মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

রামেকে হাসপাতালের ভেতরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দালালচক্র: অতিষ্ঠ রোগী-স্বজনরা

রামেকে হাসপাতালের ভেতরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দালালচক্র: অতিষ্ঠ রোগী-স্বজনরা

মাসুদ রানা রাব্বানী: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নারী দালালচক্র। এই নারী দালালদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগি ও তার স্বজনরা।রাজশাহীসহ দূরদুরান্তÍ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগিরা এই নারী দালালদের কথা না শুনলে তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আর মাঝে মাঝেই রোগি ও স্বজনদের উপরে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাও ঘটছে।

 
গত কয়েক সপ্তাহ আগেই কাপাসিয়া থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগির স্বজনকে বহির্বিভাগ থেকে প্রকাশ্যে সকলের সামনে বাইরে নিয়ে চড় মারতে থাকে এক নারী দালাল। পরে লোকজন এগিয়ে এলে দালাল পালিয়ে যায়।এছাড়াও দীর্ঘদিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই অনেক নারী রোগি-স্বজনদের ব্যাগে থাকা মোবাইল-টাকা পায়সা চুরি হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় পুলিশের হাতে বহিরাগত চোর আটক হলেও এ সকল ট্রলি বহনকারী নারীরা আটক হচ্ছেনা। এতে অনেকে সব হারিয়ে চিকিৎসা না নিয়ে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তার উপরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে এই নারী দালালরা। গত কয়েক দিন ধরে সরেজমিনে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

 
দালালদের দৌরাত্ম্যে নিরব ভূমিকা পালন করছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের দায়িত্বরত আনসার সদস্যেদের সামনেই চলছে এই নির্যাতন। তারাও বিষয়টিকে না দেখার ভান করেছেন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী মদত ও যোগসাজশে পুরো হাসপাতাল জুড়েই দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে এই নারী দালালরা।এদিকে হাসপাতালে কর্তব্যরত কিছু চিকিৎসক ও কর্মকর্তা প্রতিবাদ করলেও তাদেরকে দেখানো হচ্ছে ভয়ভীতি। ফলে মানসম্মানের ভয়ে তারাও কিছু বলতে পারছে না। গত সপ্তাহের কয়েকদিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগের পুরো এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নারী দালালরা।

 

 
রোগি ও তার স্বজনরা বের হলেই ব্যবস্থাপত্র নিয়ে কয়েকজন দালাল টানাটানি করছেন। কিন্তু রোগিদের এমন বিড়ম্বনায় পাশেই দাঁড়িয়ে থেকে দেখছেন কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা।অনেক দালাল প্রকাশ্যেই বলছেন, সবাইকে ম্যানেজ করেই তারা হাসপাতালে কাজ করেছেন। প্রতি সপ্তাহে সবাইকে টাকার ভাগ দেয়া হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে নারী দালালরাই রোগি ও স্বজনদের বিরুদ্ধে নিজের শ্লীলতাহীনর অভিযোগ করছে। আর এই ভয়ে নিজের মানসন্মানের কথা চিন্তা করে কেউ কিছু বলছে না।

 

 
অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় তিনগুন বেশি রোগি থাকায় চিকিৎসকরা সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে পারছেন না। বিপুল সংখ্যক রোগির নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা। বহির্বিভাগে কয়েক হাজার মানুষের নিরাপত্তায় প্রতিদিন সকালে থাকছে মাত্র ২ জন কনস্টেবল। অন্যদিকে রাামেকে নারীদের জন্য নেই কোনো নারী পুলিশ। তবে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগিদের মধ্যে সিংহ ভাগই নারী।

 

 
দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও দু’একদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বৃদ্ধি করা হলেও তা অনেকটা লোক দেখানো। অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। বিভিন্ন সময় হাসপাতাল থেকে এই নারী দালাল চক্রের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও কয়েকদিনের মাথায় ছাড়া পেয়ে আবারো কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।এ চক্রের মূল হোতারা বরাবরের মতই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এ বিষয়ে রোগির স্বজন পরিচয়ে কৌশলে কথা হয় একাধিক নারী দালালের সাথে। যারা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রোগি ভাগিয়ে নিয়ে লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

 
তারা জানান, হাসপাতাল কতিপয় কর্মচারীকে মাসোহারা দিয়েই এ কর্মকা- চালানো হচ্ছে। বর্তমানে কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যরা নারী রোগি ও তাদের স্বজনদের লক্ষ্মীপুরের ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে নারী দালালের সংখ্যা ১০০ এর বেশিতে ঠেকেছে।

 
সকলেই শতকরা ৫০ শতাংশ কমিশনে কাজ করে। এ কমিশনের টাকা আসে রোগির কাছ থেকে আদায়কৃত অংশ থেকে। তবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করার অজুহাতে প্রতিটি দালালের কাছ থেকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা কেটে রাখছে সিন্ডিকেট। আর ওষুধ বিক্রির দিক থেকেও সিন্ডিকেটের শরণাপন্ন কয়েকটি ফার্মেসি। এই দালালচক্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয় একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকে।

 

 
খোদ হাসপাতালের কিছু অসাধু চিকিৎসক, সেবিকা ও স্টাফ রোগিদের নির্দিষ্ট ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার জন্য বাধ্য করে থাকে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও রোগিরা অন্য স্থান থেকে ওষুধ কিনতে পারেন না। কখনো কিনলেও তারা রোগিদের প্রতি অবহেলা দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে।

 
তথ্যমতে জানা যায়, স্থানীয় প্রশাসনের কতিপয় ব্যক্তিকে ম্যানেজ করেই তারা তাদের এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধের দোকান ও বেসরকারি হাসপাতালের শেয়ারহোল্ডার বা মার্কেটিং অফিসারের ব্যানারেও এই অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 
এসব দালাল চিকিৎসা নিতে আসা রোগিদের ধরতে বহির্বিভাগসহ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়ে থাকছে। রোগিদের ভাল চিকিৎসা দেয়ার নাম করে সুযোগ বুঝেই তারা তাদের পছন্দমত নি¤œমানের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।

 
আর সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন হিসাবে ৫০ শতাংশ টাকা পেয়ে যাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান বন্ধ রাখা এবং শাস্তি নিশ্চিত না করায় তারা বেপোরোয়া হয়ে উঠেছে। আর এদের কার্যক্রমে হাসপাতালেরই বিভিন্ন শ্রেণির স্টাফ সহযোগিতা করছে। তবে মাঝে মধ্যে দু’একটি করে চুক্তিহীন দালাল ধরা পড়ছে। যাদেরকে দালাল সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকেই ধরিয়ে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 
সূত্রমতে, রামেক হাসপাতালকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুর ও ঘোষপাড়া মোড়সহ আশেপাশের দুই শতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে ১০/১২টি ছাড়া সবগুলোই এখন দালাল নির্ভর। সেসব প্রতিষ্ঠানে রোগী আনতেই রামেক হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোরে আড়াই শতাধিক দালাল কাজ করে। এর মাঝে নারী দালাল শতাধিক।

 
রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌসও বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দালালদের উৎপাত খুবই বেড়ে গেছে। নারী দালালও তাদের মাঝে একই চিত্র। আমরা প্রতিদিনই অভিযান চালিয়ে দালালদের ধরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে তুলে দিই কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কারাগার থেকে তারা ঠিকই বের হয়ে আসে। দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধের বিষয়ে আমরা যথেষ্ট আন্তরিক। কিন্তু পারছি না। দালালদের দৌরাত্ম্য আর রোগির স্বজনদের ভিড় যদি কমানো যেত তাহলে চিকিৎসাসেবা আরো উন্নত করা সম্ভব হতো।

 
এদিকে রামেকে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগিরা জরুরী বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর নির্ধারিত ওয়ার্ডে যাওয়ার জন্য স্বজনরা রোগী বহনকাজে ব্যবহৃত ট্রলি খোঁজেন।রামেক হাসপাতাালে রোগী বহনকাজের নারীরা ট্রলিতে করে রোগী নির্ধারিত ওয়ার্ডে পৌঁছে দিয়ে বখ্সিস চান। ৪০/৫০ টাকায় তাদের হাতে দিলে মন ভরেনা। তারা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করে থাকে। না দিতে পারলে অশ্লিল ভাষায় কথা বলাসহ। হুমকিও দিয়ে থাকে। এ নিয়ে ভর্তি রোগীদের অভিযোগের শেষ নেই। হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে সব মিলেয়ে হাসপাতালের ভেতরে বাইরে চরম দৌরাত্ম্য।

 
অপর দিকে হাসপাতালের ভেতরে পাবলিক টয়লেটের সামনে ফুটপাাতে ফ্রিজ ও টেবিলে বেকারীর মালামাল বিক্রেতা দোকানদার সকল প্রকার সামগ্রীর থেকে ২/৩ টাকা বেশি নিচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিক আইরিন খানম হাফ লিটার বোতলের পানি নিয়ে ১৫ টাকা দেন দোকানীকে। এ সময় দোকানী আরো দুই টাকা দাবি করেন। কারন জানতে চাইলে দোকানী বলেন, আমি সকল পন্যের মূল্য ২/৩টাকা বেশি নেই।

 
সাংবাদিক আইরিন খানম বলেন, রাজশাহী বিভাগের সকল জেলা থেকে আসহায় গরিব রোগীরা রামেক হাসপাতালে এসে ভর্তি হন চিকিৎসা খরচ সাশ্রয়ী আর ভাল চিকিৎসার জন্য। কিন্তু হাসপাতালে যতটুকু খরচ সাশ্রয়ী করেন। তা হাসপাতালের বাইরে ও ভেতরে দালাল আর দোকানিদের দিয়েই তারা প্রতিনিয়তই সর্বশান্ত হচ্ছেন। এসকল অনিয়মের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সূদৃষ্ঠি কামনা করেন তিনি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

©2014 - 2019. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com