শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষে স্বাবলম্বী সানজিদা

বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষে স্বাবলম্বী সানজিদা

আব্দুর রউফ রিপন, রাণীনগর : কুজাইল দক্ষিণপাড়া নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ছোট যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত ছবির মতো একটি ছোট্ট গ্রাম। সেই গ্রামেরই বাসিন্দা একজন সফল নারী সানজিদা আক্তার তৃশা। নদীর তীরে স্বামীর পরিত্যাক্ত জমিতে সবজি চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন তিনি। স্বামীর পাশাপাশি তিনিও এখন নিজের সংসারে বড় ভূমিকা রাখছেন। তা দেখে উৎসাহিত হচ্ছে পাশ্ববর্তী নারীরাও।

 

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার ২নং কাশিপুর ইউনিয়নের কুজাইল গ্রামে ছোট যমুনা নদীর তীরে গেলে চোখে পড়বে সবুজে ঘেরা সবজি খেত। খেতের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে পেয়াজ, রসুন, আলু, ধনিয়া, মরিচ ও মুলার গাছসহ নানা সবজির গাছ। প্রায় ৩বছর আগে সানজিদা পার্শ্ববর্তী এক কৃষকের সবজি চাষ দেখে অনুপ্রাণিত হোন। ‘পুরুষেরা পারলে মেয়েরা কেন পারবে না’ এই ইচ্ছাশক্তি থেকে সানজিদাও শুরু করেন সবজির চাষ।

 

সানজিদা বলেন, এক সময় সংসারের কাজকর্ম শেষ করার পর অলস বসে বসে সময় কাটাতাম। পাশের এক কৃষক নদীর তীরে তার জমিতে বছরের পুরো সময় কোন না কোন সবজি চাষ করতো। সেই কৃষক নিজের পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে বাজারে সবজি বিক্রি করে ভালো লাভ করতো। তখন আমার মনে একটি জেদ কাজ করলো যে ‘পুরুষরা পারলে আমি পারবো না কেন’। তখন আমার স্বামীর সহযোগিতা নিয়ে শুরু করি সবজি চাষ। সবজি চাষের প্রথম বছরে বাজারে আমার জমির মূলা সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছিলো।

বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষে স্বাবলম্বী সানজিদা

 

তিনি বলেন, জমিতে সার-বীজ বপন, পানি সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে ফসল রক্ষণাবেক্ষনের সব কাজ নিজেই করি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমি নিজের খেতে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে নিজের পরিবারকে খাওয়াতে পারছি। কারণ বর্তমান বাজারের প্রতিটি সবজিতেই দেওয়া থাকে মাত্রারিক্ত সার ও কীটনাশক, যা মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আমি প্রতিমাসে নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর বাকি সবজি বাজারে বিক্রি করে বছরে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করছি। সেই অর্থ দিয়ে নিজের সন্তানদের পড়ালেখার খরচ যোগানসহ অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে পারছি। আমার দেখাদেখি আশেপাশের অনেক নারীরা এই সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে।

 

ওই গ্রামের হালিমা খাতুন বলেন, আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করে। আমার সংসারে এক সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। সানজিদা আপার পরামর্শে আমিও বাড়ির আঙ্গিনায় অল্প অল্প করে শিম, লাউ, পালংশাকসহ নানা প্রজাতির সবজি চাষ করছি। এখন আমার সংসারের জন্য বাজার থেকে তেমন সবজি কিনতে হয় না। নিজের সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে অতিরিক্ত সবজিগুলো বাজারে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছি।

 

একই গ্রামের শবনব আক্তার বলেন, সানজিদা আপার দেখাদেখি আমিও বাড়ি উঠানে ও পরিত্যাক্ত জমিতে সবজি চাষ শুরু করেছি। আমি বর্তমানে অলস সময়ে এই সবজি চাষ করার কাজে ব্যয় করছি। নিজেদের উৎপাদিত বিষমুক্ত এই সবজি যেমন নিজেদের জন্য ভালো তেমনি দেশের জন্য ভালো।

 

উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবিব রতন বলেন, সানজিদা আপা এই অঞ্চলের একটি দৃষ্টান্তর। আমি তাকে সার্বক্ষণিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করে আসছি। সানজিদা আপার দেখাদেখি আশেপাশের আরো অনেক মহিলারা সাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টান্তর স্থাপন করেছেন। কেউ হাঁস-মুরগী পালন করছেন, কেউ গরু-ছাগল আবার কেউ সবজি চাষ করছেন। আমি তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছি।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, আমি নিজে গিয়ে সানজিদা আপার সবজি খেতসহ অন্যান্য মহিলাদের সবজি খেত পরিদর্শন করেছি। আসলেই তাদের এই উদ্যোগ প্রশাংসার দাবীদার। দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের মহিলারাও পুরুষের পাশাপাশি ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন।

 

সানজিদাসহ যে কেউ আমাদের কাছে কৃষি সম্পর্কিত সহযোগিতা ও পরামর্শ চাইলে আমার সব সময় তাদের পরামর্শ দিতে প্রস্তুত রয়েছি। আমি আশা রাখি এক সময় উপজেলার সব মহিলারা তাদের বাড়ির উঠান ও পরিত্যাক্ত জমিতে সাধ্যমতো চাষ করে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করবেন।


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com