বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন

প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামোর সাথে দরকার মানের গুণগত উন্নয়ন

অলোক আচার্য : সরকারের দিক থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযুগী করার প্রচেষ্টার ঘাটতি নেই। সব ধরণের যুগোপযুগী পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও আজ পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা কাঙ্খিত অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি। সম্প্রতি দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মানসম্মত করার উদ্যেগ নিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় প্রথমে ঢাকা শহরের ৩৪২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এবং প্রর্যায়ক্রমে দেশের সব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যেগ নিয়েছে।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সন্তান ভর্তি করতে আগ্রহ নেই অধিকাংশ অভিভাবকের।
উচ্চবিত্তদের আগ্রহ এক্ষেত্রে একেবারেই কম। লেখাপড়ার মান আর অবকাঠামো এসব অনাগ্রহের মূল কারণ। এই প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়গুলোতে নতুন ভবন নির্মাণ,ভবনসংস্কার,প্রাচীরতৈরি,অবকাঠামো উন্নয়নসহ ভেতর বাহিরে চাকচিক্য করা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জরিপে ৩৭
শতাংশ বেশি স্কুলের ভবন ব্যাবহারের অনুপযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেহাল দশা আর অন্যদিকে দেশে অলিতে গলিতে,বিল্ডিংয়ের কোনায় ব্যঙের ছাতার মত কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠছে। এসব হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন নিয়ন্ত্রণে কোন নজরদারি নেই। যেখানে যেমন ইচ্ছা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি বহু আইন এসব কিন্ডারগার্টেনে উপেক্ষিত।

উপেক্ষিত হওয়ার কারণ তাদের দিকে নজরদারি করার কেউ নেই। বছরের শুরুতেই নানা সুযোগ সুবিধার কথা বলে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে দেখা যায় এসব প্রতিষ্ঠানকে।
এসব কিন্ডারগার্টেনগুলোর মধ্যেই চলে রীতিমত প্রতিযোগীতা। কোন প্রতিষ্ঠান
থেকে কোন প্রতিষ্ঠান বেশি সুযোগ সুবিধা দিতে পারে। অথচ অনেক কিন্ডারগার্টেনের না আছে অনুমোদন আর না আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মত পর্যাপ্ত অবকাঠামো। তারপরও কেন ছাত্রছাত্রীরা কিন্ডারগার্টেনের দিকে ঝুঁকছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন করে সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোতে ছাত্রছাত্রী টানা যাবে না এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি।

এক্ষেত্রে লেখাপড়ার মান ও ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ অভিভাবকরা যে প্রতিষ্ঠানে ভালো ফল হয় সেখানে নিজের প্রিয় সন্তানকে ভর্তি করাতে উঠে পরে লেগে যায়। রীতিমত ডোনেশন দিয়ে হলেও ভর্তি করাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। যেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে মফস্বল এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর আসন অনেক ফাঁকা থাকে। তাহলে সমস্যা কোথায়?

কেন এত সুযোগ সুবিধা দেওয়া সত্তেও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কাঙ্খিত সাফল্য
অর্জন করতে পারছে না। কারণ ফলাফলে কিন্ডারগার্টেনগুলোই এগিয়ে থাকে।
সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল করার লক্ষ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ল্যাপটপ, প্রজেক্টর পৌছে দিচ্ছে। তাছাড়া সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালুর পরিকল্পনা করছে এবং ইতিমধ্যেই অনেক এলাকায় তা বাস্তবায়িত হয়েছে। আর শিক্ষকের কথা বললে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন যারা নিয়োগ পাচ্ছে তারা দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত। বিনা বেতনে লেখাপড়া করার সুযোগ ছাড়াও বৃত্তিও দেওয়া হয়।

এছাড়াও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ,স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণসহ আরও সুযোগ সুবিধা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে। অপরদিকে
কিন্ডারগার্টেনগুলোতে লেখাপড়া করা শিশুদের মাসে মোটা টাকা বেতন দিতে
হয়, অতিরিক্ত বই কিনতে হয়। কিন্তু তারপরও কিন্ডারগার্টেনের প্রতি যে আস্থা
জন্মেছে তা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে হচ্ছে না কেন। হলেও তা এত ধীর গতিতে
কেন? প্রথমেই একটা প্রশ্ন আসে তা হলো প্রাথমিক বিদ্যালয় যারা চাকরি
করেন তাদের সন্তানরা সবাই কি সরকারি স্কুলে লেখাপড়া করে? এমনটা দেখা যায়
যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানরা প্রায়ই এলাকার নামীদামী কোন
কিন্ডারগার্টেনে লেখাপড়া করে। সবাই না তবে এই হারটাই বেশি হবে। তাহলে
নিজের সন্তানকে যদি নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা অন্য কোন সরকারি
প্রতিষ্ঠানে দিতে আস্থা না থাকে তাহলে অন্য অভিবাবকদের দোষ দিয়ে লাভ কি?
এটা একটা কারণ মাত্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের আস্থা অর্জন করতে হলে প্রথমে নিজেকেই করে দেখাতে হবে। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে এটা করতে হবে। আমি কিন্ডারগার্টেনের উপর ভরসা করলে অন্যরা তা করবেই।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি অনেকটা দীর্ঘ বলে মনে হয়। সকাল থেকে
বিকাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি। অপরদিকে দেশের
কিন্ডারগার্টেনের সময়সূচি সকালে। দুপুর বারোটার আগেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি ফেরে।
এসব ছাত্রছাত্রীরা যখন খেলাধূলা করে
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা স্কুল শুরু করে। কিন্তু সমস্যা এখানে না। সময়টা নিয়ে দেশের শিক্ষাবিদরা একটু গবেষণা করতে পারে। একটু কমানো বা
সময়সূচিকে নতুন করে করা যেতে পারে। আর একটা বিষয় হচ্ছে একজন
সহকারি শিক্ষক হিসেবে যখন কোন যোগদান করেন তখন তাদের ভেতর পদোন্নতি পেয়ে প্রধান শিক্ষক বা সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বা তার
থেকেও বড় পদে চাকুরির আশা করতে পারে। কারণ অন্য সরকারি চাকরিতে
পদোন্নতির সুযোগ যতটা রয়েছে এখানে ততটা নেই। সহকারি শিক্ষক থেকে
প্রধান শিক্ষকে উন্নীত হলেও সেই প্রক্রিয়াও খুব দীর্ঘ। দেশের দারিদ্র পীড়িত অঞ্চলগুলোতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিস্কুট দেয়া হয়। এখন সরকার মিড ডে মিল দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে। দেশের অনেক স্থানেই মিড ডে মিল চালু হয়েছে। এই বিস্কুট দেয়া বা মিড ডে মিল চালু করা এসবের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা। এই হার একশ ভাগে উন্নীত করা। মিড ডে মিল বিস্কুট দেয়ার থেকে অনেক বেশি কার্যকর হবে এ কথা নিশ্চিত। তবে এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চালু করা অনেক বড় একটি বিষয়। সেই দিনটা সত্যি অনেক আনন্দের হবে যেদিন দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রছাত্রী মিড ডে মিলের সুযোগ পাচ্ছে। সেটা নিশ্চয়ই
বিনা মূল্যে বই বিতরণের মতই আরো বড় একটি ব্যাপার হবে। বর্তমান সরকারের
সময়কালেই এই বিরাট আনন্দের বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে বলে আমার বিশ^াস।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দক্ষ আরও একটি কারণে যে এসব শিক্ষকদের নিয়মিতভাবে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শিক্ষকদের
শিশুদের শিক্ষাদানের পদ্ধতির উন্নয়ন করা। তাহলে এত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক যে স্কুলগুলোতে শিক্ষা দেয় সেসব স্কুলের ওপর এখনও মানুষের শতভাগ আস্থা হবে না কেন? কিন্তু এসব পাওয়া প্রশিক্ষণের কতটা সে শ্রেণিতে প্রয়োগ করে সেটার
ওপর নির্ভর করে প্রশিক্ষণের সাফল্য। কেন কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির জন্য অভিভাবকরা লাইন দিয়ে দাড়িয়ে থাকবে। এটা আজকালকার অনেক অভিভাবকের একটা ফ্যাশন হয়েও দাড়িয়েছে। যে যত ভালো কিন্ডারগার্টেনে সন্তানকে ভর্তি করতে পারবে সে তত সন্তানকে নিয়ে প্রতিবেশিদের কাছে গর্ব করতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে আরও দেখা গেছে, ২০১৩ সালের পূর্বের সরকারি প্রাথমিকের
পাকা স্কুলগুলোর অবকাঠামো মাত্র ৪৭ শতাংশ ভালো পর্যায়ে রয়েছে। মাঝামাঝি
পর্যায়ে ২৩ শতাংশ আর খারাপ পর্যায়ে ৬ শতাংশ। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
দেখা গেছে যা কেবল ঢাকার চিত্র হলেও দেশের অনেক স্কুলেই এ পরিস্থিতি রয়েছে। পুরান ঢাকার পাশর্^বর্তী এলাকার ১২ টি বিদ্যালয়ে মাত্র ৩০ জন করে শিক্ষার্থী রয়েছে। একটি রুমে ক্লাস চলছে আর শিক্ষক রয়েছে পাঁচ জন করে। এই অবস্থা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও লক্ষণীয়। এমন অনেক স্কুল রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক একেবারেই কম আবার অনেক কম শিক্ষার্থী হলেও শিক্ষক অনেক বেশি। এতে করে এক স্কুলের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে এবং অপর স্কুলের শিক্ষকের মেধার ব্যাবহার হচ্ছে না। তাই শিক্ষক যদি সঠিকভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী স্কুলগুলোতে দেয়া যেত তাহলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসতো। অনেক স্কুলেই কেবল কাগজে কলমে শিক্ষার্থী বেশি দেখানো হয়। বাস্তবিক পক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকে কম। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের পদক্ষেপে বেসরকারি রেজিষ্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করা হয়েছে। আর পেস্কেল ঘোষণার সাথে সাথে শিক্ষকদের বেতনও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই শিক্ষকদের আন্তরিকতাও আরও একটু বৃদ্ধি করতে হবে।
মূলত সবকিছু থাকা সত্তেও আন্তরিকতার ঘাটতি আজও রয়েই গেছে। আগে যে
শিক্ষকদের শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য কাজ করতে হয়েছে সংসার চালানোর চিন্তায়, এখন তো আর তা করতে হচ্ছে না। অন্তত আগের সেই চাপ আর নেই। তাই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে একটু মনোযোগী হওয়া যায়। তবে আমাদের দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে শিক্ষক সংকট। বিভিন্ন সময় পত্রিকার
পাতায় এই শিক্ষক সংকটের খবর দেখতে পাই। সহকারি শিক্ষকের পাশাপাশি রয়েছে
প্রধান শিক্ষকের সংকট। নানা জটিলতায় এই সংকট পূরণ করা যাচ্ছে না। পুল ও
প্যানেল থেকে অনেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষকের সংকট কিছুটা কাটলেও তা রয়েই গেছে। তাছাড়া যেসব বিদ্যালয় গুলোতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা
হয়েছে সে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট চরমে। অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীতকরণ
প্রক্রিয়াটিও থমকে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করতে
হবে। প্রাথমিক শিক্ষাস্তর সকল শিক্ষাস্তরের ভিত্তি। সরকার এই স্তরকে শক্তিশালী করতে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর উপর আস্থা এবং কিন্ডারগার্টেন নির্ভর শিক্ষার প্রভাব কমাতে শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিযোগীতা মূলত আনাচে কানাচে গড়ে ওঠা
কিন্ডারগার্টেনের সাথে। এই তীব্র প্রতিযোগীতায় প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি গুণগত মান উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। সরকার আন্তরিক আর সেই সাথে তাদের আন্তরিক হতে হবে যারা এই শিক্ষা দানের
সাথে জড়িত এবং নিজেদের প্রমাণ করতে হবে।

অলোক আচার্য
সাংবাদিক ও কলাম লেখক
পাবনা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2019. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com