মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন

রাজশাহীতে অডিট সুপারের ঘুষের চাপে দিশেহারা সরকারী চাকরিজীবীরা !

রাজশাহীতে অডিট সুপারের ঘুষের চাপে দিশেহারা সরকারী চাকরিজীবীরা !

নিজস্ব প্রতিবেদক:: অডিট সুপারের ঘুষের চাপে দিশেহারা রাজশাহীর সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ঘুষ না দিলে ওঠে আপত্তি, আটকে দেয়া হয় বেতন। বদলি, পদায়ন, এমনকি পেনশনেও গুনতে হয় ঘুষ। ফলে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয় চাকরিজীবীদের।

রাজশাহীর ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব একাউন্টস (ডিসিএ) দপ্তরের এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট মো: মাইনুদ্দীনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
সম্প্রতি দুই লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের দপ্তরের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার ৭ সার্ভেয়ারের বেতন-বিল আটকে দেন তিনি।

ঘটনা জানাজানি হবার পর মঙ্গলবার এসএএস শাখা থেকে অভিযুক্ত মাইনুদ্দীনকে প্রাক অডিট ১ শাখায় বদলি  করেছেন বিভাগীয় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা।

ভুক্তভোগী ওই সাত জনের ভাষ্য, সার্ভেয়ার পদে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের বেতন স্কেল আলাদা। তবে ২০০৫ সালে এই পদের বেতন স্কেল ৩০০০-৫৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৩০০-৬৯০০ টাকা নির্ধারণ হয়। ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিল থেকে বিধি অনুযায়ী বেতন স্কেলের বেতন পাচ্ছিলেন তারা।

এর আগে হিসাবরক্ষণ কর্মকতা সাইফুল ইসলাম ভুক্তভোগীদের একজন তৃসিত কুমার সাহার ‘ফিক্সেশন’ করেন। গত আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারিত বেতন স্কেলে বেতন উত্তোলণ করেছেন তারা প্রত্যেকেই। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর ওই মাসের বেতন-বিল দাখিল করেন।

কিন্তু এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট মাইনুদ্দীন নীরিক্ষণের নামে সর্বশেষ বেতন-বিল আটকে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, এই ৭ জনের ‘ফিক্সেশন’ সঠিক হয়নি। এনিয়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার বরাবর ফেরৎ স্মারকলিপি দেন মাইনুদ্দীন।

ভুক্তভোগী তৃসিত কুমার সাহার অভিযোগ, এসএ এস সুপারিনটেনডেন্ট মাইনুদ্দীন তাদের সাত জনের কাছে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। কিন্তু তারা ঘুষ দিতে রাজি হননি। আর এই কারণেই তাদের বেতন-বিল আটকে ফেরৎ স্মারকলিপি দিয়েছেন। এরপর লিখিত জবাব দিয়েছেন তারা।

তৃসিত কুমার সাহা আরো বলেন, সার্ভেয়ার পদের ফিক্সেশনের বিষয়টি দেশজুড়ে মিমাংসিত। ফলে দেশজুড়ে এই পদের কর্মরতরা একই বেতন স্কেলে বেতন উত্তোলন করছেন। কোথাও কোন আপত্তি নেই।

এমনকি রাজশাহীর ডিসিএ দপ্তর গত সেপ্টেম্বরের বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর, জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ের এসএ শাখা, জোনাল ও দিয়ারা সেটেলমেন্ট অফিস এবং বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের সার্ভিয়ারদের বিল ছাড় করেছে। তাদের বিলে আপত্তি উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলেও অভিযোগ করেন এই ভুক্তভোগী।

এদিকে, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে জিম্মি করে এসএ এস সুপারিনটেনডেন্ট মাইনুদ্দীনের ঘুষ আদায়ের নানান তথ্য। তবে এনিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি ভুক্তভোগীরা।

নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, প্রত্যেকবার বিল দাখিলের সময় মোটা টাকা ঘুষ নেন মাইনুদ্দীন। যারা ঘুষ দিতে আপত্তি করেন তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। ফলে ঝামেলা এড়াতে ঘুষ দিয়ে বিল ছাড় করিয়ে নেন অনেকেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট মাইনুদ্দীন কর্মচারীদের বদলির সময় এলপিসি তৈরিতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নেন। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জিপিএফ খুলতে নেন একই পরিমাণ ঘুষ। আর পেনশনের ক্ষেত্রে খুষ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৫০ হাজারে।

কর্মকর্তা বা কর্মচারী বদলি হয়ে রাজশাহীতে এলে বেতন ভাতা ও নাম রেজিস্ট্রারে তুলতে দাবি করেন মোটা ঘুষ। ঘুষ না দিলে মাসের পর মাস ঘুরাতে থাকেন। আটকে যায় বেতন-ভাতা।

ঘুষ গ্রহণ ও দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন এসএএস সুপারিনটেনডেন্ট মো: মাইনুদ্দীন। তিনি বলেন, ওই সাত সার্ভেয়ারের বেতন-বিল নির্ধারণে জটিলতা ছিলো। এ জন্যই সেটি আটকে গিয়েছে। তবে পরে তাদের বিল ছাড় দেয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তার ঘুষ দাবির অভিযোগ তার জানা নেই বলে জানিয়েছেন ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব একাউন্টস গৌরাঙ্গ চন্দ্র দেবনাথ। তিনি বলেন, তাদের বেতন নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা ছিলো। সেটি নিয়ে ভুক্তভোগীরা তার দপ্তরে এসেছিলেন। তবে ঘুষ দাবি করা হয়েছে এমনটি তারা বলেননি। অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ^াস দিয়েছেন তিনি।

অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার দপ্তর বদলির বিষয়ে ডিসিএ গৌরাঙ্গ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, মাইনুদ্দীন প্রাক অডিট-২ বিভাগে দায়িত্বপালন করছিলেন। তাকে সেখান থেকে সরিয়ে প্রাক অডিট-১ এ আনা হয়েছে। ঘুষকাণ্ডে নয়, বরং কার্যক্রমে সমন্বয় আনতে তাকে সেখানে আনা হয়েছে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

©2014 - 2019. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com