১৩ জুলাই ২০২৬, সোমবার, ১১:১৯:১৮ পূর্বাহ্ন
কক্সবাজারের ৫১ পাহাড়ে ২২ হাজার অবৈধ বসতি, ঝুঁকিতে কয়েক লাখ মানুষ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৭-২০২৬
কক্সবাজারের ৫১ পাহাড়ে ২২ হাজার অবৈধ বসতি, ঝুঁকিতে কয়েক লাখ মানুষ

কক্সবাজার শহর ও আশপাশের ৫১টি পাহাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি, যেখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। চলতি সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।


পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন। রাজনৈতিক প্রভাব, ভূমিদস্যু চক্র এবং পুনর্বাসনের অভাবে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।


টানা বর্ষণে কক্সবাজারের পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া, টেকনাইফ্যা পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। বাসিন্দাদের ভাষ্য, ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ে ফাটল ধরার শব্দই তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ঝুঁকি সম্পর্কে জানা থাকলেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই পাহাড় ছাড়তে পারছেন না।


শুধু গত এক সপ্তাহেই জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনায় পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীসহ অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।


প্রতি বর্ষায় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও বৃষ্টি শেষে আবার শুরু হয় পাহাড় কাটা ও অবৈধ বসতি নির্মাণ। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ভূমিদস্যু চক্র দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে পাহাড় দখল ও বিক্রি করছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণহানি বাড়ছে, অন্যদিকে বন উজাড় ও পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া পাহাড়ের বসতি স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে।


পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাদশাঘোনা এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের ঢাল, চূড়া ও পাদদেশে অন্তত ৬০০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণের চিহ্নও পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট পাহাড়ি জমি দখল ও বিক্রি করছে।


পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর জরিপ অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে চলতি বছরের ৮ জুলাই পর্যন্ত পাহাড়ধসে ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪ জন রোহিঙ্গা। সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ১৫ জুন, যখন একদিনেই প্রাণ হারান ৬২ জন।


পরিবেশবাদীদের দাবি, কক্সবাজার পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের ৫১টি পাহাড়ে গত তিন দশকে ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বসতিতে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস করছেন। তাঁদের অধিকাংশই ভাসমান শ্রমজীবী, জলবায়ু উদ্বাস্তু ও নিম্নআয়ের মানুষ।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ বলেন, পাহাড় কাটার ফলে শুধু গাছপালা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে না, পাহাড়ের পানি ধারণক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে শহরে জলাবদ্ধতাও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।


পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে পাহাড় দখল ও কাটার অভিযোগে পাঁচ শতাধিক দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২২০টি পাহাড় নিধনের মামলা। বন বিভাগও গত এক বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে ৩০৪টি মামলা করেছে। তবে জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পাহাড় নিধন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


শেয়ার করুন