জুলাই গণঅভ্যুথানের সারা দেশব্যাপি চলা হক্যা যজ্ঞের আরও দুটি মামলার রায় হতে পারে ঈদের পর এমনটাই আশা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। আজ রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২২টি মামলার বিচারাধীন রয়েছে। রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে দুটি মামলা। আশা করি ঈদের পরই এসব মামলার রায় হয়ে যাবে। ৩১টি মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমরা গুম-খুন এবং ক্রসফায়ারের ১৫০টি মামলার তদন্ত হাতে নিয়েছি। এরই মধ্যে এসব কাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নরসিংদী, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, রাজশাহীসহ দেশের যেসব স্থানে সবচেয়ে বেশি হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে, সেসব মামলার তদন্ত আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। এক্ষেত্রে আমরা তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের প্রসিকিউশন টিমকে অন্তর্ভুক্ত করে বিশেষ তদন্তের ব্যবস্থা করেছি। আশা করি খুব দ্রুতই এসব প্রতিবেদন দিয়ে আমরা বিচারের পর্যায়ে নিতে পারবো ইনশাআল্লাহ। যে দুটি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে তার মধ্যে একটি হলো জুলাই কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আট অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও রামপুরার একটি মামলার। এর মধ্যে একটি ট্রাইব্যুনাল-১ ও আরেকটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ অপেক্ষমাণ রয়েছে।
শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হস্তক্ষেপ উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, দুই সাংবাদিককে আমাদের ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। অ্যামনেস্টি কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা আমরা দেখিনি। আমাদের একটি চলমান বিচারপ্রক্রিয়ায় তাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না। আইনগত সুযোগও নেই। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার এখতিয়ার। তাদের কাজ করতে দেওয়াই উচিত। এখন কোনো সংস্থা, অ্যামনেস্টি হোক বা অন্য কোনো মানবাধিকার সংগঠন কারও এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
এ মামলায় আরও কোনো সাংবাদিককে গ্রেপ্তার দেখানো হবে কিনা; এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের তদন্ত চলমান। আমি আগেও বলেছি, যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তবে অহেতুক কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানির জন্য বিচারের মুখোমুখি করা হবে না।
আওয়ামীলীগের তদন্ত:
দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে তদন্ত চলছে কিনা প্রত্যক্ষ ধারণা নেই বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো ধারণা নেই। কোনো তদন্ত চলছে কিনা, তা তদন্ত সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলতে পারবেন। এ নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ কোনো ধারণা নেই। আওয়ামী লীগের তদন্তে তাহলে অগ্রগতি নেই; এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত চলছে কিনা, এমন কোনো ধারণা আমার নেই। এমন কোনো তদন্ত সম্পর্কে জানি না। অতএব যখন জানবো, তখন আপনারাও নিশ্চিত জানতে পারবেন।
গুম সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতা রিফাত নিলয় জোয়ার্দারকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ জুলাই দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের একক বেঞ্চ এ দিন ধার্য করেন।
শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই বিষয়ে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি থানা ইউনিটের সেক্রেটারি দায়িত্ব পালন করতেন। আমাদের যে ভিকটিম মামুন, তাকে বিশেষ বাহিনীর লোকজনের সহায়তায় দুই দুইবার অপহরণ করে দীর্ঘদিন তাদের হেফাজতে রেখে নির্যাতন করেন। আমরা প্রাইমারিলি এই বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার প্রেক্ষিতে তদন্ত সংস্থা আমাদের মাধ্যমে একটি আবেদন পাঠিয়েছিলেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে মাননীয় ট্রাইব্যুনাল তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়েছে আজ।
পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে, আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিবে। গুমের মামলায় বেশিরভাগ আসামি বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তারা আওয়ামীলীগের এই নেতা কিভাবে জড়িত ছিলো এই প্রশ্নের জবাবে চিফ বলেন, তদন্ত সংস্থা প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে, তা হলো তিনি তৎকালীন কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলামের ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, বেনজীরের ক্যাশিয়ার হিসেবেও ছিলেন এবং অনেকগুলো বাহিনী, ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে এই অপহরণগুলোর সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা আছে বলে পাওয়া গেছে। এর বেশি আর আপাতত আমরা কিছু জানি না। বাকিটা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
এদিকে, আজ সকালে কারাগার থেকে রিফাত নিলয়কে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। গত ১৯ মে তার বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চায় প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশন জানায়, রিফাত নিলয় জোয়ার্দারের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও প্রশ্রয়ে বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী মো. মশিউর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তিকে ডিজিএফআইয়ের নিয়ন্ত্রাধীন বিভিন্ন গোপন বন্দিশালায় আটক রাখা হয়।
এ সময়ে গুম করা ব্যক্তিদের ওপর বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ্ধতিগতভাবে হওয়া গুম-খুনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এজন্য তাকে গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চাওয়া হয়। রিফাত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ধানমন্ডি থানা আওয়ামী লীগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক। ধানমন্ডি থানায় হওয়া অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন তিনি।

