৩০ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ১২:০২:২০ পূর্বাহ্ন
চূড়ান্ত পর্যায়ে নতুন পে-স্কেল, কবে ও কীভাবে বাস্তবায়ন?
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৬-২০২৬
চূড়ান্ত পর্যায়ে নতুন পে-স্কেল, কবে ও কীভাবে বাস্তবায়ন?

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তুতি। সরকারের সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেলের সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হতে পারে। তবে সংশোধিত ভাতা কার্যকর হবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে। অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে দুই ধাপে।


অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি চলতি সপ্তাহেই নবম পে কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হতে পারে।


শুরুতে সরকার নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে তিন ও দুই বছর মেয়াদি দুটি বিকল্প নিয়ে কাজ করেছিল। তিন ধাপের পরিকল্পনায় আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের ১ জুলাই বাকি ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা কার্যকরের প্রস্তাব ছিল।



কিন্তু বাস্তবায়নের হিসাব-নিকাশ করতে গিয়ে দেখা যায়, দুই দফায় মূল বেতন কার্যকর করলে সরকারি হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমে (আইবিএএসপ্লাসপ্লাস) কারিগরি জটিলতা তৈরি হতে পারে।



একই সঙ্গে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে ৫০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর হলেও প্রকৃত বেতন খুব বেশি বাড়ত না, এমনকি কারও কারও মোট বেতন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একবারেই সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।


বর্তমানে যে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পথে রয়েছে, তাতে আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন স্কেলের পুরো মূল বেতন কার্যকর হবে। এরপর ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন ভাতা কার্যকর করা হবে।


সূত্র জানায়, বর্তমান ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১ থেকে ১০ নম্বর গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ বা তার কিছুটা কম এবং ১১ থেকে ২০ নম্বর গ্রেডে গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে এই হার নবম পে কমিশনের মূল সুপারিশের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে।


নতুন বেতনকাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোর আওতায় রয়েছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।


অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজেটের ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের মধ্য থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের ব্যয় বহন করা হবে।


নবম পে কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এ সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা যেত। তবে তিন ধাপের পরিবর্তে দুই ধাপে বাস্তবায়ন করাও একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।


অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


একইসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাস্তবায়নের আগে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।


নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে গত ২৭ জানুয়ারি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলেছেন, ২০১৫ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন সমন্বয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নের আগে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ঘাটতি, ঋণ গ্রহণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।


উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে দুই ধাপে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ওই বছর সংশোধিত মূল বেতন এবং পরের বছর সংশোধিত ভাতা কার্যকর করা হয়। এর ফলে বর্তমানে সরকার তার ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।


শেয়ার করুন