বুধবার, ০৪ অগাস্ট ২০২১, ১২:২৩ অপরাহ্ন

সংসদের ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে অকার্যকর বিরোধীদল জাতীয় পার্টি!!!

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল ছিল সরকারেও। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির তিন জন মন্ত্রী পুরো পাঁচ বছরই দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের প্রধান এরশাদ ছিলেন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

এমন বিরোধী দলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, ‘গৃহপালিত’ বিরোধীদল। আর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, ‘অকার্যকর’ বিরোধী দল। তবে জাতীয় পার্টির নেতাদের দাবি, তারা সঠিকভাবেই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছেন। তারা মনে করেন, সবকিছুতে বিরোধিতা করলেই যোগ্য বিরোধী দল হওয়া যায় না, ভালো কাজের প্রসংশাও করতে হয়। খবর ডয়েচে ভেলের।

শুধু বিরোধিতার বিষয় নয়, সংসদে জাতীয় পার্টির সদস্যদের উপস্থিতিতেও খুব একটা আগ্রহ ছিল না। টিআইবি তার গবেষণায় বলেছে, সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী যেখানে ৮৩ ভাগ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন, সেখানে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ উপস্থিত ছিলেন ৫৬ ভাগ অধিবেশনে।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে, বিরোধী নেতার সংসদে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। এমনকি গত পাঁচ বছরে কোনো আইন প্রণয়নেই তারা ‘না’ ভোট দেয়নি।

সংসদ অধিবেশন শেষ হয়ে গেল। সেখানে দেখা গেছে, বিরোধী দল একদিকে সরকারের সঙ্গেও আছে, আবার অন্যদিকে বিরোধী দলের দায়িত্বও পালন করেছে। তারা আসলে কতটা যৌক্তিকভাবে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে?

এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক তত্ত্বাবধায় সরকারের উপদেষ্টা ও টিআইবির বোর্ড অব ট্রাষ্টি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘এটাকে কোনো সংজ্ঞাতেই বিরোধী দল বলা যাবে না। তারা সরকারের অংশ। তাদের বড় নেতা প্রাইম মিনিস্টারের বিশেষ দূত। তিনজন ছিলেন মন্ত্রী’।

জনাব খান বলেন, ‘এটা কি তাহলে বিরোধী দল হলো? এটা একটা লোক দেখানো এবং যাকে আমরা ঠাট্টা করে বলি ‘গৃহপালিত’। তারা যদি সরকারে না থাকত, তাহলে তাদের ভূমিকা একটু অন্যরকম হতে পারতো। আসলে এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দরকারের সময় এটা আলোচনায় আসে’।

দশম সংসদের প্রথম থেকে ১৮ তম অধিবেশন পর্যন্ত টিআইবি মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। সেখানে তারা জাতীয় পার্টির ভূমিকাকে ‘অকার্যকর’ বলেছে। এমনকি তাদের পার্টির সদস্যরা নিজেরাই সংসদে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কারণ, সব সময় তারা সরকারের পক্ষেই ভোট দিয়েছে।

টিআইবি দেখিয়েছে, সংসদের ৭৫ শতাংশের বেশি সময় উপস্থিত থেকেছেন এমন সদস্য মাত্র ৩৪ ভাগ। ফলে সংসদের প্রতিও তাদের যে কোনো আগ্রহ ছিল না সেটা বেশ পরিস্কারভাবেই বোঝা যায়।

একবার সংসদে একজন স্বতন্ত্র এমপি রুস্তম আলী ফারাজী জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তখন জাতীয় পার্টিকে রক্ষায় সরকারী দলই এগিয়ে এসেছিল। মতিয়া চৌধুরীসহ অনেকেই জাতীয় পার্টির পক্ষে কথা বলেছিলেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকার প্রসংসা করেছেন বিভিন্ন সময়।

জাতীয় পার্টির এমপি ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু তখন সংসদে বলেছিলেন, সরকারে এবং বিরোধী দলে থাকা সারা বিশ্বে একমাত্র দল জাতীয় পার্টি নয়। তিনি জার্মানি, ইসরাইল ও পাকিস্তানের উদাহরণ দেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা ডেমোক্র্যাট দলের হলেও তার ডিফেন্স মিনিস্টার যে ছিলেন রিপাবলিক দলের, সেটাও উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া তিনি আরো উল্লেখ করেন, সংবিধানে কোথাও বলা নেই যে, বিরোধী দল সরকারে থাকতে পারবে না।

সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। সেখানে অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ৩০০ আসন আর সংরক্ষিত ৫০টি মিলিয়ে ৩৫০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৭৬টি। জাতীয় পার্টির ৪০টি। আওয়ামী লীগের শরিকদের ১৮টি। আর ১৬টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। যদিও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ ছিলেন।

জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে থেকে মানুষের আশা-আকাঙ্খার কতটা প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে?

জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘তাদের তো রাজনীতিতেই থাকার কথা না। এরশাদের বিরুদ্ধে তো জনঅভ্যুত্থান হয়েছে। তারপর আমরা গণতন্ত্রে এলাম। সেখানে এসে দেখলাম, তিনি আবার এর মধ্যে ঢুকে গেছেন। তাদের আসলে জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের অবস্থান সব সময় সুবিধাবাদী। সরকারে, আবার বিরোধী দলে, এটা তো কৌতুকের মতো হয়ে গেছে’।

জনাব চৌধুরী বলেন, ‘সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এ ধরনের জিনিস পাওয়া যাবে না। সাম্প্রতিককালে তো পাওয়া যাবেই না। এদের হাতে আসলে টাকা আছে, তারা সরকার এবং বিরোধী দলে থাকার কারণে সংসদীয় গণতন্ত্রের অভূতপূর্ব ক্ষতি হয়েছে’।

‘বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনা করা। তারা যে কথাগুলো বলেছে, তা সরকারি দলও বলেছে। সরকারকে কোনোরকম জবাবদিহিতার মধ্যে তারা আনতে পারেনি। আমরা তো দেখেছি, সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী প্রশ্ন করছেন, আমাদের ভূমিকা কী?’

সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধিতে বিরোধী দলের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সেখানে বলা আছে, ‘সংসদে সরকারের বাইরে যে সর্ববৃহৎ দল সরকারের বিরোধিতা করবে, সেটিই বিরোধী দল। কিন্তু জাতীয় পার্টি সরকারের অংশ হওয়ায় সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে পারেনি।

এজন্য বিশ্লেষকরা মনে করেন, আসন ভাগাভাগির নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে মন্ত্রীসভায় স্থান দেয়ায় প্রকৃত অর্থে দশম জাতীয় সংসদে কোনো বিরোধী দল নেই। তাছাড়া বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংঘর্ষিক। গত পাঁচ বছরে সংসদে জাতীয় পার্টি একটিও ‘না’ ভোট দেয়নি। তাই বিরোধী দল হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ।

তবে জাতীয় পার্টিকে সফল বিরোধী দল মনে করেন পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার।

কতটা সফলভাবে আপনারা দায়িত্ব পালন করেছেন? এ প্রশ্নের জবাবে জনাব হাওলাদার বলেন, ‘জাতীয় পার্টি একটা সুশৃঙ্খল পার্টি। এই পার্লামেন্টে দেশের মানুষের ভালো-মন্দ দুটো বিষয়েই কথা বলেছে জাতীয় পার্টি। সরকারের সমালোচনা যেমন করেছে, ভালো কাজের প্রশংসাও তারা করেছে। ব্যাংকের টাকা লুট, বিদেশে টাকা পাচার, দুর্নীতি, টাকা না দিলে চাকরি হয় না- এসব বিষয়েও কথা বলেছেন আমাদের এমপিরা’।

রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ মানুষের হাজারো সমস্যার কথা সংসদে তুলে ধরেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার সেই বক্তব্যের মূল্যায়নও করেছেন। অনেক সমস্যার সমাধান করেছেন। সারা দেশেই তো একটা উন্নয়নের ঢেউ লেগেছে। আমরা প্রমাণ করেছি যে, শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়। তাই আমরা বলছি, আসুন, সবাই মিলে দেশটাকে গড়ি’।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জন্মের পর প্রথম সংসদে বিরোধী দল খুব ছোট আকারে ছিল। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ সংসদে আধা গণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী দল খুব একটা ভুমিকা পালন করতে পারেনি। পঞ্চম ও অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। ষষ্ঠ সংসদে বিএনপির এক দলীয় নির্বাচনে বিরোধী দল হয় ফ্রিডম পার্টি।

সপ্তম ও নবম সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে বিএনপি। আর দশম সংসদে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলে বসে জাতীয় পার্টি, কিন্তু মানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলন তারা ঘটাতে পারেনি।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
  12345
2728     
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com