শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২০, ০৬:৫৩ পূর্বাহ্ন

কালো আকাশের নীচে (পর্ব-১)

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২০
কালো আকাশের নীচে (পর্ব-১)
এ কে শাওন সরকার।

এ কে শাওন সরকার : মসজিদের শহর ঢাকার বিভিন্ন মসজিদে সুমধুর সুরে ফজরের আযান চলছে। ঘরের দরজা খুলে শীতের মাত্রা অনুমান করলাম। গতকালের চেয়ে শীত একটু কম বলে অনুভুত হলো। আজ নীচে উপরে দুই টুকরা কাপড় কম পড়লেও চলবে। ঘড়ির দিকে দৃষ্টি দিলাম। ছয়টা বাজতে দশ মিনিট বাকী। বের হবার সময় ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। শরীর থেকে পাঁচ টুকরা কাপড় খুলে বারো টুকরা কাপড় পড়তে হবে! পৌষের শেষে মাঘের শীত! ছোটবেলা বলতাম শীত লাগলে গীত গাও। এখন গীত গাওয়া তো দূরের কথা বাপের নামই ভুলতে বসেছি। ওদিকে অষ্ট্রেলিয়ায় চলছে দাবানল। পশু পাখী সব পুড়ে ছাই। মাঘের শীতে বাঘ কাঁপার বদলে বাচ্চা-কাচ্চাসহ কাবাব হচ্ছে! বাঘের চিন্তায় অস্তির হবার উপায় নাই। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। ওসব ভাবলে অফিসে লেট হয়ে যাবে।

ঘড়ি, চশমা, সানগ্লাস, চাবি, কলম, মানিব্যাগ পাওয়ার ব্যান্ক, ঔষধ ইত্যাদি সাথে নিতে হবে! আর সাথে কর্পোরেট অস্ত্র ল্যাপটপ। মুখে ক্রীম, চুলে ও ঠোটে জেলও লাগাতে হবে। আবার নাস্তাও করা হয় নি! সকালে সময় বাঁচানোর জন্য সেভটা গত রাতেই সেরে রাখছিলাম। মনস্থির করলাম নাস্তা না করেই বের হবো। কর্পোরেট গাড়ী থাকা সত্বেও এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অফিস করা যে কত কষ্টের তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানে।

তুমি কাপড় চোপড় পর। আমি খাইয়ে দিচ্ছি। গিন্নি হেসে ভালবেসে বললো। খাইয়ে দেওয়া আজ নতুন কিছু নয়। সময় অতি সংক্ষিপ্ত হলে দুধ ভাত মেখে গ্লাসে তুলে আমাকে দেয়। আমি এক দুই তিন ঢোকে শুধু গলার ওপারে পার করে দেই। সকালে দুধ-ভাত, ডাল-ভাত ও পানি-ভাত সবই একই মনে হয়। গিলতে সময় লাগে মাত্র পনেরো সেকেন্ড। ইচ্ছে করলে দশ সেকেন্ড সেভ করতে পারতাম কিন্তু মা বলতেন, “জগলু শান্ত হ বাবা, পানি তিন ঢোকে খেতে হয়। বসে খেতে হয়। তাই তিন ঢোকে সাবাড় করা। আজকাল গিন্নী রান্নাঘর থেকে খাবার টেবিল সাটল ট্রেনের মত আসা যাওয়া করে। রুটি রাতেই বানানো ছিল। তিনি একদিকে রুটি সেকতেছেন আবার ভাজি দিয়ে রুটির টুকরা আমার মুখে পুরে দিচ্ছেন। ওদিকে ছেলে মেয়েকে ঘুম থেকে টেনে তুলছে। দশ বারো হাত একসাথে চালাচ্ছে। পোষাক পরা শেষ। খাওয়াটা শেষ হলোনা! সময় শেষ। তিনটি রুটি একবারে মুখে দিয়ে মুখস্থ খেতে পারলে (ভাজি টাজি ছাড়া খাওয়া) সময় বাঁচতো! আমিও বাঁচতাম!

পানি খাও, কুসুৃম গরম পানি।
না, খাব না!
পথে নিম্নচাপ বেড়ে গেলে ইয়ে করতে হবে!
সময় নষ্ট হবে।
আরে এক ঢোক তো খাও!

এবার কেডস যুদ্ধ। সময় বাঁচানোর জন্য ফিতা সবসময়ই বাঁধা থাকে। এখানেও গিন্নীর সাহায্য! কাঠি দিয়ে কেডস পরতে সাহায্য করে। আমি তার মুখের প্রতি চেয়ে কৃতজ্ঞচিত্তে ভাবি তাঁরও তো আফিস আছে। সেও সরকারি কর্মকতা। সে অফিসে যাবে আরও দুই ঘন্টা বাদে। সে স্বাবলম্বী আর আমি তাঁর উপর নির্ভরশীল। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড একাডেমিক রেজাল্ট কোনটাই আমার চেয়ে তাঁর কম নয়। বিয়ের পর পর সে হাদিস শোনাতো, “তোমাদের মাঝে সেই ব্যাক্তি উত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। ” আমিও কম না! হাদিস আমিও শোনাতাম, ” তিন ব্যাক্তির এবাদত আল্লাহপাক কবুল করবেন না, মাতাল, পলায়নকৃত ক্রীতদাস ও সেই রমনী যার উপর তার স্বামী অসন্তোষ্ট”! সেইসব প্রতিযোগিতামূলক বাক্যবাণ হানিমুন পর্বের পরের পর্বে উবে আকাশে হাওয়া হয়ে গেছে। এখন চলছে বোঝাপড়া পর্বের পরের পর্ব। স্থিতি পর্ব। তারপরও কত কষ্ট করে সে এই সংসারের জন্য! আরো ভাবী বাবার দাদী তো লেখাপড়া জানতো না। সেও সাত সকালে স্বামীকে কৃষিকাজ করতে ক্ষেতে পাঠাতো। তারপর শান্তি আর শান্তি। স্বামীকে পার করে সে নাক ডেকে ঘুমালেও পারতো। আর পাগলা জগলুর আধুনিক উচ্চ শিক্ষিতা ডাবল এম এ পাস বউ আশেকীন। জগলুকে সামলিয়ে সমস্ত সংসার, মেহমান, অফিসও সামলাচ্ছে। মনে পড়ে মায়ের কথা, ” শোন বউমা, এই বাড়ীতে তোমাকে শশুড়, শাশুড়ি, ননদ, দেবর, জ্যা কেউ জ্বালাবে না। জ্বালাবে আমার পাগলা জগলু। ওকে সামলাতে পারলে তুমি বিশ্ব সামলাতে পারবে!”

বের হও তাড়াতাড়ি গাড়ী ধরতে পারবে না।
বলেই গেট খুললো গিন্নী। গিন্নীর কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলি ওহ, কানটুপি ও হ্যান্ড গ্লোবস নেয়া হয় নি।

আমি নিয়ে আসছি গিন্নী বললো।

আরো একটি মিনিট চলে যাচ্ছে জীবন থেকে। এই এক মিনিটের এখন কত দাম। ছাত্রজীবনে এক ঘন্টারও কোন দাম দিতাম না! সময় পার করার জন্য কত আড্ডা চ্যাট কত কি করেছি! শীতকালে হলে কতদিন ঘুম থেকে উঠে একেবারে লান্চ করেছি। বাবা বলতো সময়টা কাজে লাগা জগলু! “টাইম এন্ড টাইড ওয়েট ফর নান। ” বাবা মা কেউ আজ নেই। তাদের সেই অমৃত-বাণী তখন বিষ-বাণী মনে হয়েছিল। আজও তাদের অমৃত-বাণীগুলি বারে বারে কানে বাজে। বুকটা ভারী হয়ে যায়।

বাবার হোটেল সেরা হোটেল
নিশ্চিন্তে আনন্দে দিনাতিপাত!
ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াও দিবানিশি
তফাৎ নেই দিন কি রাত!

আহারে! কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলি!

এই নাও তোমার কানটুপি ও গ্লোবস!
মানিব্যাগ নিয়েছো তো?
হুম নিয়েছি!
স্মৃতিচারণ করার সময়ও নাই!

সবকিছু নিয়ে যখন বের হলাম তখনও রাস্তার বাতিগুলি জ্বলছে। পিছন থেকে শোনা গেল তাঁর কন্ঠ সাবধানে যেও; আল্লাহ হাফেজ!

হ্যান্ড গ্লোবস আর কানটুপি পরতে পরতে এগিয়ে চলছি আজকের অফিস রণাঙ্গনে!
মাঠে একদল কুকুর মিটিং করছ! ইংরেজি বেসুরে ঘেউ ঘেউ শুনে ভাবলাম এগুলি সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাপন্থী কুকুর! কিভাবে ইরানকে পাল্টা আঘাত হানা যায় তার শলাপরামর্শ করছে। বাবা বলতেন কুকুরের ঘেউ ঘেউ ও গিবতকারীদের পিছু নিতে নাই! আমিও সামনে এগিয়ে যাবার জন্য সমানে দ্রুত পা চালাতে লাগলাম।

কালো আকাশের নীচে
রণাঙ্গনে চলেছি একা!
কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ
জীবনের রাস্তা আঁকা-বাঁকা! (চলবে)

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
15161718192021
22232425262728
293031    
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com