শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৬:০০ অপরাহ্ন

যশোর আদালতে এক বিচারকের ঘাড়েই ৯ হাজার মামলা

যশোর আদালতে এক বিচারকের ঘাড়েই ৯ হাজার মামলা

ইয়ানূর রহমান : যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারক সংকটের কারণে মামলার জট শুরু হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন বিচারকের ঘাড়েই বর্তমানে ৯ হাজার মামলার বোঝা। মামলা জট নিরসনে যে চারটি আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা, এ চার আদালতের তিনটিতেই দীর্ঘদিন ধরে বিচারক নেই। ফলে চার বিচারকের কাজ করছেন মাত্র একজন।

বিচারক না থাকায় এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ সমস্যা নিরসণে আইনজীবী সমিতির চিঠি চালাচালি, আইনজীবী সংগঠনগুলোর একের পর এক মানববন্ধন এবং সমাবেশ করেও প্রতিকার পাচ্ছে না।

গত বছরের ১৯ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক মুরাদ এ মাওলা সোহেল একই সঙ্গে বদলি হন। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এর চারটি আদালতের দু’টিই বিচারক শূন্য হয়ে পড়ে। এ সময় এ দু’টি আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব পান অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চতুর্থ আদালতের মোহাম্মদ সামছুল হক।

চার মাস এভাবে চলার পর ওই বছরের ২৮ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চতুর্থ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সামছুল হকও বদলি হয়ে যান পিরোজপুরে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ এ তিনটি আদালতই বিচারক শূন্য হয়ে পড়ে। এ তিন আদালতের দায়িত্ব পান অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের তৎকালীন বিচারক নাজির আহম্মেদ।

এক পর্যায়ে ওই বছরের ৬ নভেম্বর সাতমাস বিচারক শূন্য থাকা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতে যোগদান করেন আয়েশা নাসরিন। কিন্তু কয়েক দিনের মাথায় অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক নাজির আহম্মেদের বদলিতে হতাশ হয়ে পড়ে সাধারণ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা।

এরপর থেকে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক আয়েশা নাসরিনের কাঁধে আসে এ গুরুত্বপূর্ণ চার আদালতের ভার। সেই থেকে এভাবেই চলছে। এ কারণে ভোগান্তির শেষ থাকছে না বিচারপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের। প্রতিদিন বিচারক শূন্য আদালতের পেশকাররা মামলার নথি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত বিচারকের টেবিলে যাচ্ছেন আর তারিখ পরিবর্তন করে আনছেন।

বিচারপ্রার্থীদের এটি চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকছে না। বিচারক না থাকার কারণে বিচারপ্রার্থীরা একদিকে যেমন তাদের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন বিচারকশূন্য আদালতের মধ্যে নাজুক অবস্থায় আছে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতটি। এখানে এক বছর তিনমাস ধরে কোনো বিচারক আসেননি। বর্তমানে এ আদালতে মামলার স্তুপ হয়ে রয়েছে। মে মাসের ২৭০১ টি মামলা নিয়ে জুন মাস শুরু হয়। এ মাসে এ আদালতে আরো ৩৮টি মামলা গৃহীত হয়েছে। ২৭০৩৯ টি মামলার মধ্যে মাত্র আটটি মামলা গত জুন মাসে নিষ্পত্তি হয়। এ আদালতে বর্তমানে দায়রা মামলা ১৫০১৬ টি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৮১৪টি, এসিড মামলা একটি, ফৌজদারী আপিল ২১৯ টি, সন্ত্রাস মামলা দু’টি, রিভিশন মামলা ১৭৭ টি, বিবিধ একটি ও এসিড সিআরআর একটিসহ সর্বমোট ২ হাজার ৭৩১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে এ আদালতে বিচারাধীন ছিল ২ হাজার ৩৩০টি মামলা। গত আট মাসে এ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৪০১টি। এছাড়া, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৪র্থ আদালতে গত ২৮ আগস্ট অতিরিক্ত বিচারক মোহাম্মদ সামছুল হক বদলির পর থেকে এগারো মাস ধরে বিচারক শূন্য হয়ে আছে। এ আদালতে গত মে মাসের ২ হাজার ৫২৫টি মামলা নিয়ে শুরু হয় জুন মাস। এ মাসে এ আদালতে ১৯টি মামলা গৃহীত হয়। ২ হাজার ৫৪৪টি মামলার মধ্যে জুন মাসে মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়।

এ আদালতে বর্তমানে দায়রা মামলা ১ হাজার ৩১০টি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৭ ৮৫টি, ফৌজদারী আপিল ২৬২টি, ফৌজদারী রিভিশন মামলা ১৮৪টি ও ১টি সন্ত্রাস মামলাসহ সর্বমোট ২ হাজার ৫৪৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

গত বছরের অক্টেবরে এ আদালতে ২ হাজার ২৫১টি মামলা বিচারাধীন ছিল। আট মাসে এ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৯২টি। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতে এ বছরের ৩০ এপ্রিল বিচারক নাজির আহম্মেদের বদলির পর তিন মাস ধরে বিচারক শূন্য হয়ে পড়ে আছে।

এ আদালতে গত মে মাসের ২ হাজার ২১১টি মামলা নিয়ে জুন মাস শুরু হয়। এ মাসে এ আদালতে ৩৩টি মামলা গৃহীত হয়। ২ হাজার ২৪৪টি মামলার মধ্যে জুন মাসে এ আদালতেও মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ আদালতে বর্তমানে দায়রা মামলা ১ হাজার ২০০টি, বিশেষ ট্রাইবুনাল ৭৬২টি, ফরেন এক্স ১টি, ফৌজদারী আপিল ১৪৮টি, ফৌজদারী রিভিশন মামলা ১২০ টি, ৪টি সন্ত্রাস মামলা ও ৭টি এসিড মামলাসহ সর্বমোট ২ হাজার ২৪৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে এ আদালতে ১ হাজার ৯১৭টি মামলা ছিল। যা আট মাসে বেড়েছে ৩২৬ টিতে। অর্থাৎ বিচারক শূন্য থাকা এ তিনটি আদালতে বর্তমানে ৭ হাজার ১৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত মাসে এ তিন আদালতে মাত্র ১১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

এ মামলাগুলো বিচারিক কার্যক্রম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের উপর ন্যস্ত রয়েছে। এছাড়া ২য় আদালতেও বর্তমানে ২ হাজার ৮১৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেক্ষেত্রে যশোরের গুরুত্বপূর্ণ এ চার আদালতে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮৩৩টি মামলা রয়েছে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক আয়েশা নাসরিনের ঘাড়ে।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, যশোর চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারিক কার্যক্রমের জন্য জেলা জজ আদালতে মামলা বদলির সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় পেন্ডিং থেকে যাচ্ছে অসংখ্য মামলা। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যশোর জজ আদালতে ৬৭৬টি, মে মাসে ৬৮৩ টি ও জুন মাসে ৫২১ টি মামলা সর্বমোট এ তিনমাসে ১ হাজার ৮৮০টি মামলা রিসিভ হয়ে বর্তমানে ১৭ হাজার ৯৭৬টি মামলা পেন্ডিং রয়েছে। জেলা জজ আদালত থেকে এসব পেন্ডিং মামলার অধিকাংশই অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের চারটি আদালতে বদলি করা হয়।

কিন্তু এসব আদালতে বিচারক না থাকায় মামলা জট বেড়েই যাচ্ছে। এ মুহূর্তে বিচারক সঙ্কটের সমাধান না হলে ভবিষ্যতে যশোর আদালতে বিচারাধীন মামলার অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

এ বিষয়ে যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয় নিয়ে তারা জেলা জজ, ডিসিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু মোর্ত্তজা ছোট জানান, আমাদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দফতরে বার বার বিষয়টি নিয়ে অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু শূন্য পদ পূরণ করা হচ্ছে না। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিচার প্রার্থীদের ৷

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2019. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com