বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও একটি স্বপ্ন পূরণ

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও একটি স্বপ্ন পূরণ
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও একটি স্বপ্ন পূরণ

১১ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্য আহসানুল ইসলাম (টিপু) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) সহ দেশের ৩০টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।

তিনি বলেন, ‘৪৫টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩০টি চ্যানেল সম্প্রচার করছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন গত ৩০ মে থেকে এবং ১ অক্টোবর থেকে ৩০টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।’

যেভাবে তৈরী হয়েছিল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১:

কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট হলো মহাকাশে উৎক্ষেপিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবিত উপগ্রহ। কৃত্রিম উপগ্রহ এমনভাবে পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান হয়, যাতে এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা বহির্মুখী শক্তি ওকে বাইরের দিকে গতি প্রদান করে – কিন্তু পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। উভয় শক্তি কৃত্রিম উপগ্রহকে ভারসাম্য প্রদান করে এবং কৃত্রিম উপগ্রহটি পৃথিবীর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। যেহেতু মহাকাশে বায়ুর অস্তিত্ব নেই তাই এটি বাধাহীনভাবে পরিক্রমণ করে । কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বৃত্তাকারে পরিক্রমণ করে না, তার গতি ডিম্বাকৃতির।

টিভি ও বেতার সংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে।

আধুনিক ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে স্যাটেলাইটের বিকল্প নেই । এই ধারনা নিয়ে বাংলাদেশও উন্নত বিশ্বের ন্যায় একটি স্যাটেলাইটের প্রয়োজন অনুভব করে। এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে।

এরপর ২০০৯ সালে জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিটের (আইটিইউ) কাছে ইলেক্ট্রনিক আবেদন করে।

কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থার নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’কে নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে এক হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি। এর পর সেখানেই ধীরে ধীরে কোটি বাঙ্গালির স্বপ্ন তৈরি হতে থাকে। আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে যাই আমরা।

এরি ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে বিটিআরসি রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে।

সকল মহাযজ্ঞ শেষে ২০১৮ সালের ১২ মে বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ‘স্পেস এক্স’-এর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী যান ফ্যালকন-৯-এর সর্বশেষ সংস্করণ ব্লক-৫ বুস্টারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়।

এর মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যোগ হয় বাংলাদেশ। এটি ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫ রকেটের প্রথম পেলোড উৎক্ষেপণ ছিল।

বঙ্গবন্ধু-১ কৃত্রিম উপগ্রহটি ১১৯.১° ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার ভূস্থির স্লটে স্থাপিত করা হয়। এটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ১৬০০ মেগাহার্টজ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ৪০টি কে-ইউ এবং সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার বহন করবে এবং এটির আয়ু ১৫ বছর হওয়ার কথা ধরা হয়েছে।স্যাটেলাইটের বাইরের অংশে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশার উপর ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু ১। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও সেখানে রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট থেকে ৩ ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে।

টিভি চ্যানেলগুলো তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য স্যাটেলাইট ভাড়া করে। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট চ্যানেলের সক্ষমতা বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। আবার দেশের টিভি চ্যানেলগুলো যদি এই স্যাটেলাইটের সক্ষমতা কেনে তবে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। এর মাধ্যমে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস চালু সম্ভব।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকোয়েন্সি ক্ষমতা হলো ১ হাজার ৬০০ মেগাহার্টজ। এর ব্যান্ডউইথ ও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে ইন্টারনেটবঞ্চিত অঞ্চল যেমন পার্বত্য ও হাওড় এলাকায় ইন্টারনেট সুবিধা দেয়া সম্ভব। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং সেবা, টেলিমেডিসিন ও দূরনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারেও ব্যবহার করা যাবে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।
বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ে। তখন এর মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে।

দেশের প্রথম টিভি হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন(বিটিভি) তাদের অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু করে। গত ২অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মাধ্যমে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর বাণিজ্যিক সম্প্রচারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন।

বঙ্গবন্ধু-১ কৃত্রিম উপগ্রহটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর বাংলাদেশের ভূ-কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই জন্য গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় ভূকেন্দ্র তৈরি করা হয়। জয়দেবপুরের ভূ-কেন্দ্রটি হল মূল স্টেশন। আর বেতবুনিয়ায় স্টেশনটি দ্বিতীয় মাধ্যম ব্যকআল হিসেবে রাখা হয়। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে দুটি ভূ-উপগ্রহ উপকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।

ঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পাঠানো বাংলাদেশের কাছে ছিলো অন্যরকম এক চ্যালেঞ্জ। অনেক বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশ আধুনিকায়নের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2019. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com