শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন

মানুষ মানুষের শত্রু হয় জ্ঞানীর কর্ম শত্রুতা নয়

মানুষ মানুষের শত্রু হয় জ্ঞানীর কর্ম শত্রুতা নয়

নজরুল ইসলাম তোফা:: মানুষ মানুষেরই শত্রু হয়। এই মানুষের ভেতরে যে শত্রুতা জন্ম হয়, তা চিহ্নিত করাটা খুুবই কঠিন। পৃৃথিবীতে ‘কে- শত্রু’ আর ‘কে- মিত্র’ তাকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে উপলব্ধি করা যায় না। কেবলই প্রয়োজনের সময় কিংবা বিপদের মূূূহুর্তেই সত্যিকারের শত্রু-মিত্র চেনা যায়। গৌতম বুদ্ধ একটা কথা বলেছেন,- ”জগতে শত্রুতার দ্বারা কখনো শত্রুতার উপশম হয় না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়।” খুব গোপন শত্রু প্রকৃত বন্ধু বা কাছের ও দূরবর্তী মানুষের নিকটেই যেন একটা মুখোশে চিত্র। বিদ্রূপ যাকেই করা হোক না কেন তা অবশ্যই নেতিবাচক। এসমাজের ব্যক্তিত্ববান কোনো মানুষকে যদি ঠাট্টা-মশকরা করে অপমান করা হয়, তা হলে সমাজে তিনি যা দিতে পারতো তা থেকে এ সমাজ বঞ্চিত হবে। সুতরাং এতে সমাজের যে ক্ষতি হয় তাকে সচেতন নাগরিকদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন। শত্রুরাই নিজ ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই যেন কৌশলে মিত্রকে ঘায়েল করে শত্রুতার পথ বেছে নেয়। তাদের কাছে এই কঠিন কাজ সহজভাবেই করতে যেন বাধেনা। মনে মনে বা প্রকাশ্যে ঘৃণা করে বা ক্ষতি সাধন করে, এ ব্যক্তিরাও মানুষ মানুষের শত্রু হয়।

আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো শত্রু। শত্রু শব্দটা’কে বাংলা প্রতিশব্দের মাধ্যমে নানা ভাবেই যেন মানুষ চিনে থাকে। যেমন:- বৈরী, অরি, দ্বিষৎ, প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিপক্ষ, বিপক্ষ অথবা বিদ্ধিষ্ট ব্যক্তি। শত্রুতা করা, শত্রু ভাবাপন্ন ব্যক্তি’রা কখনো সমাজের বৃহৎ কর্মকান্ডে থাকতে পারে না। অবশ্য তাদের কখনো না কখনই পতন ঘটেছে। তাই সাক্ষী ইতিহাসের পাতায় আছে। অনেক শাসকের পতন ঘটেছে তাদের নিকট বন্ধু রূপেই লুকিয়ে থাকা শত্রুতার কারণে। ধণ-সম্পদ, প্রাসাদ বা রাষ্ট্র ষড়যন্ত্রের কথা তো হরহামেশাই মানুষের মুখে শোনা যায়। এ ধরনের শত্রুরা নিজ ইচ্ছা বা ক্ষমতাসীনদের দ্বারাই নিয়োজিত এজেন্ট এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাতে নিজ সহ ক্ষমতাধর ব্যক্তির ফায়দা হাসিল করার জন্যই গোপনে ও প্রকাশ্যে সংবাদ আদান-প্রদানের কাজে নিয়োজিত থাকে। তাই, মানুষের কল্যাণে এরা কমই আসে, চতুরতা বা কৌশল খাটিয়েই যেন শত্রুতা করে। সুতরাং প্রয়োজনের সময়ে কেবল সত্যিকার মানুষের কেমন পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার গভীর মনে সেটা উপলব্ধি করলেই জানা যায়।

সুতরাং এরা সমাজ এবং দলের নীতিনির্ধারকদের অতি আপন জন হয়ে খুব সহজে গুপ্তচর বৃত্তির কাজেই লিপ্ত থাকে। বিপুল জনপ্রিয়তা থাকার পরও অনেক সময় এ সব শত্রুর কারণেই সমাজে বা দলের নিজস্ব সিদ্ধান্তকে ফলপ্রসূ করতে পারে না। এই মানুষরা সর্বক্ষণ অপরের খুঁত ধরতে থাকে। তাদের কাছে অন্যদের চিন্তা-ভাবনা, রুচি-পছন্দ, কাজ, পোশাক-আশাক, আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের মতো অনেকে অপছন্দ করে। এক কথায় সব কিছুতে তাদের চোখেও খারাপ লাগে। পরশ্রীকাতর প্রতিহিংসাপরায়ন লোকেরা গোপণ শত্রুতা পোষণ করে থাকে। ওদের থেকে অনেক দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়। তাদের কর্ম ও আচার-আচরণে দৃষ্টি দিলে অনেকাংশে পরিষ্কার হয়। তবে গভীর জলের মাছ ধরতে হলে গভীরে নামতে হবে। তাদের কথা বার্তা ,আচরণ এবং গতিবিধির মধ্যে সর্বপ্রথমেই চলে আসে টাকা বিষয়ক ব্যাপার। কৌশলে টাকা নিতে পারলেই লেনদেন চুকিয়ে দেওয়াটাই তাদের কু-চরিত্রে বিরাজ করে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মানব সমাজের সব চেয়ে বড় শত্রু হিসাবে গন্য করা যেতেই পারে দু’জাতির মানুষকে,- ১ম হলো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। তারা তো সুযোগ পেলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ৩/৪ গুন বৃদ্ধি করে। ২য় হলো অসাধু ডাক্তার, তারাও নিজেদের স্বার্থে- চিকিৎসা ভিজিট ৮০০/১০০০ করেই দরিদ্র মানুষের পেটে কুড়াল মারে। আর অযথা টেস্ট বানিজ্য এমন পেশার মানুষের আচরণ যেন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। কতটা নিকৃষ্ট হয় এই গুলো মানুষ বলাই বাহুল্য। প্রতিটা স্তরের মানুষ কম হোক বা বেশিই হোক কোনোনা কোনো ভাবেই যেন শত্রুতা করে। ইদানিং পশু-পাখি, বনজঙ্গল কিংবা নানা বস্তুুর উপরে কোনো না কোনো মানুষ- শত্রুতার জেরেই প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। এটাও একেবারেই নিকৃষ্ট মানসিকতার পরিচয়। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে নিজ সহ সকল শ্রেণীর মানুষের ক্ষতির সম্মুখীন হবে নূন্যতম সে জ্ঞান নেই।

বাঙালি আবেগ প্রবণ, আর এমন আবেগপ্রবণতাই যেন তাদের আত্মত্যাগের জন্যেই উদ্বুদ্ধ করে। ভালোবাসাতে যেমন আপ্লুত হতে পারে এ-জাতি, তেমনই- নিষ্ঠুরতা বা শত্রুতার চরম রূপও দেখাতে পারে। অদ্ভুত এক দ্বান্দ্বিক চরিত্র ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আছে মানুষের মধ্যে। চরিত্রের এ বৈপরীত্য দৃশ্যমান হয় কিছু স্বার্থ হাসিলের জন্যেই তা অকপটে বলা যায়। সুতরাং, খুব ভালো মানুষ হতে হলে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। আর প্রতিটা মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুন্দর ভাষা বা শিষ্টাচারপূর্ণ ব্যবহারের প্রভাব অনস্বীকার্য। যদি ধর্মের যুক্তি দেখাতে চেষ্টা করি- তাহলে বলা যেতেই পারে যে, পবিত্র কোরআনে রয়েছে, শত্রুর সঙ্গে সুন্দর ভাষায় কথা বলা। আরো বলা আছে, ‘মানুষের উচিত শত্রুর নোংরা কথার জবাব খুবই সুন্দর কথায় দিয়ে দেওয়া।’ সূরা, ফুসসিলাতের- চৌঁত্রিশ নম্বর আয়াতে বলাই আছে,- ‘‘সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়। তুমি অসৎ কাজকে সেই নেকি দ্বারাই নিবৃত্ত করো যা সবচেয়ে ভালো। তা হলেই দেখা যাবে যে,- আপনার সাথে শত্রুতা যাঁর ছিল তিনি অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়েও গেছে।’’ শত্রুতা নয়- আপোষ করতেই হয়, সেটাই তো জ্ঞানীদের সঠিক কাজ। সফলতার অর্জনের পাথেও- বলা যেতেই পারে। ‘ভালোবাসা’ দিয়েই হবে জয়, আর শত্রুতা দিয়েই হবে পরাক্ষয়। আরও যদি বলি মহাত্মা গান্ধীর উক্তি, তা হলে- “ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার সৎসাহস যার ভিতরে আছে সেই প্রকৃত মানুষ।

পৃথিবীতে মানুষ একা বাস করতে পারে না। মিলেমিশেই বসবাসের পাশাপাশি তারা যার যার ধর্ম পালন করে। এ বসবাসের সূত্রে আত্মীয়তার সম্পর্কের বাইরেও অনেক মানুষের সাথে মানুষের নানারকম সম্পর্ক গড়ে উঠে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে মধুর ও পবিত্র সম্পর্ক বলা যায় ‘বন্ধুত্ব’।কারণ, মানুষ তার বন্ধুর কাছে সুখ-দুঃখের বিভিন্ন কথা অকপটে ব্যক্ত করে। মানুষ তার বন্ধুর বিপদে- আপদেই সবার আগে এগিয়ে আসে এবং বিপদে-আপদে আশার বাণী শোনায়, তারাই তো- সুখের মুহূর্তগুলো ভাগা ভাগি করে উপভোগ করে।

অপর দিকে আবার বলা যায় যে, ব্যক্তিগত মতপার্থক্য, স্বার্থের আকর্ষণ বা টাকা-পয়সা এবং জায়গা-সম্পদের বিরোধের কারণেই পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার ভাব জন্ম নেয়। সেই শত্রুরাই তো চায়, সব সময়ে মানুষদের ক্ষতি হোক। ইবনুল ফুরাত বলেছিলেন, ‘শত্রুকে যদি একবার ভয় কর তবে বন্ধুকে অন্তত দশবার ভয় করিও। কারণ- বন্ধু যদি কোনো সময় শত্রু হয়, তখন তার কবল হইতে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হইবে না’। সুতরাং প্রকৃত মানুষ এবং ভালো বন্ধু চেনা বড়ই দায়। বিপদে না পড়লে খুবভালো মানুষ বা প্রকৃত বন্ধু অথবা শত্রু চেনা যায় না। এমন বহু লোক আছে যারা অপরকে- তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার জন্য, বিদ্রূপ করার জন্য, মানে তার ব্যক্তিত্বটাকে ছোট করার জন্য হাসি-তামাশারও আশ্রয় নেয়। যেকোনো মজলিশে বা বন্ধুদের মাঝে ঠাট্টা-মশকরা করে কথা বলে। ইশারা- ইঙ্গিতে যেন অন্যের গ্রহণযোগ্যতায় আঘাত হানার চেষ্টা করে। হাসি ও মজার মধ্য দিয়েই সে আপাতদৃষ্টিতে তার বন্ধু এবং শ্রোতাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলেও আসলে তার মনের মাঝে আছে খুবই হিংসা-বিদ্বেষ ও প্রতিশোধ প্রবণতা।

পৃথিবীর ইতিহাসেই এ রকম অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন:- মক্কায় ইহুদিরা ইসলাম ধর্মের শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর যে ক্ষতি সাধন করেছে, তার চেয়ে অনেকাংশেই যেন ক্ষতি সাধন করেছে- মুসলমান নামধারী মোনাফেকরা। যেকোনো ব্যক্তিকে আঘাতহানা কিংবা কাউকে অবমাননা করাটাকে জুলুম বলে উল্লেখ করেছে ইসলামে। জ্ঞান ও সভ্যতার ‘বাহ্যিক উন্নতি’ যদি আপাতদৃষ্টিতে সমৃদ্ধির উচ্চশিখরে আরোহন করে, তার পরও সে সমাজকে মানবীয় পূর্ণতায় সমৃদ্ধ সমাজ বলা যাবে না। যে সমাজের লোক জন একে- অপরের কাছে অনিরাপদ বোধ করে কিংবা একে-অপরের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ পোষণ ও পরস্পরের মঙ্গল কামনা করে না বরং ভেতরে ভেতরে শত্রুতা এবং ক্ষতি কামনা করে, ষড়যন্ত্র করে, অপরের ধণ-সম্পদের প্রতি ‘লোভ-লালসা’ লালন করে, সেই সমাজে কোনো রকম শান্তি বা স্বস্তির অস্তিত্ব নেই।

বিপদের বন্ধুই প্রকৃত ‘বন্ধু’। আর যে ‘বন্ধু’ বন্ধুর বিপদের সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখে সে বন্ধুরূপী শত্রু। তাই বন্ধু নির্বাচনে সদা সতর্ক থাকতেই হবে। প্রচলিত সার্বজনীন মূল্যবোধ, আইন এবং অধিকার-বিরুদ্ধ কর্ম কান্ড যখন সংঘটিত হয় তখনই মানুষের প্রতি মানুষের শত্রুতা এবং অবিচার সৃষ্টি হয়। শুধু মাত্র ন্যায়নীতির পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমেই সর্বস্তরের শত্রুতাকে দমন করে “শান্তি প্রতিষ্ঠা” করা সম্ভব। অভিজ্ঞতার আলোকেই বলতে হয়, যেখানে ন্যায়নীতি আছে সেখানেই শান্তি আছে। আবার যেখানে ন্যায়বিচার নেই কিংবা আদর্শবোধ বা সহনশীলতা নেই, সেখানে কখনো শান্তি বিরাজ করতে পারে না। নিজ ঘর হতে শুরু করে গোষ্ঠী এবং জাতি সকল ক্ষেত্রেই একথা প্রযোজ্য।

সর্বশেষে বলতে চাই যে, ‘আমার হাতে কোন পাথর নেই, আমার সাথে কারও শত্রুতা নেই। আমি কারও সাথে যে দূর্ব্যবহার করি না, কেননা আমি গোলাপ বাগানের মতই সুমিষ্ট’। মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি’র এমন নান্দনিক কিংবা শৈল্পিক কথার সাথেই সৎ সাহস নিয়ে আজকের বর্তমান সমাজের মানুষ নিজকে উপস্থাপন করতে পারে না। কারণ দেখা যায় তারা কখনো না কখনো যেকোনো ভাবেই যেন শত্রুতা করে। আবার ”শত্রুরা শত্রুতা করতে কৌশলে ব্যর্থ হলে তারপর বন্ধুত্বের সুরত ধরে”। এ কথা হযরত আলী (রাঃ) উক্তি। সুতরাং মানুষের এই চরিত্রের পরিবর্তন করানোটা খুবই কঠিন। তবুও- বুদ্ধির জোরেই শত্রুকে জয় করা প্রয়োজন। নেলসন ম্যান্ডেলার সাথেও একমত পোষণ করে বলা যায়,- “আপনি যদি সত্যিকার অর্থেই শান্তি চান,.. আপনাকে আপনার শত্রুদের সাথেই কাজ করতে হবে, তাহলেই তিনি আপনার সহকর্মী হতে পারবে। তবুও একটি কথা বলতেই চাই যে হত্যা, সন্ত্রাস, নাশকতা বা গুজবের মতো শত্রুতা না করে সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গল পথে সততা দিয়েই নিজেকে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। সুতরাং শত্রুতার উপরেই দাঁড়ানো মানুষদের মনোবল কিংবা নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া নিকৃষ্ট মনের পরিচয়।

লেখক:
নজরুল ইসলাম তোফা, টিভি ও মঞ্চ অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং প্রভাষক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
    123
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com