সোমবার, ০১ জুন ২০২০, ০৩:১৯ অপরাহ্ন

বিএনপি ভোটেও ফেল, হরতালেও ফেল

বিএনপি ভোটেও ফেল, হরতালেও ফেল

বিভুরঞ্জন সরকার: সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের ফলাফলে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটেনি। ঢাকা উত্তরে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম। দক্ষিণে শেখ ফজলে নূর তাপস। বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ে পরাজয়বরণ করেছেন উত্তরে তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণে ইশরাক হোসেন।

তবে এবার বিএনপি প্রার্থীরা নানা ধরনের অভিযোগ উত্থাপন সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে ছিলেন। মাঝপথে রণেভঙ্গ দেননি। এবারের নির্বাচনে এটা একটি উল্লেখ করার মতো ইতিবাচক দিক। কিন্তু ভোটার উপস্থিত করার ক্ষেত্রে বিএনপির মনোযোগ ছিল বলে মনে হয় না। অবশ্য আওয়ামী লীগও হয়তো বেশি ভোটার উপস্থিতি চায়নি। এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের ব্যাপারে দুই দলেরই অঘোষিত ঐক্য ছিল বলে মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে।

নির্বাচনের আগে একাধিক লেখায় বলেছিলাম যে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন করছে জয়ের জন্য। আর বিএনপির লক্ষ্য নির্বাচনকে বিতর্কিত করা, বিজয় অর্জন নয়। দুই দলেরই টার্গেট পূরণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে। বিএনপি বিতর্কের মধ্যেই আছে। বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভোটারের কম উপস্থিতি।

এই যে ভোট দিতে মানুষের আগ্রহ কমে গেল, তার জন্য দায়ী কে বা কী, তা খুঁজে বের করা দরকার। ভোটাররা ভোটকেন্দ্র বিমুখ হলে গণতন্ত্রের জন্য তা সুখবর নয়। ভোটের প্রতি মানুষের আস্থা একদিনে কমেনি। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করে, অনেক আত্মদান, রক্তদানের পর আমরা দেশে গণতন্ত্র কায়েম করলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও সংহত করার ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য নেই। বরং দিন দিন আমরা এক জটিল অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছি। রাজনৈতিক দলগুলো জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার চেয়ে কৌশলের খেলায় মেতে উঠেছে।

বিএনপি যেহেতু অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অর্থাৎ হত্যা-সন্ত্রাস-সহিংসতার মাধ্যমে সরকারকে নাকাল-নাজেহাল করতে চায় সেহেতু সরকার তথা আওয়ামী লীগও বিএনপিকে দাবিয়ে রাখতে শক্তি প্রয়োগের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হয়। ক্ষমতায় না থাকলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থাকার জন্য নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে দ্বিধা করা হচ্ছে না। অবাধ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জিতবে না- ক্রমাগত এই প্রচারণা আওয়ামী লীগকে অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দিহান করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থকরা মনে করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে মৌলবাদ-ধর্মীয় উগ্রবাদের বিকাশ ঘটবে। বিএনপি-জামায়াতের অতীত শাসন এই ধারণার পক্ষে রায় দেয়।

দেশকে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা দরকার- এটা বাইরের দুনিয়ার অনেক দেশও মনে করে বলেই আওয়ামী লীগ তার পছন্দমতো ভোটব্যবস্থা চালু করেও এক ধরনের মার্জনা পেয়ে যাচ্ছে। বিএনপি সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে চলতে পারছে না। তাই জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে গেলে বিএনপিকে তার রাজনীতি বদলাতে হবে। জামায়াতের প্রশ্নে প্রকাশ্যে অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। নয়েও আছি, ছয়েও আছি করে বাংলাদেশের কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করা গেলেও জঙ্গিবাদ নিয়ে আতঙ্কিত বিশ্বসম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করা যাবে না।

মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ নগরীর মেয়র পদে আওয়ামী লীগ জয়ের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে- সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। যারা অন্য কিছু ভেবেছিলেন, তারা আসলে কল্পলোকের বাসিন্দা। রাজনীতির কঠিন জমিতে যারা হাঁটাচলা করেন, যারা সরকার ও সরকারি দলের রাজনৈতিক কৌশল ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করেন তাদের এটা অজানা নয় যে, আওয়ামী লীগ এখনই পরাজিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। আবার বিএনপির ভেতর-বাহির যারা জানেন, তাদেরও অজানা নয় যে, বিএনপি যতই জনপ্রিয়তার বড়াই করুক না কেন, বাস্তবে তাদের পায়ের নিচে শক্ত মাটি নেই।

তাছাড়া বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা কৌশলও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। শুরু থেকেই বিএনপি প্রচারণা চালিয়ে আসছে যে তাদের জিততে দেয়া হবে না। জেনে শুনে তারা বিষপান করেছে। এসব বলে একদিকে তারা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মনোবল দুর্বল করে দিয়েছে, অন্যদিকে ভোটারদের মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। ‘ভোট দিয়ে কী হবে, জিতবে তো আওয়ামী লীগ বা নৌকা’- এই প্রচারণা যদি অব্যাহতভাবে চালনা হয় তাহলে তা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করে না। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ৩০ শতাংশের কম হওয়ার পেছনে বিএনপি এবং বিএনপি অনুরাগীদের নেতিবাচক প্রচারণা একটি বড় কারণ ছিল বলে মনে হয়। বিএনপির প্রচারণা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে কোনোভাবেই উৎসাহিত করেনি।

ইভিএমের বিরোধিতাও বিএনপির জন্য সুবিধা দেয়নি। জনসমর্থন নিয়ে বিএনপি যে অহঙ্কার করে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচন তা ভুল প্রমাণ করেছে। মানুষ দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নীরবে নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে বিএনপির দাবি সত্য বলে ধরে নেয়া যেত। ঢাকা শহরে সব ভোটারের দলীয় পরিচয় শনাক্ত করা সহজ নয়। বিএনপি সমর্থকদের কপালে ধানের শীষ চিহ্ন আঁকা নেই। তাই চিনে চিনে বিএনপির ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়ার কাহিনী বিশ্বাসযোগ্য নয়। একটি অনিয়মের খবর অসংখ্য মিডিয়ায় প্রচার হওয়ায় মনে হয় নির্বাচনে বুঝি কোনো ভোটারই ভোট দিতে পারেননি। কিন্তু অবস্থা মোটেও তেমন নয়।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা হলো, যারা ভোট দিতে চেয়েছেন তারা দিতে পেরেছেন। তার মানে কি এই যে ভোট খুব ভালো হয়েছে? না, অবশ্যই ভালো ভোট হয়নি। যে নির্বাচনে ৭০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোটদানে বিরত থাকেন তাকে কোনোভাবেই ভালো বা আদর্শ নির্বাচন বলা যায় না। আবার এটাও ঠিক যে, অতীতের একটি নির্বাচনও পাওয়া যাবে না যেখানে জাল ভোটসহ কোনো না কোনো অনিয়ম হয়নি। বিএনপির জনসমর্থনের বায়বীয় অবস্থা ভোটে যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, ভোটের পরের দিন বিএনপির ডাকা হরতালেও তা স্পষ্ট হয়েছে। মানুষ যদি ভোট-অনিয়মের বিরুদ্ধে খুব রুষ্ট হতো, বিক্ষুব্ধ হতো তাহলে হরতালে সব কিছু স্বাভাবিক থাকত না। জনজীবনে হরতালের সামান্য বিরূপ প্রভাব লক্ষ করা যায়নি। হরতাল ডেকে দলের নেতারা রাজপথে নামেননি। এমন একটি অকার্যকর হরতাল বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই প্রকট করে তুলেছে। অনেককে তাই বলতে শোনা গেছে, বিএনপি ভোটেও ফেল, হরতালেও ফেল।

কিন্তু যা হয়েছে তা কি স্বাভাবিক? নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে না আসলে কীভাবে গণতন্ত্র চর্চার পথ প্রসারিত হবে। আমরা সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রশ্মি দেখতে চাই, নাকি হারিয়ে যেতে চাই অন্ধকার চক্রব্যুহে? পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সত্য সন্ধানী হওয়ার কোনো বিকল্প আমাদের সামনে নেই।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930   
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com