বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১০:২৫ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
তৃণমুলে কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করবে বিএনপি : এমপি আয়েন আ.লীগ সমর্থকদের উপর হামলার অভিযোগ নিয়ে ইসিতে ইমাম রাজশাহীতে নাচোল, গোমস্তাপুর, ভোলাহাটের নবীন ভোটারদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ভোটের প্রচারে সরকারি গাড়ি নয়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ব্যবহার করছেন একুশে গ্রেনেড হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে নৌকা প্রতিককে জয়ী করতে হবে- আসাদ পবার দর্শনপাড়া ইউপিতে মিলনের গণসংযোগ নৌকায় ভোট দিয়ে উপযুক্ত জবাব দিন—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আফরোজা আব্বাসের প্রচারনায় বাধা পাবনার ঈশ্বরদীতে নিখোঁজ যুবলীগ নেতার লাশ উদ্ধার শিবগঞ্জ সীমান্তে সাড়ে ৯ কেজি গানপাউডার উদ্ধার

বিএনপিতে গুরুত্ব হারাচ্ছে জামায়াত

নিউজ ডেক্স :আপনাদের সঙ্গে জোট করে আমরা চাপে পড়েছি’ গত অক্টোবরে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম খানের এমন মন্তব্য শরিকদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

এই কথাটি নজরুল বলেছিলেন জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ করেই। ১৯৯৯ সালের পর থেকে জোটবদ্ধ দুই দলের মধ্যে নানা সময় মান-অভিমান হয়েছে, কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে এমন কথা কখনো বলা হয়নি।

দেড় যুগ আগে জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে বিএনপির নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জামায়াতের যে ভূমিকা দেখা গেছে, তা এখন আর নজরে আসছে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত জামায়াতকে ছাড়াই নিচ্ছে। যদিও সিদ্ধান্ত হওয়ার পর জামায়াতের সঙ্গেও বসেছে তারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি বিষয়টি এইভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই যে, বিএনপি জনগণের দল। জনগণের মতামতই এখানে প্রাধান্য পাবে। আর জামায়াতের তো নিবন্ধন নেই। তাদের প্রতীক নেই। যে কারণে তারা হয়তো তাদের অতীতের যেসব বিষয় নিয়ে জনগণের মধ্যে নানা প্রশ্ন আছে, সেই বিষয়গুলোতে সংস্কার আনতে পারে। সেটা তাদের জন্য ভালো।’

বিএনপিতে জামায়াতের গুরুত্ব কমেছে কি না এমন প্রশ্নে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই সদস্য হাসি দিয়ে বলেন, ‘আপনিই বিচার করুন। জামায়াতের লোক আছে আমাদের সঙ্গে। কিন্তু দল নেই। কারণ তারা জামায়াত নামে তো দলও করতে পারছে না। এখন নির্বাচন করতে হবে স্বতন্ত্র বা অন্য কারও প্রতীক নিয়ে।’

সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে ছিল বিএনপি। কিন্তু সে সময় জামায়াতের চাপাচাপিতে দলটি ভোটে যায়। আর ভোটে বাজে ফলাফলের পর প্রকাশ্যেই জামায়াতের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন বিএনপির সেই সময়ের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। আবার ২০১৪ সালে বিএনপির ভোট বর্জনের পেছনেও জামায়াতের প্রভাব ছিল ব্যাপক।

তবে এবার উল্টে গেছে দাবার ছক। বিএনপি ভোটে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত জামায়াতের নেতারা বর্জনের পক্ষেই কথা বলেছেন। কিন্তু ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার একদিন পর বিএনপি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। আর ১১ নভেম্বর ভোটে আসার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই নিশ্চিত হয়ে যায়, এবার আর বর্জনের পথে হাঁটছে না আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলটি।

আর এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ১০ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে ২০ দলের অন্য শরিকদের পাশাপাশি জামায়াতেরও মত নেয় বিএনপি। তবে সেটি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

এবার জোটের মধ্যে আসন বণ্টনের আলোচনাতেও জামায়াতের দাবির বিষয়টি নিয়ে বিএনপি যতটা ভাবছে, তার চেয়ে বেশি কথা হচ্ছে আরেক শরিক জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিষয়টি নিয়ে।

গত ১৩ অক্টোবর গণফোরামের নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এরপর সরকারের সঙ্গে সংলাপ, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা বা অন্য যেকোনো সিদ্ধান্তে জামায়াতকে ডাকেনি।

বিএনপির নেতারা বলছেন, জামায়াত সমস্যায় জর্জরিত। তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছে, কেউ কারাগারে। নিবন্ধনও হারিয়েছে দলটি। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই চাপে আছে দলটি। এখন দলটিকে আগের মতো গুরুত্ব দিয়ে সমালোচনা গায়ে মাখতে চান না তারা।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের ভোট বিএনপির জন্য কার্যকর প্রমাণিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট প্রায় সমান হলেও জামায়াতের ৪ শতাংশের কিছু বেশি ভোট যোগ হওয়ায় নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় বিএনপি।

কিন্তু একাত্তরের আলবদর নেতা মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মন্ত্রী করার পরই সমালোচনায় পড়ে বিএনপি। আর ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে স্বাধীনতাবিরোধী দলের সঙ্গে জোট আর কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। বরং উল্টো বিএনপির জন্য বোঝা হিসেবে দেখা দেয়। আগের বারের চেয়ে ৮ শতাংশ ভোটই কেবল কমেনি তাদের, আসনও কমে ১৬৩টি।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে ২০১৩ সালে সহিংস আন্দোলনের পরও জামায়াতকে দায়ী করা হয়। আর ওই নির্বাচনের পর একটি বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বলেন, সময় এলে জামায়াতকে ছেড়ে দেবেন তিনি।

তবে ২০১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও জামায়াতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে বিএনপি। তখনো ব্যাপক সহিংসতা হয়। আর দ্বিতীয়বারের মতো খালি হাতে ঘরে ফেরে বিএনপি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘নিবন্ধন না থাকলেও জামায়াত আমাদের জোটসঙ্গী। সবাই মিলেই সবকিছুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও নতুন করে ঐক্যফ্রন্ট যুক্ত হয়েছে। যে কারণে এমনটা মনে হওয়াটা স্বাভাবিক।’

দলের অন্য একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে ঐক্যফ্রন্ট হওয়ার পর থেকে জামায়াতের গুরুত্বটা ডাইভার্ট হয়ে গেছে; যা অনেকটা দৃশ্যমানও।’

আসন বণ্টনের আলোচনায় আশাহত জামায়াত

২০০৭ সালের বাতিল হওয়া নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ৬০টি আসন চেয়ে চাপাচাপি করে জামায়াত। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগেও একই ঘটনা ঘটে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেই ৩৫ আসনে ছাড় দেওয়া হয় জামায়াতকে। ২০০১ সালে তিনটি এবং পরের নির্বাচনে চারটি আসনে দুই দলের প্রার্থী ছিল উন্মুক্ত।

তবে এবার জামায়াত বিএনপির কাছে আসন চেয়েছে ৫০টি। জামায়াতকে এবার ২০ থেকে বড়জোর ২৫ আসনে ছাড় দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। তবে জামায়াত ৩০টির নিচে আসনকে অসম্মানজনক হিসেবে ভাবছে।

আসন বণ্টনের আলোচনায় জামায়াতের বেকায়দায় পড়ার পেছনে গত জুলাইয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলটির লজ্জাজনক ফলাফলেরও ভূমিকা রয়েছে। মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীকে না মেনে জামায়াত সেখানে প্রার্থী করে এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে। কিন্তু ১০ হাজার ৯৫৪ ভোট পেয়ে তিনি জামানত হারান।

জামায়াত দাবি করেছিল, সিলেটে তাদের ভোট ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও আসতে পারবে। কিন্তু ভোটের পরিসংখ্যান বলছে উল্টো কথা। ১৯৯১ সালে সিলেট সদর আসনে দলটি ভোট পায় ১৭ হাজার ৫৪১ ভোট, যা শতকরা হিসাবে ছিল ১৪.৯৬। ১৯৯৬ সালে এই ভোট দাঁড়ায় ১৮ হাজার ২৯, তবে শতকরা হিস্যা কমে দাঁড়ায় ৯.৮৪। আর এবার সিটি নির্বাচনে ভোটের হিস্যা আরও কমে হয় ৫.৭ শতাংশ।

এই বিষয়টি তুলে ধরে বিএনপির নেতারা বলছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর এখন দলটিকে আর আগের মতো আসন দেওয়ার মানেই হয় না। তারা মনে করেন, আসন যা-ই দেওয়া হোক, জামায়াতের জোট ছাড়ার সুযোগ নেই। কারণ, একক শক্তিতে লড়াই করে দলটি ১৯৯৬ সালে কেবল তিনটি আসন পেয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায় বলেন, ‘রাজনীতি করলে অনেক কথাই শুনতে হয়। এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।’

‘আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত আসনের প্রার্থীদের তালিকা পাঠিয়েছি। আমরা বলেছি, আমাদের প্রস্তাবিত প্রার্থীরা ভালো এবং তাদের মনোনয়ন দিলে জয়ী হয়ে আসবে। এখন আলোচনা চলছে। আলোচনার মধ্য দিয়েই আসন বরাদ্দের বিষয়টিতে ভালো সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করি। এক্ষেত্রে বৃহত্তর স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

সার্বিকভাবেও জামায়াতের ভোট কমছে দেশে। ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো ভোটে অংশ নিয়ে দলটি পেয়েছিল ১২.৫৬ শতাংশ ভোট। ১৯৯১ সালে কিছুটা কমে ভোট দাঁড়ায় ১২.১৩ শতাংশ। ২০০১ সালে ভোট আরও কমে দাঁড়ায় ৭.২৪ শতাংশ। ২০০৮ সালে ভোট আরও কমে দাঁড়ায় ৪.৭ শতাংশ।

ইতিহাসবিদ আনোয়ার যা বলছেন

বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের বর্তমান সম্পর্কের ধরনকে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কৌশল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে তারা নতুন এই কৌশল নিয়েছেন। এর ফলে মনে হচ্ছে হয়তো বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে বা বিএনপিতে জামায়াতের গুরুত্ব কমেছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ‘নীতি ও আদর্শের দিক থেকে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। বিএনপি কখনোই জামায়াতের ভোট হারাতে চাইবে না। একইভাবে জামায়াতও বিএনপির সঙ্গ ছাড়তে চাইবে না। কাজেই তাদের মূল সম্পর্কটা পর্দার আড়ালে হলেও বজায় রয়েছে।’


©2014 - 2018. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Design & Developed BY ThemesBazar.Com