রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা হত্যা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাধারণ মানুষ, আইনজীবীরা। আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে স্বস্তি, আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার মিশ্র এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
রোববার (৭ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন। আদালত সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা জরিমানাও করেন।
সকাল ১১টায় বিচারক এজলাসে বসে রায় পাঠ শুরু করেন। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে রায়ের বিভিন্ন অংশ পাঠ করার পর বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদালতকক্ষে উপস্থিত অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেন।
রায়ের সময় কাঠগড়ার দৃশ্য ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মুখে মাস্ক পরা সোহেল রানা দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন। অন্যদিকে তার পাশে বসে থাকা স্বপ্না আক্তারকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। আদালতের রায় শোনার পরও সোহেলের মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
তবে উপস্থিত জনতার দাবি, এখন শুধু একটাই আশা—দ্রুত বিচার কার্যকর হোক, যাতে আইনের প্রতি বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হয়।
এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুই আসামিকে আদালতে আনা হয়। কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে এনে তাদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার পরপরই প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।
তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই দিন মামলাটি বিচারের জন্য শিশু ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ঈদুল আজহার ছুটির পর ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
বিচারিক কার্যক্রমে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে আদালত অভিযোগকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত বলে মনে করেন। মামলার ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে নিহত শিশুর বাবা-মা, বোন, স্বজন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ছিলেন।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় সোহেল রানা আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন, ‘আমার একটি ছাওয়াল আছে স্যার। আমাকে মাফ করেন।’ অন্যদিকে স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তবে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণকে গ্রহণ করে দুই আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেন।
ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন, যুক্তিতর্ক ও রায়—সব বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় মামলাটি দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত অনেকেই বলেন, এই রায় সমাজে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দেবে। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এমন আলোচিত মামলাগুলোর বিচার দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হবে।