সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০৯:২৯ অপরাহ্ন

ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে বাড়তি অর্থ প্রদানের আহ্বান শেখ হাসিনার

নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২০
ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে বাড়তি অর্থ প্রদানের আহ্বান শেখ হাসিনার

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য বাড়তি অর্থ ও প্রযুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জি-২০ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী থেকে উত্তরণে প্রতিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

২৮ সেপ্টেম্বর ফাইনানশিয়াল টাইমসে প্রকাশিত শেখ হাসিনার নিবন্ধটি পাঠকদের জন্য অনূদিত আকারে তুলে ধরা হল।

বাংলাদেশের জন্য পানি হল জীবন-মরণ সমস্যা।

আমার দেশ হল বড় বড় নদী, বিস্তৃত উপকূল ও বিপর্যয় মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম মানুষের দেশ। কিন্তু ২০২০ সাল আমাদের অভূতপূর্ব পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মে মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান পথে রেখে গেছে ধংস চিহ্ন এবং তারপর মৌসুমি বৃষ্টি দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে পানিবন্দি করে ফেলে। এই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়; ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

পানি যখন আপনার বাড়িতে ঢুকে পড়ে, আপনার জিনিসপত্র নষ্ট করে, নামার সময় দূষণ আর রোগ ছড়িয়ে যায়, সেই পরিস্থিতি খুব কঠিন। আর তা দ্বিগুণ কঠিন হয়ে পড়ে যখন একই বছরে কোভিড-১৯ এর মত মহামারী দেখা দেয়। স্যানিটেশন ও মহামারী প্রতিরোধে অপরিহার্য পরিষ্কার পানি পাওয়াই কঠিন হয়ে যায়।

ঢাকায় বসে যখন আমি লিখছি, তখন ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা অববাহিকার পানি নেমে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের শঙ্কার মধ্যেও আমার দেশের জনগণ তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছে।

বন্যা থেকে বাঁচতে আর কী করা যায়, তা আমরা মূল্যায়ন করে দেখছি। ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে যাতে আমরা আরও প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে পারি, সে পরিকল্পনাও করা হচ্ছে বরাবরের মতোই। কারণ বাংলাদেশে আমাদের সব সময়ই ‘পরের বারের’ কথা ভাবতে হয়; জলবায়ু সঙ্কট বিরাম দেয় না।

যেসব দেশ নিজেদের জলবায়ু সঙ্কট থেকে সুরক্ষিত মনে করে, যেসব ব্যাংকার আর অর্থদাতারা মনে করেন যে তারা বিপদ এড়িয়ে যেতে পারবেন, তাদের আমি সতর্ক করে বলতে চাই: আপনারা তা পারবেন না। কোনো দেশ বা ব্যবসা যে একলা টিকতে পারে না, তা এই কোভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক সঙ্কট আমরা কেবল ঐক্যবদ্ধ চেষ্টার মধ্য দিয়েই মোকাবেলা করতে পারি। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ যে সহজ, তা এর মধ্যেই আমাদের সামনে প্রতিভাত হয়েছে। ২০২০ সাল এমন এক বছরে পরিণত হয়েছে, যখন বিজ্ঞানীদের কথায় কান না দিয়ে আমাদের আর উপায় নেই।

পুরো গ্রহজুড়ে এক জরুরি পরিস্থিতি এখন চলছে; জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও প্রকৃতির ত্রিমুখী সঙ্কটের মুখোমুখি আমরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়ছে, সঙ্কট আরও বাড়িয়ে তুলছে।

প্রকৃতির রুদ্র মূর্তি বাংলাদেশ শুধু একা দেখছে না। এ বছর আগুনে পুড়েছে অ্যামাজন, অস্ট্রেলিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া ও সাইবেরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও এশিয়ার বড় অংশ ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়েছে। আগামী বছরের জলবায়ু সম্মেলনের স্বাগতিক দেশ যুক্তরাজ্যও এবার বন্যার শিকার হয়েছে।

মানুষের কর্মকাণ্ড টেকসই না হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, বর্ষণ, ঘূর্ণিঝড়, তাপদাহ, ভূমিধস ও খরা এসে আরও বেশি ভয়াবহতা নিয়ে। এসব সঙ্কট খাদ্য নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলছে। এসবে দুর্যোগের ক্ষতির মাত্রা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে অনেক ছোট ছোট দ্বীপ ও উপকূলীয় দেশ তলিয়ে যাবে। গলে যাওয়া হিমবাহ থেকে বন্যা পর্বতের পাদদেশের দেশগুলোতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হবে। এতো বিশাল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর নেই।

কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী জি-২০ দেশগুলো, যখন একদম তলার ১০০টি দেশ মিলে মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ নিঃসরণের জন্য দায়ী। বড় নিঃসরণকারীদের দায়িত্বও বেশি; বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি (প্রাক শিল্পায়ন যুগের তুলনায়) দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখতে প্রয়োজনীয় প্রশমণের উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় অবদান তাদেরই রাখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলির জন্য বাড়তি অর্থ ও প্রযুক্তির সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জি-২০ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে চরম আবহাওয়া মোকাবেলা করার সর্বোত্তম প্রস্তুতি যাদের আছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। আমরা দেয়াল গড়ে তুলছি, শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদের বনানয়ন করছি এবং সমস্ত সরকারি কাজে দুর্যোগ কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি জুড়ে দিচ্ছি।

তবে এই লড়াই আমরা একা করতে পারব না। ৬৪টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চলতি সপ্তাহে এই গ্রহের জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দিতে একটি চুক্তিতে সই করেছে। এসব দেশে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বসবাস। বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এসব দেশ। সেখান থেকে আমাদের যেটা করতে হবে, তা হল অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গীকারে আসা।

পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন, জি-৭ ও জি-২০ সভার আয়োজক হিসেবে যুক্তরাজ্য ও ইতালিকে অবশ্যই এই লক্ষ্য অর্জনে প্রচেষ্টা চালাতে হবে, যার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ব্যাপক বিস্তৃত আর্থিক সহায়তার প্যাকেজও থাকবে।

ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, সিইও, সিএফওসহ সব স্তরের বিনিয়োগকারীদের এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের সাধারণ একটি অবস্থানে আসা খুবই জরুরি, কারণ প্রকৃতি যদি এমনভাবে বদলে যায়, যে আমাদের সুরক্ষা দেয়ার মত অবস্থা আর প্রকৃতির না থাকে, তাহলে ক্ষতিটা হবে আমাদের সবার। বাংলাদেশে যখন কিছু ঘটে, তা লন্ডন ও নিউইয়র্কের শেয়ার বাজারকেও তো প্রভাবিত করে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাঁচার সুযোগ কারও নেই। একমাত্র প্রতিকার হলো- সরকারী নীতি ও ব্যবসায়িক চর্চার পদ্ধতিগত পরিবর্তন; কার্বন নিঃসরণ উচ্চ থেকে নিম্ন মাত্রায় যাওয়া এবং গ্রহের ওপর অত্যাচার না করে যত্ন নেয়া।

কোভিড-১৯ এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভিভিড ইকোনিক্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর এর প্রভাব হবে মিশ্র। সবুজ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেয়ায় আমি ইইউকে স্যালুট জানাই। বাংলাদেশেও আমরা সেরকমই পরিকল্পনা করছি এবং আমি আশাবাদী অন্যান্য সরকার এবং ব্যবসায়ী নেতারাও এগিয়ে আসবেন। কর্মসংস্থান অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে। তবে সেই কর্মসংস্থান পরিকল্পনা যেন ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে করা হয়, আগামী দশকগুলোর কথা ভেবে মজবুত ভিত্তি তৈরি করা হয়, সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী ও প্রকৃতির ধ্বংসযজ্ঞ সবার জন্যই হুমকি। এগুলো মোকাবেলায় আমাদের একটি সাধারণ সমাধানের দিকে পৌঁছাতে হবে: গড়তে হবে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ বিশ্ব।

যেমনটি আমরা বাংলায় বলি, ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’। আমাদের এমন কিছু করা উচিত হবে না, যার ফল পাল্টানো যাবে না।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
     12
17181920212223
24252627282930
31      
      1
       
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930     
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031     
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
©2014 - 2020. RajshahiNews24.Com . All rights reserved.
Theme Developed BY ThemesBazar.Com