নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা: চাল-চুলাহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি


, আপডেট করা হয়েছে : 10-08-2023

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা: চাল-চুলাহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি

দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকার পর হঠাৎ খোলা হলো একটি কার্যালয়। সেখানে ধোয়ামোছার কাজ চলছিল জোরেশোরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ডেভেলপমেন্ট পার্টনার (ডিপি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে কাজ করতে আবেদন করেছে। সাংবাদিকেরা দেখতে যাওয়ায় তড়িঘড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছিল কার্যালয়। যশোরের মনিরামপুর পোস্ট অফিস পাড়ার এই অফিস শেষ কবে খোলা হয়েছিল, তা বলতে পারেন না কেউ। সেখানে কাউকে যাতায়াত করতেও দেখা যায় না।


দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৬৮টি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছে। এগুলোর মধ্যে ৩৯টি সংস্থার কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন আজকের পত্রিকার সংবাদকর্মীরা। তাতে দেখা গেছে, ইসির তালিকায় ঠাঁই পাওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই নামসর্বস্ব। সেগুলোর এমনই চাল-চুলোহীন অবস্থা যে অনেক প্রতিষ্ঠানের অফিসও নেই। যে কয়েকটির অফিস আছে সেগুলোও জরাজীর্ণ, এমনকি অফিস পাওয়া গেছে কৃষিজমিতেও।


নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালায় পর্যবেক্ষকের যোগ্যতা সম্পর্কে বলা আছে, ‘পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োজিত ব্যক্তির কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীর সাথে ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা থাকিতে পারিবে না; কোন রাজনৈতিক দল বা এর কোন অঙ্গ-সংগঠনের সাথে কোনভাবে যুক্ত কেহ নির্বাচন পর্যবেক্ষক হইতে পারিবেন না।’


পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ইসির তালিকায় থাকা অনেক সংস্থার প্রধানেরাই রাজনৈতিক দলের পদবিধারী।


শুধু যশোরেই ডিপিসহ আটটি প্রতিষ্ঠান আছে পর্যবেক্ষকের তালিকায়। একটির নাম হিউম্যান রাইটস ভয়েস। যশোরের কারবালা রোডে অফিস থাকলেও সংগঠনটির প্রধান এ কে এম নুরুল আমিন জেলা জাতীয় পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। তালিকায় থাকা সার্ভিসেস ফর ইক্যুইটি অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (সিড) সাইনবোর্ডসর্বস্ব। ১৫-১৬ বছর ধরে কার্যক্রম না চলায় মনিরামপুরে সিডের ঝোপঝাড়ঘেরা কার্যালয়টি এখন জরাজীর্ণ। এই সংস্থার সভাপতিকে কেউ চেনেন না। সিডের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানাও বলেছেন, ‘এখন এনজিওর তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। এবার আমরা নির্বাচনে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পাচ্ছি।’ যশোরে আরেক সংস্থা ‘সমাজ উন্নয়ন প্রয়াস’-এর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। বঞ্চিতা সমাজ কল্যাণ সংস্থা, বাঁচতে শেখা, এসো বাঁচতে শিখি ও প্রকাশ গণ কেন্দ্র—এই চারটি সংগঠন নারী ও শিশু অধিকার ও সমাজ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে আসছে।


রাজশাহীর স্বাস্থ্য শিক্ষা সেবা ফাউন্ডেশনের (সেফ) নাম আছে তালিকায়। জানা যায়, এর প্রধান রুপন কুমার দত্ত রাজশাহী মহানগর তাঁতী লীগের সিনিয়র সভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে জাল সনদে কলেজে চাকরি নিয়ে ধরা পড়ে চাকরি খোয়ানোর অভিযোগও আছে। রাজশাহী বা অন্য কোথাও সেফের অফিসও নেই, নেই কোনো সাইনবোর্ডও। রুপনের বাড়ির দরজায় সেফের নাম দিয়ে একটি কাগজের পোস্টার লাগানো আছে। নগরীর শাহ মখদুম কলেজের সামনে রুপনের ওষুধের দোকান। সেখানেই তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পাঁচ বছরে আমরা কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে জানতাম না যে দলের পদে থাকলে পর্যবেক্ষক হওয়া যাবে না। পরে জেনেছি।’


তালিকাভুক্ত মুভ ফাউন্ডেশন ইসিতে ঠিকানা ১২৪/১ আহম্মদবাগ, সবুজবাগ, ঢাকা। কিন্তু ওই ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে সংগঠনটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্থানীয় লোকজনও প্রতিষ্ঠানটির নাম শোনেননি বলে জানান। ওয়েবসাইটে দেওয়া ফোন নম্বরে কল করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। ফেসবুক পেজেও কোনো সাড়া মেলেনি। এসকে কল্যাণী ফাউন্ডেশনের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী রাজধানীর খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়ায় গিয়েও এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজও নেই।


তালিকায় থাকা শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রের অফিস রাজধানীর বিজয় সরণিতে। যদিও সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ঠিকানা দেওয়া আছে পূর্ব তেজতুরী বাজার। কয়েক বছর আগে স্থানান্তর করা হলেও তা ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করা হয়নি। অফিস থাকলেও নেই কোনো ব্যানার বা সাইনবোর্ড। 

মিরপুরের রূপনগর শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশন তালিকাভুক্ত হলেও এর কোনো অফিস নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান এইচ এম আব্দুর রাজ্জাক নিজের বাসাকেই অফিস হিসেবে ব্যবহার করছেন।


ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশের অফিস মিরপুরের টোলারবাগে। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক সঞ্চিতা তালুকদারের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য জানা যায়নি। তবে তাঁর বড় ছেলে কল্যাণপুর ও মিরপুর ১ নম্বর এলাকায় যুবলীগের সর্বোচ্চ পদধারী নেতা।


তালিকার ৮ নম্বরে আছে জানিপপ (জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ)। সংস্থাটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে সায়েন্স ল্যাবের লিলি অর্কেডের চারতলায়। তবে সেই ঠিকানায় গিয়ে কার্যালয় বন্ধ পাওয়া গেছে, তালায় জমেছে ধুলোর আস্তরণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জানান, এই কার্যালয় বছরখানেক খোলা হয় না। আরেকজন জানান, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে এখানে কাজ হতে দেখেছেন তিনি। কয়েক মাস আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসে কার্যালয়টি পরিদর্শন করে গেছেন।


সংস্থার প্রধান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ভবনটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। ওখানেই জানিপপের কার্যালয়। সেখানে স্থায়ী কোনো কর্মী নেই। নির্বাচন এলে আমরা একসঙ্গে সেখানে বসি।’ লালমাটিয়ায় কোনো কার্যালয় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না। ২০১৮-এর জাতীয় নির্বাচনের সময় আমরা সেখানে কার্যক্রম চালিয়েছিলাম।’


তালিকাভুক্ত বিবি আছিয়া ফাউন্ডেশনের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে পুরানা পল্টনের বায়তুল খায়ের টাওয়ার। তবে ১২ তলা ভবনটিতে এই সংস্থার কোনো কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি।


তালিকায় থাকা হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী রাজধানীর মোহাম্মদী হাউজিং এলাকায় গেলে সেখানে ‘যানজাবিল ফুড’ নামের একটি দোকান পাওয়া যায়। ইন্টিগ্রেটেড সোসাইটি ফর রেইজ অব হোপ (রিশ)-এর অফিস দূরে থাক, কোনো সাইনবোর্ডও নেই। ইসিতে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী আদাবরের শেখেরটেক গিয়ে ক্রিয়েটিভ সার্ভিসেস লিমিটেড নামে অন্য একটি অফিস পাওয়া গেছে। সেখানে রিশের কোনো নামগন্ধও পাওয়া যায়নি। রিশের সভাপতি রিয়াদ সরকার ময়মনসিংহে থাকেন।


ময়মনসিংহের তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা ও হিউম্যান ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (হিড্স) নাম তালিকায় থাকায় চলছে ব্যাপক সমালোচনা। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার তারাটী ইউনিয়নের মৈশাদিয়া গ্রামে হিডসের প্রধান কার্যালয় দেখানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, এই এনজিওর প্রধান রুহুল আমীনের গ্রামের বাড়ির একটি কৃষিজমিতে ছোট একটি আধা পাকা ঘরের বারান্দায় চালার সঙ্গে এনজিওটির একটি সাইনবোর্ড ঝোলানো। ঘরের দুটি দরজায়ই তালা লাগানো। স্থানীয় রহমত আলী ও ফারুক হোসেন জানান, রুহুল আমীন ঢাকায় থাকেন, বছরে দু-একবার আসেন। এটা যে কোন অফিস, সেটা তাঁরা জানেন না। তাঁরা জানেন, এটা সেচের পাম্পের অফিস।


সেতু রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসআরডিএস) ইসিতে ঠিকানা দিয়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান এলাকার। সেই ঠিকানায় কিছু নেই। বড়াইবাড়ী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাড়া বাসায় ছোট একটি সাইনবোর্ড ঝুলছে সংগঠনটির। ২০০৮ সাল থেকে সংগঠনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করলেও এলাকার লোকজন কিছুই জানেন না। কার্যালয়ের পাশের বাড়ির মালিক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমার ভাতিজার বাড়ি ভাড়া নিয়ে এসআরডিএস নামে সংগঠন খুলেছে। এখানে কোনো কাজ-কাম নেই, সব ভণ্ডামি।’ গ্রাম্য চিকিৎসক জগদীশ চন্দ্র বলেন, ছয়-সাত মাস ধরে কার্যালয়টি বন্ধ। এসআরডিএসের পরিচালক মোতাব্বর হোসেন বলেন, ‘চৌধুরী বাড়ি বড়াইবাড়ীতে আমাদের কার্যালয়টি রেজিস্ট্রার কার্যালয়। মেইন অফিস হচ্ছে রংপুরের পাকার মাথায়। এখানেই সব কার্যক্রম চলে।’


এ বিষয়ে কথা হলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, এই নির্বাচন কমিশনের বিতর্কের আর অবসান হচ্ছে না। এই কাজটিতে (পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন) তাদের বিতর্ক সৃষ্টি করার দরকার ছিল না। আমি তো শুনেছি, যে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়েছে, তাদের অনেকেরই লোকবল নেই, অনেকের অফিস নেই। শুধু তা-ই নয়, অনেকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ রকম করলে তো নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ রেফারির ভূমিকা পালন করতে পারবে না। প্রশ্ন জাগে, এদের দিয়ে কীভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে?’



  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার