রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২০, ০৪:৪৫ অপরাহ্ন

কালো আকাশের নীচে (পর্ব-২)

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২০
কালো আকাশের নীচে (পর্ব-২)
এ কে সরকার শাওন

এ কে সরকার শাওন

চারিদিকে শুনশান নিরবতা। জনমানবশূন্য আঁকাবাঁকা পথে হেটে হাঁটছি। কোন রিক্সাওয়ালাকেও দেখছি না। মিনিট তিনেক হাটার পর তিন রাস্তার মোড়। সেখান থেকে অটোতে মিনিট দশেকের পথ উত্তরা। সাত সকালে যে পথ ১০ মিনিটে পাড়ি দেওয়া যায় সন্ধ্যায় সেই পথ পাড়ি দিতে হয় এক ঘন্টায়। সেখান থেকে অফিসের মাইক্রোবাস ছাড়ে সকাল সোয়া ছয়টায়। তাড়াতাড়ি পা চালাতে হবে। ভোরের আলো তখনও ফোটতে শুরু করে নি। নিজের পায়ের শব্দ কানে আসছে। গা ছম ছম ভাব। তিন দশক আগে গোপালপুর-শ্রীরামপুর মেঠো সড়কে এ অবস্থায় গান ধরতাম। “পথ চিরদিন সাথী হয়ে রয়েছে আমার”। মো: রফিকুজ্জামানের কথায় সুরের যাদু দিয়েছিলেন রাজা হোসেন খান। কিংবদন্তি শিল্পী আবদুল জব্বারের কন্ঠে গানটি যে কতবার শুনেছি তা বলতে পারবো না। গানটি আমার জীবনের সাথে মিলে গেছে। গলা ছেড়ে গাইতে পারবো না তাই মনে মনে গানটি গাইছি “জানিনা এই পথ কোনদিন, দেবে কিনা ঠিকানা তোমার”!

কিন্তু জগলু নিরুপায়। শহরে জগলু অনেক কিছুই করতে পারে না। গলা ছড়ে গান গাইতে পারে না।খোলা মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখতে পারে না। ভ্যানে দু’পা ঝুলিয়ে রাস্তায় পথ চলতে পারে না। জানালা খোলা রেখে একাদশীর চাঁদ দেখতে পারে না। কলেজ জীবনে রাত বিরাতে আবদুল জব্বারের গান গাইতাম বলে অনেকেই আমাকে আবদুল জব্বার বলতো। রাতে দূর থেকে গলার আওয়াজ শুনে বাবা মাকে তাচ্ছিল্য করে বলতো, “তোমার আবদুল জব্বার আসছে।” মা নিরবে খাবার গরম করতে যেতেন। আবদুল জব্বারের অনেক গানই আমার মুখস্ত।

আগে প্রিয় শিল্পীর ক্যাসেটের দু’পাশের সব গানই মুখস্ত করতাম। সব শেষ যে ক্যাসেটটি পুরো মুখস্ত করেছি তা হলো ডলি শায়ন্তনীর “হে যুবক”! ঐ ক্যাসেটে প্রধান আকর্ষণ ছিল, রংচটা জিন্সের প্যান্ট পরা”। গানটি গাওয়ার জন্য ম্যাচিং করে নীল জিন্সের প্যান্ট, লাল শার্ট, সাদা কেডস, চটকদার সানগ্লাস, সিটি গোল্ডের গলার চেইন কিনেছিলাম মাকে পটিয়ে। এজন্য প্রিয় ফুটবল খেলা ছেলে মাকে মামাবাড়ি জাফরপুর নিয়ে যেতে হয়েছিল। গানের কথার মত গানটি গাইবার জন্য গাঢ় লাল শার্টের বুক খুলে জলন্ত সিগারেটও ঠোটে ঝুলিয়েছিলাম বহুবার। নতুন সানগ্লাসের স্টিকারটাও কানের পাশে ঝুলছিল। কি যে ছল্টু মার্কা ড্রেস ছিল। ভাবলে আজও হাসি পায়।

সেই ছল্টু মার্কা প্রিয় ড্রেস পড়ে কান্দি পাড়ার বটগাছের ডালে বসে হাওয়া খাচ্ছিলাম। জনা তিনেক বন্ধুও ছিল সাথে। জামীর আলী, হানিফ ও হুমায়ূন। নিজেকে বুলবুল আহমেদ মনে হচ্ছিল। নীচ দিয়ে নবীনগর সরকারি কলেজে ডিগ্রীতে অধ্যয়নরত আপারা যাচ্ছিল। ফুফাতো ভাই-বন্ধু জামীর আলী বললো এই জগ্লুইল্লা গান ধর। আমি গেয়ে উঠলাম, “যদি বউ সাজো গো আরো সুন্দর লাগবে গো।” কপাল মন্দ হলে যা হয় তাই হলো। ঐ সময় ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল আমার মেডিকেল পড়ুয়া বড় ভাই ঝন্টু ও আমাদের প্রতিবেশী বিত্ত দা। জামীর আলীর ঈশারায় নীচে তাকিয়ে দেখি ভাইয়া রেগে গর গর করছে। ভাগ্য ভাল যে ভয়ে শি করে দেইনি!
“নীচে নেমে এসো” ঝন্টু ভাই
অসম্ভব গম্ভীর কন্ঠে বললো। কথায় আছে না দশদিন চোরের একদিন গৃহস্থের। তাই সেদিন ধরা খেলাম। চুপচাপ গাছ থেকে নেমে এলাম।
পাশাপাশি লাইনে দাড়াও! রাশভারী কন্ঠে ভাইয়া বললো।
ভিতরে ভিতরে রেগে ফেটে যাচ্ছে। মনে হয় হাতে রিভলভার থাকলে ঠুস ঠুস করে তিন দ্বিগুনে ছয়টা দিয়ে আমাদের খরচ করে ওপারে পাঠিয়ে দিতেন।
দুজনেই দুই মিনিট দরে আমাদের আপাদমস্তক ও পোষাকের পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে।
এটা কোন বখাটে স্টাইল?
পাশে থেকে বিত্তদা বললো, “হে যুবক” স্টাইল। ভাইয়া চুপচাপ। গম্ভীর…

তোমরা পড়ো কোন লেভেলে?
আমরা চুপ।
মুখে না কত কথার খই ফোটে?
এখন চুপ কেন?
আরো রেগে চিৎকার দিয়ে বললো
বলো ! কোন লেভেলে পড়?
আমি মাথা নীচু করে বললাম ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে!
তো ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে পড়ে ডিগ্রী পড়ুয়া মেয়েদের সাথে বেয়াদবি কর!
সানগ্লাস খোল!
সানগ্লাস খোল!
পকেটে রাখ!
বাকী সিগারেট কই?
মাত্র তিনটাই কিনেছিলাম!
হুম বলো, আজ কলেজ খোলা ছিল না?
আমি বললাম কলেজেই যাচ্ছিলাম।
আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে… ঝন্টু ভাই অতি বিস্ময়ে বললেন,
এই উদ্ভট ড্রেসে কলেজে? (আমি মনে মনে বিড় বিড় করে বললাম বেল বটম ড্রেস ছাড়া মনে হয় আর কোনো ভদ্র ড্রেস নাই। )
জামীর আলী, তুমি এটা কি টি শার্ট পরেছো? গায়ে লিখা মিস। আবার মেয়ে মানুষের ছবি!
ভাইয়া, কলেজে দেরী হলো প্রিন্সিপাল হাবিব স্যার দাড় করিয়ে লজ্জা দিবেন।
মিনমিনিয়ে জামীর আলী বললো।
দেক। তোমাদের লজ্জা আছে?
সবাই কানধরে ওঠবস কর।
নায়ক হয়ে নায়িকা ববিতারে নিয়ে গাছে আসমানে উড়ছিলাম। কপালে সেই সুখ সইলোনা।
পরিশেষে এই জেনারেল ভাইয়ার সামনে পড়ে মান সম্মান সব ধূলিসাৎ! কান ধরে ওঠবস! এই পথ দিয়ে আবার আমার মৌ ও আসা যাওয়া করে।
মনে মনে আল্লাহকে ডাকলাম।
হে আল্লাহ, মৌ যেন আজ স্কুলে না আসে!
হে আল্লাহ বাঁচাও। এই যাত্রায় রক্ষা কর।

স্যার উত্তরা যাবেন?
অটোওয়ালার কথায় অতীত থেকে বর্তমানে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।
অটোর ঝাঁকিতে পিছনের সিটে উঠে বসলাম। আটোর সিটের নীচের রডটা কোমরে লেগে একটু ব্যাথা পেলাম। রাস্তা ঘাটের যা জঘন্য অবস্থা। ঝাকিটা জোরে হলে খবর ছিল! দু’পাশের চায়ের দোকানগুলি মাত্র খুলতে শুরু করছে। একজন জয়ীতা চা বানাচ্ছে। এক হুজুর চায়ে চুমুক দিচ্ছে। কেউ বাসী বনরুটি চিবাচ্ছে। একজন সম্রাট শাহজাহানের মত আয়েশ করে এক্ সিগারেটে সুখ টান দিচ্ছে। ধূয়ার কুণ্ডলীতে প্রিয়তমা মমতাজের মুখাবয়ব খু্ঁজছে!
হঠাৎ অটো থেমে গেল।
কি হলো থামলো কেন?
টেরেন আইতাছে।
একজন বলে উঠলো ট্রেন আসার আর সময় পেল না!
যখনই ট্রেন আসবে তখনই কারো না কারো অসুবিধা হবেই একজন আতেল প্রতি উত্তরে বললো।
এই ট্রেন দিয়ে দেশের কত জায়গায় গিয়েছি। ট্রেনের কত মধুর মধুর স্মৃতি এই মনে জমা আছে।
ট্রেন গেছে ছাড়েন। কেউ একজন বললো।সামনের গুলানের উপর দিয়া উইড়া যামু না কি ভাই? অটোওয়ালার পাল্টা প্রশ্ন। আসলে আমরা একটা চরম অসহিষ্ণু সময় পার করছি। কেউ কারো কথা মনছি না। কেউ কাউকে পাত্তা দিচ্ছে না। সবাই সমানে সমান। আজ মনে হয় সম্মেলন আছে এই এলাকায়। পোষ্টারে পোষ্টারে
এলাকাটি ছেয়ে গেছে। পোষ্টারে শুধু ছবি আর ছবি! আমি গুনে দেখলাম একটি পোষ্টারে পনেরো জনেরও ছবি আছে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম ছবি যত ছোট লিডার তত বড়।
আজমপুর এসে গেলো।
আমি ৫০টাকার নোট দিয়ে বললাম
আমাকে ৩৫ টাকা ফেরত দিন।

সকাল বেলা খুচরা নিয়ে বের হতে পারেন না? কতজনেরে খুচরা দিয়াম! অটোওয়ালার বিরক্তিকর বাণী।

তাড়াতাড়ি ফুট ওভার ব্রীজে উঠতে গিয়ে মাথায় বাজ পড়লো। এয়ারপোর্ট টু আবদুল্লাপুর (বাম পাশ) সব গাড়ী স্থির দাড়িয়ে আছে! S T COLERIDGE এর The Ancient Mariner এর পড়া স্থির জাহাজের মত। আমাদের সাদা পঙ্খীরাজ হাইএসটাও নিশ্চয়ই কোথাও তেমনি ফ্রিজ হয়ে আছে। আজ অফিসে যেতেই হবে। এপাড়ে গাড়ী চলছে। লাফ দিয়ে একটায় ওঠলাম। গাড়ী চলছে তো থামছে। থামছে তো আবার চলছে।
এই ভাই, গাড়ী ছাড়েন! অফিস আছে।
তাড়া থাকলে হেলিকপ্টারে যান না কেরে?
ড্রাইভারের সুরুচিশীল জবাব।
কুড়িল নেমে একটা মাইক্রো পেয়ে গেলাম।
সবাই ভদ্র সম্প্রদায়ের লোক।
একটি টু শব্দও হলোনা।
নীলা মার্কেটে বরাবর গাড়ী থেমে গেল।
এখন এখানে তো জ্যাম হবার কথা না!
কেউ একজন রসিকতা করে বললো, “জ্যাম কখন কোথায় হয় তা কি আপনার জানা আছে না কি?
দশ মিনিট শেষ।
পরে জানলাম একটি আনফিট বাস জায়গা দখল করে আছে। তাই জ্যাম বেঁধেছিল।
কাঞ্চন গিয়ে একটি সিএনজি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

গাড়ী দিয়ে যাবার সময় দেখতাম
কাঞ্চনে কয়েকটি সিএনজি দাড়িয়ে থাকে।
আজ আমার দরকার তাই সব সিএনজি পালিয়েছে। মনে পড়ে গেল বশির আহমেদের বিখ্যাত গানের অংশবিশেষ।
“ফরিয়াদি আমি হলে দুনিয়া নিরব থাকে”
কিন্তু অফিসে যেতেই হবে। মাঝপথে এই জগ্লু সলম্বাস (যে কলম্বাস স্ত্রী সহ ভ্রমন করে) থামবে না। অগত্যা অটো ভরসা।
চারশত টাকায় রফা হলো। ঢাকা বাইপাসের পানজোড়া কালীগন্জ হয়ে
ঘোড়াশাল ব্রীজ।
গজেন্দ্র গতিতে অটো চলতে লাগলো।
শীত কম ছিল বলে কাপড় কম পড়েছিলাম। কপাল মন্দ হলে যা হয়।
ভাগ্যে লিখা থাকলে নাকি বাপেও অন্ধকারে চোর চোর বলে ছেলেকে কিলায়। শো শো করে বাতাশ আমার শরীরে আছড়ে পড়ছে। শীতে কাঁপুনি ধরার মত। পাশে চটের বস্তা থাকলেও কোরিয়ান কম্বল মনে করে গায়ে জড়াতাম। সাধু জনের আশ্রমের কাছে এসে আমার অটো সামনের আটোকে দিল ধাক্কা। হয়ে গেল মুখে মুখে কুরুক্ষেত্র। নীজে নেমে মিটমাট করলাম। অটো টঙ্গী-নরসিংদী মেইন রোডে আবার হেলে দুলে চলতে শুরু করলো। আকাশটা কালো মেঘে ঢেকেই আছে। প্রচুর কুয়াশা পড়ছে। এদিকে অনেক সময়ের অপচয় হয়েছে। সঠিক সময়ে অফিস ধরতে পারার আর আশা নেই। হঠাৎ মাথায়
বুদ্ধি এলো। কাউকে বলি একটা মোটর বাইক নিয়ে ঘোড়াশাল ব্রীজে আসতে। মনে আবার আশা হলো সঠিক সময়ে আফিসে পৌছার। ঘোড়াশাল ব্রীজে নেমেই দেখি মটর বাইক রেডি। পিছনে বসে পড়লাম। হেলমেট নাই। তবুও যেতে হবে। প্রয়োজন আইন মানে না; আবারও প্রমাণিত হলো।
একটানে অফিসে। অনেক প্রচেষ্টার পরও অফিসে যথা সময়ে পৌঁছতে ফেইল করলাম।
গজব গুড মর্নিং! অফিসের গাড়ী ছেড়ে চার জেলার ৭ থানা ২ নদী পার হয়ে ৫৬০ টাকা খরচ করেও আফিসে ৮ মিনিট লেট!
জন্ম আমার ধন্য হলো
চাকরগিরি সার্থক!

কমেন্টস কেউ করো না,
মানে বুঝে দ্ব্যর্থক!

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com