়েই চলেছে বাণিজ্যিক ভাবে মাছের খামার। কৃষি জমি লিজ নিয়ে এসব খামারের নামে চলছে মাটি বিক্রির মহোৎসব আর এসব কাজের জড়িয়ে আছে বর্তমান সরকার দলীয় বিভিন্ন নেতাকর্মীসহ স্থানীয় পৌর মেয়র ও চেয়ারম্যানগণ। স্থানীয় প্রশাসন তাদেরকে নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জানান, আগে তাও মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা হতো আটক ও করা হতো আবার টাকা দিলেই সব মাফ। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশও মসজিদ মাদ্রসার নামে চাঁদা আদায়ে নেমেছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে পবা উপজেলার বিভিন্ন মাঠে জোরেশোরে চলছে পুকুরখননের কাজ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভূক্তভোগি বলেন পুলিশ প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের মদদে বাগধানি, তেতুলিয়া ও তালুকধরমপুর মাঠে কমপক্ষে ৩০টি এস্কেভেটর গাড়ি দিয়ে রাত দিন পুকুরখননের কাজ চলছে। আর এসব খনন কাজে জড়িতরা হলেন, বাগধানি বিলে মাছের খামারি মাসুম আলী, জাহাঙ্গীর আলম, বাগধানির খোরশেদের ছেলে মুনতাজ আলী ও রাজশাহী শহরের মিঠু। সরোজমিনে গেলেই এর শতভাগ সত্যতা মিলবে।

পবা উপজেলা সহকারি কমিশনার ভূমি শেখ মো. এহসান উদ্দীন বলেন, অভিযান হচ্ছে না বিষয়টি সঠিক নয়। মঙ্গলবার (২১ ডিসেম্বর)ও পারিলা ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ডের বড়ভালাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্বপন ও রফিকের পুকুরখনন কাজ বন্ধ করা হয়েছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে কার্যকরি পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলেন তিনি জানান।

উল্লেখ, প্রতিবছরই পারিলা এলাকায় স্বপন ও রফিকুল ইসলাম, দারুশা এলাকায় মিনারুল, বাগধানি এলাকায় মাসুম, জাহাঙ্গীর, জলিল, মুনতাজ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনকে উৎকোচের মাধ্যমে ম্যানেজ করে পুকুর খনন করে থাকে বলে জানা গেছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
22232425262728
293031    
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2021. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com