শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

অলিক মহাশক্তির সন্ধানেই বাউলরা প্রেম ও বিশ্বাস নিয়ে মাজার সঙ্গীত

অলিক মহাশক্তির সন্ধানেই বাউলরা প্রেম ও বিশ্বাস নিয়ে মাজার সঙ্গীত

নজরুল ইসলাম তোফা: বাউল সম্প্রদায়ের বিশ্বাস বাউল সঙ্গীত কিংবা মাজার সঙ্গীতই একটি বিশেষ ধর্মমত। এই মতের সৃষ্টিও হয়েছে বাংলার মাটিতেই। বাউল কূল শিরোমণি লালন সাঁইয়ের গানের মধ্যেই যেন বাউল মতের পরিচিতি লাভ করেছে। এ বাউল গান যেমন জীবন দর্শনের সঙ্গেই সম্পর্কিত, তেমনি বলা যায় সুর সমৃদ্ধ। এ মাজার বাউলদের সাদামাটা কৃচ্ছ্র সাধনার জীবন আর তাদের জনপ্রিয় লোকজ বাদ্যযন্ত্র একতারা নিয়ে গান বাজিয়ে ও গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোই তাদের অভ্যাস।

 

মাজার প্রেমী সাধারণ নারী এবং পুরুষদের সুরের জগতে প্রবেশ করার আগেই যেন ধ্যান মগ্ন হয়ে যান। পরে তারাই ইহজগতের ও পরজগতের অশেষ ফায়দা হাসিলের জন্য এক সুমহান লক্ষ্যে নিজস্ব আত্মায় যেন নিগূঢ় রহস্য খোঁজে। এই জগতের ধ্যানরত মানুষরাই শুধু আধ্যাত্মিক, তারা পীর আউলিয়ার বিশ্বাসেই অন্তরে ধ্বনিত করে অলিক এক মহা শক্তি।

 

সে শক্তিটাকেই তারা তাদের- ”খোদা” মানে। অন্তরে বিরাজমান সেই খোদা বিশ্বাসে তারা সুর পিপাসু হয়েই ‘মাজারপ্রেমী’ অজস্র হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকে। এমন প্রয়াস সৃষ্টি করেই হোক অথবা তাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণ করার জন্যই হোক, মন এবং শরীরকে সুস্থ, সতেজ রাখার জন্যই সঙ্গীতের প্রতি গুরত্বের সহিত নান্দনিক আবেদন খোঁজে বা দৃষ্টি রাখে। বহু ধাঁচের গানের দেশ এই বাংলাদেশ। মাজার প্রেমী শত সহস্র বাউলের দেশ, এই বাংলাদেশ। প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐত্যিহ্যের বিশাল সমৃদ্ধি বাউল সঙ্গীতের ভান্ডারকে নিয়ে রেকর্ড সৃষ্টিকারী লোক সংস্কৃতির নানা শাখায় বিচরণে বিনোদন পূর্ণ আধ্যাত্মিকতার দেশ, ‘সোনার বাংলাদেশ’।

 

এমন মাজার সংস্কৃতিতেই আগর বাতি, মোম বাতি, জালিয়ে কিংবা নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণেই রংবেরংয়ের বিভিন্ন প্রকারের বৈদ্যুতিক বাতির প্রয়োগ ঘটিয়ে আলোক উজ্জ্বল পরিবেশেই ভক্ত এবং মুরীদ গণদের সারা রাত্রি বিনোদন প্রদান করে থাকে। এ সমাবেশের মধ্যে তারা খোদা’র প্রতি শত সহস্র হৃদয় নিংড়ানো প্রেম-ভালোবাসা’র গভীর এক রহস্য খোঁজে পায়। এ ধ্যানমগ্ন হওয়া মানুষরাই আনন্দ-উল্লাস, বিরহ বা তাদের অন্তর শীতল করার জন্য যুগ যুগ ধরে আধ্যাত্মিকতার এমন এ লোকজ সঙ্গীতের আয়োজন করে থাকে। সুতরাং- বাউলরাই নাকি ওলী, তাই বলতেই হয়- ওলী আওলিয়ার দেশ এই বাংলাদেশ।

 

২০০৫ সালে “ইউনেস্কো” বিশ্বের মৌখিক ও দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের মাঝে বাউল সঙ্গীতকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষনা করেছে। এই বাংলাদেশে বা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সৃজনশীল সাধকদের মধ্যে ‘বাউল সম্প্রদায়’ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। এই সম্প্রদায় মূলত দেহ-সাধনা করে এবং সঙ্গীতের মাধ্যমেই সেই দেহ-সাধনার কথা প্রকাশ ও প্রচার করে। বাউলদের রচিত সঙ্গীতে ভাবের গভীরতা, সুরের মাধুর্য, বাণীর সার্বজনীন মানবিক আবেদন বিশ্ববাসীকে যেন এক মহামিলনের মন্ত্রে আহ্বান করে।

 

আবার তাদেরকেই ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘ইউনেস্কো’ বাংলার বাউল সঙ্গীতকে দি রিপ্রেজেন্টিটিভ অব দি ইন্টানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির তালিকা ভুক্ত করেছে।অবশ্য তারও আগেই বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাটের দশক হতেই যেন ইউরোপ-আমেরিকার নানা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাউলগান ও বাউলদের সাধনপদ্ধতি নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পাশাপাশি এই বাংলার বাউলগান পরিবেশন করতে গ্রামের বাউল সাধকশিল্পীগণ বিভিন্ন দেশ-বিদেশেও ভ্রমণ করেছে।

 

তবে, জাতীয় পর্যায়ে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাউলদের সাধনা কিংবা সঙ্গীত সম্পর্কে আগ্রহের সূচনা হয়ে ছিল প্রাথমিক পর্যায়েই কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, ইন্দিরা দেবী, সরলা দেবী অথবা নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের তৎপরতায়, পরবর্তীকালেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাংলার বাউল’ বা বাউল সম্পর্কে বিশেষভাবে বিশ্ববাসীকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে ছিল, এমনকি তাঁর নিজের রচনাতেও ভাবসম্পদ হিসেবে বাউলগানের ভাবাদর্শ গ্রহণ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত এ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সুর গৃহীত হয়েছিল বাউল গগন হরকার গান হতে। তাই তো এ বাংলাদেশের সঙ্গীত- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”।

 

প্রত্যন্ত গ্রাম এবং শহরের মাজারে বাউলদের কাছে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ অথবা রাত্রি বাস করেছে যারা। তারাই তো তাদের এমন অনভ্যস্ত জীবন এবং সেই জীবন যাপন করার কষ্টকর কাহিনী আবার তাদের জীবনযাত্রার অনেক স্বাদ নেয়ার ইতিহাসটাও যেন কপচাতে পারেন। তেমনিই এক বাউল প্রেমী, সঙ্গীত পাগল মানুষ শফিকুল ইসলাম শফি’র সহিত দু’দন্ড আলাপ আলোচনায় অনেক নিগূঢ় তত্ত্ব উঠে আসে। তিনি বলেন, মাজারে কতটা কি দেখেছি, আবার কি পেয়েছি তাহয়তো ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়, তবে সবাই তা বুঝবেনও না।

 

তবে একটা কথা সঠিক যে, তাদের কাছে গিয়ে যা বুঝেছি তা হলো, তারা গভীর বিশ্বাস আর মনের প্রসারতা নিয়েই এই পথে থাকে।চরম দারিদ্র্যতা রয়েছে তাদের কিন্তু মন একেবারেই খোলা আকাশের মতো। সুর জগতে তারা বিচরণের মাধ্যমে যেন খোদার নিগূঢ় ভালোবাসা পেয়ে থাকে। একটু অতীতের দিকেও যদি দৃষ্টি দিই- তা হলে বলা যায়, বাংলায় আবহমান কাল থেকেই নানা শ্রেণী ও বিভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষ বসবাস করলেও, এখন যেন মাজারে মুসলমানদের পরিমানটা খুবই বেশী। কিন্তু এক সময়েই দেখা যায় বৌদ্ধ ও হিন্দুদের আধিপত্য ছিল তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এই দেশের সেন বংশের পর থেকে ইসলাম প্রচার কিংবা প্রসার ঘটেছে।

 

আর ঠিক তখন থেকেই- অনেক পীর, ওলি ও আউলিয়ার আবিভাব ঘটে থাকে। সুতরাং তাদের মৃত্যুর পরেই সমাধিস্হলে মাজার রূপ নেয়। মাজার গুলোতে ধিরে ধিরেই বিনোদন পূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ দেশের ৬৪ জেলায় ছোট বড় অনেক মজার এবং তার বিনোদনের ইতিহাসও রয়েছে। এমন এই ইতিহাস এবং ঐতিহ্যকে খন্ড খন্ড করে আলোচনায় আনা না গেলেও সমষ্টিগত ভাবেই মাজার সংস্কৃতির গানের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা নিয়ে শ্রদ্ধেয় এক বাউল শিল্পী ও স্বরচিত সঙ্গীত রচয়িতা, গুনিজন শফিকুল ইসলাম শফিকের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। এই দেশের সঙ্গীতের গৌরবময় ইতিহাস, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে না উঠলে সম্ভব হতোনা এমন মাজার সংস্কৃতি। মাজার সংস্কৃতির সঙ্গীত আজকে গুরুত্ব পূর্ণ সঙ্গীত বিনোদনের অঙ্গও বলা যেতে পারে। এমন এ সঙ্গীত আবার বিভিন্ন উপাদানেই মাজারকে সমৃদ্ধ করেছে।

 

এই সকল উপাদানে শ্রুতি, স্বর, রাগ, গ্রাম, অলঙ্কার, রস, বর্ণ, ভাব ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত না করলে- মাজারের বিনোদন পূর্ণতা পেতনা। এই সংগীতের এমন সকল উপাদানের মহিমা বা মাধুর্য’কে ইতিহাসের নিরীখেই আজো মানুষের কাছে মাজার বাউলগণেরা অক্লান্ত ভাবে এ সঙ্গীতের আধ্যাত্মিকতা অনুশীলন করছে। অন্যদিকে মাজারভক্ত অনেকে সঙ্গীতের ইতিহাসের বিচিত্র উপাদান সংগ্রহেও ব্যস্ত আছে। এ ভাবে যেন আরো রচিত হচ্ছে এ মাজার ভিত্তিক সঙ্গীত শাস্ত্রের নানা রূপ নানা দিক। আসলে বলা যায়, আদিম যুগ থেকে ক্রমবিবর্তনের মাঝ দিয়েই বর্তমান যুগ পর্যন্ত যে এক ধারাবাহিকতা সঙ্গীতের ভেতর পাওয়া যায়, সেটাই হলো সঙ্গীতের ইতিহাস। তেমনি ভাবেই দিনে দিনে এই দেশে এসেছে মাজার সংস্কৃতি। সাধারণত মানুষের মন, চিন্তা এবং তাদের ভাবের রাজ্যেই যেন অহর্নিশি বিচরণের সংস্কৃতিই- এই মাজার বিনোদন। তাই তাদের এ সঙ্গীতই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা। সঙ্গীত মানুষকে জন্ম-মৃত্যুর পারে নিয়ে যায় এবং তাদেরকেই শাশ্বত শান্তি দান করে।

 

বাংলার “বাউল”, বাউল মত কিংবা বাউলসঙ্গীত তথা বাউলগান নিয়ে নানা জনের নানা মত প্রচলিত। এই মতানৈক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে “বাউল” শব্দটি। আসলে, এমন বাউল শব্দটির অর্থ, তাৎপর্য, উৎপত্তি ইত্যাদি নিয়ে অদ্যাবধি গবেষকরা কোনো সু-নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দিতেও পারে নি। তেমনিও বাউল মতের স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যেন তাদেরকে কোনো সু-নির্দিষ্ট ধারণা প্রদান করতে পারেনি। নানা জনের নানা মত নিয়েই এমন এ ”বাউল মত” বিষয়ে অমীমাসিংত আলোচনা চলছে কিংবা আগামীতেও তা চলমান থাকবে বলেই ধারণা করা যায়।

 

 

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
22232425262728
29      
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com