সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২০, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন

মন্ত্রীত্ব মিডিয়া ও আয়রন লেডির নি:সঙ্গতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

রাহুল গান্ধীকে পটিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছ। সাংস্কৃতিক জগৎ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে পারে।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ছিলে, ভারতের মতো একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কীভাবে কাজ করবে? তোমার কোনো অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, যোগ্যতা নেই। এভাবে দিল্লির একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদকে। সময়টা ২০১২ সাল। দিল্লিতে আন্তর্জাতিক মিডিয়া কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলাম।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনিয়র সাংবাদিকরা এতে অংশ নেন। বাংলাদেশ থেকে দুজন। সিনিয়র সাংবাদিক প্রয়াত জাহাঙ্গীর ভাই আর আমি। সাত দিনব্যাপী সম্মেলনের শেষ দিকে এলেন সালমান খুরশিদ। মাত্র দুই দিন আগে তিনি কংগ্রেস সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম সাক্ষাৎ। সিদ্ধান্ত হয় আমাদের সঙ্গে মন্ত্রীর বৈঠকের আগে কথা বলবেন ভারতীয় সাংবাদিকরা। তারপর কনফারেন্সে আসা বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়। ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা থাকতে পারব। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করতে পারব না। শুনতে পারব। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রশ্ন করতে পারব যে কোনো বিষয়ে। মতবিনিময় অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আকবর উদ্দিন। তিনি একজন ডাকসাইটে কূটনীতিক। মিডিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের নাম ধরেই প্রশ্ন করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। সাংবাদিকদের কড়া কড়া প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছিলেন সালমান খুরশিদ। উত্তরও দিচ্ছিলেন হাসিমুখে। পাশে বসে থাকা জাহাঙ্গীর ভাইকে বললাম, এমন প্রশ্ন আমাদের দেশে করলে সাংবাদিক হতেন নাজেহাল। আর আকবর উদ্দিনের স্থলে থাকা কর্মকর্তা হতেন বদলি। তিনি হাসলেন। বললেন, যত দিন যাচ্ছে বদলে যাচ্ছে মিডিয়া পরিস্থিতি। অনেক সময় নিজেরাও প্রশ্নের পরিবর্তে তোষামোদে জড়াই আমরা। সমস্যা দুই দিকেই। আবার বাস্তবিক প্রশ্ন করার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্টরাও ভালোভাবে নেন না। আমাদের কথার ফাঁকে উত্তর দিলেন সালমান খুরশিদ। তিনি প্রশ্নকারীকে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর বললেন, তুমি সঠিক প্রশ্ন করেছ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতার অভাব থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমি একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রী। আমার দলের নির্দিষ্ট ম্যানিফেস্টো রয়েছে। সরকারের রয়েছে নির্দিষ্ট পররাষ্ট্র নীতিমালা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা আছেন। তাঁরা সরকারের নীতিমালাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে আমাকে সহায়তা করবেন। আর সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলো কিনা আমি সমন্বয় ও মনিটরিং করব। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেব। কেউ ভুল করলে ধরিয়ে দিয়ে সংশোধন করব। আশা করছি মন্ত্রণালয় চালাতে সমস্যা হবে না।

আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে। ২০০৬ সালে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলাম। এক মাসের কর্মসূচি ছিল। এ কর্মসূচিতে আমেরিকার বিভিন্ন বিষয়ে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেওয়া হয় বিদেশি সাংবাদিকদের। আমরা দক্ষিণ এশিয়ার সাত সাংবাদিক ছিলাম। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে পেন্টাগন, বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার, কোনো কিছুই বাদ ছিল না। একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় আলজাজিরার ওয়াশিংটন অফিসে। বিখ্যাত সাংবাদিক রিজ খানসহ অনেকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হয়। বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করি। একপর্যায়ে আমি জানতে চাই- মার্কিন সরকারের সঙ্গে আলজাজিরার সম্পর্কটা ভালো নয়। ইরাক ও আফগান যুদ্ধকে ঘিরে এ দূরত্ব বেড়েছে। পশ্চিমা মিডিয়া করছে এক ধরনের খবর, আলজাজিরা আরেক ধরনের। বিশ্ববাসীর কাছে আলজাজিরা অধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ওয়াশিংটনে বসে কাজ করতে সমস্যা পোহাচ্ছে কিনা আলজাজিরা। জবাবে তারা বললেন, না, কোনো সমস্যা নেই। বরং মজা পান তারা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে। একদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসকে আলজাজিরার সাংবাদিক মাইক্রোফোন এগিয়ে প্রশ্ন করতে গেলে তিনি বললেন, আই হেইট আলজাজিরা। তারপর কথা না বলে হন হন করে হেঁটে চলে যান। আলজাজিরার সাংবাদিকও এটুকু নিয়েই ফিরলেন, আই হেইট আলজাজিরা। এ ছাড়া তেমন কোনো খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। আলজাজিরা অফিসে দীর্ঘক্ষণ ছিলাম। তাদের কাজের ধরনগুলো দেখলাম।

পুরনো দিনের মিডিয়াস্মৃতি ঘাঁটতে গিয়ে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধুর একটি কথা। ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘ভাত কাপড় পাবার ও আদায় করে নেবার অধিকার মানুষের থাকবে, সাথে সাথে নিজের মতবাদ প্রচার করার অধিকারও মানুষের থাকা চাই। তা না হলে মানুষের জীবনবোধ পাথরের মতো শুষ্ক হয়ে যায়। ’ বঙ্গবন্ধু মানুষকে বুঝতেন। মানুষের মন বুঝতেন। আর বুঝতেন বলেই এত বড় বিশালত্ব তৈরি করতে পেরেছিলেন। হিমালয়-উচ্চতা নিয়ে স্বাধীন করতে পেরেছিলেন এ দেশকে। মানুষের জীবনের সব হিসাব-নিকাশ এক রকম মিলবে না। মত ও পথের অনেক ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু সবকিছু নিয়েই চলতে হয় আমাদের। সময় পরিবেশ পরিস্থিতি সব সময় এক রকম থাকে না। কিন্তু সময়কে জয় করে এগিয়ে চলার আনন্দটাই আলাদা। চলার পথে অনেক বাঁক থাকে। কিন্তু বাস্তবতাকে পাশ কাটালে চলে না। জানি, রাজনীতি তার মতো করেই চলবে। সবাই সমান হবে এমনও নয়। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে যার যার অবস্থান আলাদা থাকতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকাটা জরুরি।

নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে ক্ষমতার রাজনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়। দক্ষ নেতৃত্ব এগিয়ে নিতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে পরিষ্কারভাবে তিনি এ বাস্তবতাগুলো তুলে ধরেছেন। এ ব্যাপারে খুলনার একটি ঘটনাও আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে। কাজ করার সঙ্গে ক্ষমতার বিষয়টি জড়িয়ে থাকে। ক্ষমতা না থাকলে কীভাবে কাজ করবেন? এখন মন্ত্রীর কাজটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি বা সাবেক মন্ত্রীর পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতাবানদের ধৈর্য নিয়েই কাজে মনোনিবেশ থাকা জরুরি। ক্ষমতায় গিয়ে কাজ করার সৌভাগ্য সবার হয় না। আবার উড়ে এসে জুড়ে বসারা কোনোকালেই আদর্শিক রাজনীতি বাস্তবায়ন করতে পারে না। অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশ অনেককে ক্ষমতার সুযোগও দেয় না। ভাগ্য কিছু মানুষের সঙ্গে খেলে থাকে। এমনই হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আ ফ ম মাহবুবুল হকের ক্ষেত্রে। সারাটা জীবন শুধু লড়াই করেছেন। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাননি অথবা মেলাতে পারেননি। ডাকসু নির্বাচন করলেন। জয়ী হলেন। ঘোষণা পাননি। ’৯১ সালের ভোটে নোয়াখালীর চাটখিল থেকে পরাজিত হন মাত্র দুই শর কম ভোটে। জয়ী হন বিএনপির সালাহ উদ্দিন কামরান। মাহবুবুল হকের এমপি হওয়া হলো না। ডাকসুর ভিপি হওয়া হলো না। কোনো আফসোস ছিল না জীবনে। রাজনীতি করেছেন আদর্শিক অবস্থান থেকে। কষ্ট করে চলতেন। বুঝতে দিতেন না অন্যকে। বাসে চড়তেন। বন্ধুরা সহায়তা করতে চাইলে নিতেন না। শেষ বয়সটা ছিল ট্র্যাজিক। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। হারিয়ে যায় স্মরণশক্তি। কানাডা নিয়ে গেলেন স্ত্রী, সন্তান। আর ফিরে এলেন না দেশে। বছরখানেক আগে চলে গেলেন চিরতরে।

মানুষের জীবনটা খুবই কম সময়ের। আজ আছি, জানি না কাল থাকব কিনা। করোনাকাল অনেক কিছু ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে। দুই দিন আগে চলে গেলেন আমার পাশের গ্রামের একজন মানুষ সাইফ উল্লাহ মিয়াজি। বিএনপির রাজনীতি করতেন। কেন্দ্রের দফতর সম্পাদক ছিলেন। বাসা ছিল নয়াপল্টনে। ’৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর একদিন ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার তাকে নিয়ে গেলেন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে। বেগম জিয়া এই মানুষটাকে পছন্দ করতেন। সালাম তালুকদারকে তিনি বললেন, মিয়াজিকে নেপাল, ভুটানের রাষ্ট্রদূত করে দিন। মোস্তাফিজ সাহেবকে আমার কথা বলুন। অনেক কষ্ট করেছে, ঘুরে আসুক। মিয়াজি বললেন, ম্যাডাম! আমি দুঃসময়ে দলের অফিস সামাল দিয়েছি। মহাসচিব যেভাবে বলেছেন, কাজ করেছি। আপনি যা বলেছেন শুনেছি। আমাকে এই ছোটখাটো স্থানে কেন পাঠাবেন! দিলে ভালো কিছু দিন। তিনি ইংগিত করলেন মন্ত্রিসভার দিকে। এ গল্প মিয়াজি সাহেবের কাছে শোনা। তখন কাজ করি ভোরের কাগজে। তিনি আমাদের নয়াপল্টনের অফিসে এলেন। জানিয়ে গেলেন বড় কিছু পাচ্ছি। তাকে বলেছিলাম, ঘরের লক্ষ্মী ঠেলে দিলেন কেন? বাকি জীবন কিছু পাবেন বলে মনে হয় না। ক্ষমতার রাজনীতি বড় জটিল। তিনি আমার কথায় ব্যথিত হলেন। বললেন, আপনাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পুরাতন সম্পর্ক। আপনি আমাকে অবমূল্যায়ন করেছেন। আমার সম্পর্কে ধারণা নেই আপনার। মিয়াজি সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজনীতি থেকে আর কিছু পাননি। কিন্তু বিএনপির রাজনীতি ছাড়েননি। আদর্শিক অবস্থানটা ধরে রেখেছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। সবাই এভাবে পারে না। চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ বড় নিষ্ঠুর। হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকে ছিটকে পড়েন। চলে যান অনেক দূরে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীই এখন আক্ষেপ করেন। বঞ্চনার কথা বলেন। সেদিন এক নেতা বললেন ঢাকার উত্তরার শূন্য আসনটি নিয়ে। এ আসনটিও চায় বিজিএমইএ। রাজনীতিতে বিজিএমইএ ভালো করছে। গার্মেন্টের আগামীর চেয়ে বিজিএমইএ নেতারা রাজনীতিতে এখন অনেক বেশি আগ্রহী। সরকারি দলও তাদের প্রাধান্য দিচ্ছে। উত্তরার আসন কে পাবেন জানি না। বিজিএমইএ নেতাদের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিস্মিতও হব না। নেতা তৈরিতে এখন ছাত্রলীগ, যুবলীগের চেয়ে বিজিএমইএ এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। এমনই হয়। সরকারে এক, বিরোধী দলে আরেক রাজনীতি। আওয়ামী লীগে এখন ব্যবসায়ীদের কদর। মন্ত্রিসভা, সংসদ সবখানে ব্যবসায়ীরাই বেশি। রাজনৈতিক কর্মীদের দরকার হয় বিরোধী দলে থাকতে। সরকারে তাদের না হলেও চলে। সরকার চলে অতি উৎসাহী আমলা, ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ দিয়ে। আর বিরোধী দলে দরকার কামলা। যা করেন সব কর্মীরা। দুঃসময় এলে তারাই থাকেন। সুযোগসন্ধানীরা থাকে না। ক্ষমতার রাজনীতির খারাপ দিক নেতাদের কোন্দল। পোড় খাওয়া নেতারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অকারণে লড়াই করেন। তখন সুযোগটা নেন বহিরাগতরা। সমস্যাটা এখানেই তৈরি হয়। নিজের ঘরের আগুনে পুড়ে রাজনীতিবিদরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। নিজেদের ভুল নিজেরা বুঝতে পারেন না।

রাজনৈতিক সরকারে দরকার দক্ষ কিছু মন্ত্রী। যারা সরকারের নীতিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করবেন। অনিয়ম-অব্যবস্থাকে কঠোরভাবে মনিটরিং করবেন। সরকারকে সঠিক পথে চলতে কাজ করবেন। মাঠের নেতা-কর্মীদের দরদ দিয়ে আগলে রাখবেন। গণতন্ত্রের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতিকে রাখতে হয় রাজনীতিবিদদের কাছে। নিজের লোকেদের সঙ্গে গ্যাপ না থাকাই ভালো। ইতিহাস তা-ই বলে। ইতিহাসের নানা মেরুকরণ আছে। হিসাব-নিকাশ আছে। চলার পথে অনেক সংকট আছে। অনেক জটিলতা আছে। তবু পথ চলতে হয় বাস্তবতাকে সামলে। এখানে গরমিল হলেই বিপদ আসে হুট করে; যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়।

এই লেখা শেষ করছি মার্গারেট থেচারের বিপাকে পড়ার বাস্তবতা নিয়ে। ক্ষমতার রাজনীতিতে দলের সঙ্গে দূরত্বে সংকটে পড়েছিলেন মার্গারেট থেচার। সবচেয়ে কঠোরতম শাসক বলা হতো তাঁকে। বিরোধী পক্ষ, কঠোর শ্রমিক আন্দোলন মোকাবিলা করেন তিনি হাসতে হাসতে। কিন্তু নিজ দলের সঙ্গে দূরত্বই কাল হয়ে যায় তাঁর। মার্গারেট থেচারকে বলা হতো ব্রিটেনের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮১ সালে জনমত জরিপের ফলাফল থেচারের কনফিডেন্স আরও বাড়িয়ে দেয়। থেচার চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করতেন। অবশ্য চ্যালেঞ্জের মাঝেই তাঁর রাজনৈতিক বিকাশ। ১৯৭৫ সালে রক্ষণশীলদের নেতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। তাঁর সরকারের শিক্ষামন্ত্রী থেচার। শিক্ষা খাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি লাইমলাইটে আসেন। থেচার হঠাৎ ঘোষণা দেন নেতৃত্ব নিয়ে লড়বেন হিথের বিপক্ষে। হইচই পড়ে যায় ব্রিটেনে। লড়াই শুরু হয় দলের ভিতরে। ব্রিটিশ মিডিয়ার কৌতূহলী চোখ গিয়ে পড়ে থেচারের ওপর। ব্রিটেনে একজন নারীর প্রধানমন্ত্রী পদে লড়ার ঘোষণা অনেকের কাছে ছিল বিস্ময়ের। হিথ তখন বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি না আমার জীবদ্দশায় কোনো মহিলা ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী হবেন। ’ হিথের এ অবজ্ঞা থেচারকে আরও জেদি করে তোলে। তিনি মাঠে নামেন। শেষ পর্যন্ত দলীয় নেতৃত্বের লড়াইয়ে হিথ হারলেন মার্গারেট থেচারের কাছে। দলের নেতৃত্বকে গতিশীল করে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে থেচার জিতলেন। হলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী হয়েই আর্জেন্টিনার সঙ্গে বিরোধে থাকা ফকল্যান্ড দ্বীপ দখলে নেন। এ যুদ্ধজয়ে মার্গারেট থেচারের জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায় ব্রিটেনে। এরপর তিনি নজর দেন দেশের ভিতরে। কমিউনিজমের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। জনপ্রিয় করে তোলেন বাজার অর্থনীতি। ১৯৮৩ ও ’৮৭ সালে আাবার ভোটে জয়ী হন। বারবার জয়ে থেচারের বিশাল উচ্চতা তৈরি হয় বিশ^ব্যাপী। কিন্তু ’৮৭ সালে জয়ের পর জনগণ ও দলের সঙ্গে গ্যাপ বাড়তে থাকে। এ নিয়ে একটি সিনেমা তৈরি হয় ‘আয়রন লেডি’। ছবিটি অস্কার পায়। থেচার চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেন মেরিল স্ট্রিপ। বাস্তবতা ও টানটান উত্তেজনা নিয়ে ছবিটি নির্মিত। ছবির কাহিনি ছিল বাস্তবতাকে ঘিরেই।

থেচারের বিপর্যয় শুরু শ্রমিক আন্দোলনে। আর ডালপালার বিকাশ ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধে। দল ও সরকার থেকে সিনিয়র নেতাদের পদত্যাগ ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা বিপাকে ফেলে থেচারকে। তিনি মনে করতেন সবকিছু সামলাতে পারবেন। তাই তিনি বলেন, ‘আমি লড়াই চালিয়ে যাব। জেতার জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। ’ কিন্তু শক্তিশালী দল না থাকলে জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় না। থেচারের হয়েছিল তাই। শেষ লড়াই তিনি করতে পারলেন না। পদত্যাগ করেন ’৯০-এর নভেম্বরে। ক্ষমতা ছাড়ার পর তাঁর আক্ষেপ ছিল। সংসদে লড়াইয়ের সুযোগ না দেওয়ার আক্ষেপ। তিনি দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতি করলে আপনার পিঠে কেউ ছুরি মারবে এমন ঝুঁকি থাকবেই। কিন্তু এটা আমি কখনো ক্ষমা করব না যে, আমাকে পার্লামেন্টের মাধ্যমে বিদায় নিতে দেওয়া হয়নি। এ আমি ভুলব না। ’ ক্ষমতা হারানোর পর থেচার এমপি ছিলেন আরও দুই বছর। কিন্তু এ লৌহমানবীর শেষ জীবন কেটেছিল অনেকটা নিঃসঙ্গতায়!

লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031    
       
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com