শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন

আদর্শ সন্তান গঠনে মা-বাবার ভূমিকা

আদর্শ সন্তান গঠনে মা-বাবার ভূমিকা

আনোয়ারা নীনা :মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে। দিয়েছেন মূল্যবান উপহার ‘জীবন’। আমরা এ জীবনকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি নিরন্তর। মানুষ তার মনের মতো করে তার ভালোলাগাকে প্রাধান্য দিয়ে সুখী জীবনের প্রত্যাশা করে যাচ্ছে। কারণ জীবন একটাই। এ উপলব্ধি থেকে কত না যুদ্ধ করে জীবনকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা হোক সে নারী বা পুরুষ।

নারীর জীবনকে ছকবাঁধা ফ্রেমে আটকিয়ে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে যুগে যুগে। যে নারীর গর্ভ থেকে জন্ম নেয় নতুন আরেক মানব সন্তান, যে নারীর হাত ধরে শুভ সূচনা হয় কৃষির, যে নারীর বুদ্ধিমত্তায় জয়লাভ হয় যুদ্ধের, যে নারীর ভালোবাসায় টিকে আছে সভ্যতা, আবার সে নারীর জীবন হয়ে যায় কোনো এক সময় দুর্বিষহ। কেন হয় তা কি আমরা কখনো খুঁজে দেখেছি? ভারতীয় উপমহাদেশে সতীদাহ প্রথা হোক আর আজকের কম্প্রোমাইজ প্রথা হোক সব প্রথাই মূলত নারী শোষণের হাতিয়ার। আমাদের দেশের একজন নারী সে শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত হোক, কর্মজীবী হোক আর গৃহিণী হোক তাকে শোষণ করা হচ্ছে। সে জন্য দায়ী কোনো একক কারণ নয়। এর জন্য দায়ী কোনো প্রশ্ন বা প্রথা নয়।

 
একজন নারী মা, একজন নারী বোন, একজন নারী শাশুড়ি, একজন নারী স্ত্রী।মা হিসেবে একজন নারী তার সন্তানকে সবার চেয়ে ভালো করে গড়ে তুলতে চান। তাই নেমে যান পাশের বাড়ির ভাবী বা বৌদির সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। শ্রদ্ধেয় মায়েরা দয়া করে সুস্থ প্রতিযোগিতায় নামুন। অসুস্থ প্রতিযোগিতা আপনার জীবন, আপনার সন্তানের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে।

 
সন্তানের বাবা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আয় রোজগারের জন্য বাইরে থাকেন। মায়েরাও অনেকে কর্মজীবী আবার অনেকে গৃহিণী। যারা গৃহিণী তারা একজন কর্মজীবী মহিলার চেয়ে কম কর্ম সাধন করেন না। তাদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার কিছু নেই। তবে সন্তানের দায়ভারটা যেন একজন নারীরই। কোনোক্রমে একজন সন্তান ব্যর্থ হলে সব দোষ মায়ের। ভালো হলে পুরোটাই বাবার। তারপরও সন্তানের দায় দায়িত্ব নারী বা মায়েদেরই পালন করতে হয়। এত বড় দায়িত্বে উদাস হলে হবে না।
মায়েদের পাশাপাশি অবশ্যই বাবাদের এ গুরু দায়িত্বে অংশগ্রহণ থাকা আবশ্যক। বাবা শুধু আয় রোজগারে মনোনিবেশ করবেন তা মোটেও সমীচীন নয়। মা-বাবা দুজনই সন্তানের অভিভাবক।

 
কেন বললাম কথাগুলো সে প্রসঙ্গে কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলছি। একজন মা তার সন্তানকে খাইয়ে পড়িয়ে প্রতিষ্ঠানে পাঠান কিন্তু সাংসারিক অন্য কাজের জন্য আর খোঁজ নেওয়ার সময় পান না প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাল কিনা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায়। বাবারা মনে করেন এটা মায়ের দায়িত্ব। কিন্তু সন্তানের জীবন যখন দুর্বিষহ হবে তখন কি এর সঙ্গে শুধু মায়ের জীবনটাই দুর্বিষহ হবে?
তাই সম্মানিত অভিভাবক দুজনের প্রচেষ্টা একান্ত প্রয়োজন। সন্তান প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পর দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের। যাওয়া আসার পথে নয়। কেননা এ ক্ষেত্রে পুরোটা নজরদারি করা সম্ভব নয়। ব্যতিক্রম হতে পারে তবে সর্বক্ষেত্রে নয়।
সন্তান বাড়িতে যথাসময়ে ফিরে আসছে কিনা তা অনেক অভিভাবক নজরে রাখেন না। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। এরপর যদি কোনো সন্তানের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে এর জন্য তবে কি দায়ী করব কোনো প্রথা কে?
দায়ী করব কোন নারীকে? দায়ী করব প্রতিষ্ঠান প্রধান কে? দায়ী করেই বা লাভ কি? কুসন্তানের দায়ভার সবাইকে বয়ে বেড়াতে হবে। কারণ সে কুসন্তানের জন্য কলুষিত হচ্ছে সমাজ, কলুষিত হচ্ছে দেশ বা রাষ্ট্র।
আমরা শিক্ষক সমাজ চাই না কলুষিত কোনো কিছু। কেননা স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর কলুষিত সমাজের কথা শুনতে দুঃখ হয়, কষ্ট হয়।
এদিকে প্রতিষ্ঠান মোটিভেট করার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু তাতেও বাধা।
তাই প্রত্যেক অভিভাবককে খোঁজ রাখতে হবে সন্তান কার সঙ্গে কোথায় যাচ্ছে, কি খাচ্ছে, কি করছে। কোনো সন্তানই এক দিনে খারাপ হয়ে যায় না।
তাই তাদের যথাযথ গাইড করা আবশ্যক। সন্তান মানুষের মতো মানুষ না হলে পর্বত সমান সম্পদ বোঝা মনে হবে। তা ছাড়া সন্তানরা কলেজ লাইফে বা ভার্সিটি লাইফে জীবনকে বা বাস্তবতাকে যেভাবে উপলব্ধি করে স্কুল লাইফে সেভাবে করে না। স্কুল লাইফে আবেগ আর কৌতূহলে ভরপুর থাকে মন।
রবী ঠাকুর বলেছিলেন ‘তেরো-চৌদ্দ বছরের মতো বালাই আর নাই’। এ সময় আবেগ আর কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে অনেকে নানা ধরনের খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। যখন বুঝে তখন আর শোধরানোর সময় থাকে না। তাই এ সময়টা অভিভাবকদের বন্ধু হয়ে কাছে থাকা আবশ্যক।
প্রতিদিন খাবার দেওয়ার মতো অভিভাবকগণের উচিত সন্তানের স্কুলব্যাগটা একবার চেক করা, রাতে যতক্ষণ পড়াশুনা করে ততক্ষণ পাশে থাকা, স্কুলে পৌঁছলো কিনা, যথাসময়ে ফিরল কিনা, খাওয়া-দাওয়া ঠিকভাবে করছে কিনা, পরীক্ষার ফলাফল কি তা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা, প্রতিষ্ঠানে ৭ দিনে না হোক ১৫ দিনে হলেও একবার খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন।
সন্তানকে প্রত্যেক বাবা-মাই ভালোবাসেন এটা স্বাভাবিক, প্রত্যেকে বিশ্বাস করেন এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু অধিক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ও অধিক বিশ্বাস মোটেও সমীচীন নয়। বিশেষ করে সবার ক্ষেত্রেই ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগাতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই আর হতাশা, আত্মহত্যা ও দুর্বিষহ জীবন নয়। সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলময় হয়ে উঠুক প্রত্যেকের জীবন।

আনোয়ারা নীনা : প্রধান শিক্ষক
হালিমুন্নেছা চৌধুরানী মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ।


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com