শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন

সিনহার অবসর কেলেঙ্কারী ও দেশত্যাগের নেপথ্যে

সিনহার অবসর কেলেঙ্কারী ও দেশত্যাগের নেপথ্যে

বাংলাদেশের ইতিহাসে এস কে সিনহা সব থেকে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত প্রধান বিচারপতি সিনহাকে নিয়ে বিতর্কের ঝড় যেন থামছেই না। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য করে নানা আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেন সিনহা। নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিধান নিয়ে সরকারের নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দেয়।

অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তার বাদানুবাদ বিচারাঙ্গন ছাড়িয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তাপ ছড়িয়েছিল। এরপর সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপন নিয়েও নানা রকম বিতর্কের জন্ম দেন সিনহা।

সবচেয়ে বেশি টানাপড়েন দেখা দেয় অধস্তন আদালতের বিচারকদের আলাদা আচরণ ও শৃঙ্খলা বিধি তৈরি নিয়ে। এ বিষয় নিয়ে শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন মন্তব্য করেও বেশ আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েন।

সমালোচনার মধ্যেই গত ২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে চিঠি দেন।

নিজে অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটির দরখাস্ত দিলেও গত ১৩ অক্টোবর রাতে দেশ ছাড়ার আগে তিনি তার বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। বিচার বিভাগের স্বার্থে আবার ফিরে আসব।’

পরের দিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে চাননি আপিল বিভাগের বিচারপতিরা। এ অবস্থায় সিনহার দেশে ফেরা নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়।

পরবর্তীতে নাটকীয় নানা ঘটনার পর বিধি লঙ্ঘন করে বিদেশে থেকেই হঠাৎ পদত্যাগ করেন প্রধান এস কে সিনহা।

সম্প্রতি বেশ কিছুদিন আগে নিজের আত্মজীবনীর আড়ালে একটি বিতর্কিত বই প্রকাশ করে আবারো নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন এস কে সিনহা। সিনহার নামে প্রকাশিত ”এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস এন্ড ডেমোক্রেসি” নামের বইয়ে তিনি সরকার ও সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সংস্থার সমালোচনা করেছেন। তিনি উক্ত বইয়ে পদত্যাগ এবং দেশ ত্যাগের জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। সিনহার অভিযোগ কতটুকু সত্য তা নিয়ে সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কথা বলেছেন সুপ্রিমকোর্ট-এর প্রাক্তন বিচারপতি ও এস কে সিনহার সহকর্মী বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
এস. কে. সিনহার বিতর্কিত বই

সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা সরকারের চাপের মুখে দেশ ছাড়ার এবং পদত্যাগ করার যে দাবি সম্প্রতি করেছেন, সেটাকে ‘অসত্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন সুপ্রিমকোর্ট-এর প্রাক্তন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

তিনি বলেছেন, ‘আপিল বিভাগের অন্য পাঁচজন বিচারক সিনহার সাথে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করার কারণেই তিনি বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন।’

জোর করে সিনহাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার বিষয়ে মানিক বলেন, “উনাকে বললেন যে, আপনি দেশ ছেড়ে চলে যান আর উনি চলে যাবেন- আমিও নিজেও বিচারপতি ছিলাম এটা আমি বিশ্বাস করতে নারাজ। প্রধান বিচারপতি তো দূরের কথা একজন হাইকোর্টের বিচারপতিকেও এভাবে দেশ থেকে বিতাড়ন সম্ভব নয়”।

সিনহার সাথে একসাথে আপিল বিভাগে বসতে না চাওয়ার পেছনে সরকার তাদের প্রভাবিত করার অভিযোগের বিষয়ে মানিক বলেছেন, “তারা কারও প্রভাবে প্রভাবিত হওয়ার লোক নয়। তারা কারও চাপের মুখে নতি স্বীকার করার মানুষও নয়। তারা কোনো অবস্থায় কারও চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। সুতরাং সিনহা বাবুর এই অভিযোগ একেবারেই অসত্য বলে মনে করছি।”

ঘটনার পরই অন্য বিচারপতিদের সাথে তার কথা হয়েছে উল্লেখ করে মিঃ চৌধুরী বলেন, “পাঁচজনের সাথেই আমার কথা হয়েছে। তারা পরিষ্কার বলেছেন যে তারা যেসব প্রমাণাদি দেখেছেন এরপর সিনহা বাবুর সাথে বসার প্রশ্নই উঠতে পারেনা।”

তিনি আরো বলেন “তারা কিন্তু মি: সিনহাকে এসব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি সদুত্তর দিতে পারলেই কেবল তারা তার সাথে বসবেন। সদুত্তর দিতে না পারলে বসবো না।”

সিনহাকে গৃহবন্দী করে রাখার অভিযোগের বিষয়ে মানিক বলেন, “ওই সময় তিনজন মন্ত্রী তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। উনি দাঁতের ডাক্তারের কাছে গেছেন। বিভিন্ন দূতাবাসে গেছেন ভিসার জন্য। আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করতে গেছেন।”

“প্রচুর আইনজীবী বিশেষ করে বিএনপি জামায়াতের আইনজীবীরাও দেখা করতে গেছেন। তারাও এমনটি বলেননি যে প্রধান বিচারপতিকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। উনিও বলেননি।”

সিনহার লেখা বইয়ের আসল উদ্যেশ্যের বিষয়ে বলতে গিয়ে সুপ্রিমকোর্টের সাবেক এই বিচারপতি বলেন, “আমি বইটি পড়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এটি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচারণার একটি দলিল। নির্বাচনে যাতে আওয়ামী লীগকে হেস্তনেস্ত করা যায় সেই উদ্দেশ্যেই এই বইটি তিনি লিখেছেন”।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে একটি বিশেষ মহলের ইন্ধনে ক্ষমতাসীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার দুরভিসন্ধি নিয়েই মূলত নিজের আত্মজীবনীর আড়ালে বিতর্কিত বইটি প্রকাশ করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com