জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে ট্রাম্পের গাজা ‘বোর্ড অব পিস’


, আপডেট করা হয়েছে : 21-01-2026

জাতিসংঘের বিকল্প হতে পারে ট্রাম্পের গাজা ‘বোর্ড অব পিস’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, গাজা পুনর্গঠন ও বিশ্ব শান্তি তদারকির জন্য তার প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ ভবিষ্যতে জাতিসংঘের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। 


মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, জাতিসংঘ দীর্ঘকাল ধরে তার সম্ভাবনা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই এই নতুন বোর্ড সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই বোর্ডের চার্টার অনুযায়ী ট্রাম্প আজীবনের জন্য এর চেয়ারম্যান পদে আসীন থাকতে পারেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 


বিশেষ করে যেখানে ন্যাটোর সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব চলছে, সেখানে জাতিসংঘের মতো ৮০ বছরের পুরোনো সংস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর এই পদক্ষেপকে অনেকেই বিপজ্জনক হিসেবে দেখছেন।


হোয়াইট হাউস গত শুক্রবার এই বোর্ডের একটি ‘প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ড’ গঠন করেছে, যার মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। খসড়া সনদ অনুযায়ী, ট্রাম্প এই বোর্ডের আমৃত্যু বা অনির্দিষ্টকালের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। 


তিনি কেবল তখনই অপসারিত হবেন যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন অথবা নির্বাহী বোর্ডের সর্বসম্মত ভোটে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম প্রমাণিত হন। এমনকি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট পদের সময়সীমা শেষ হয়ে গেলেও এই বোর্ডে তার ক্ষমতা অটুট থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে যে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশাপাশি এই বোর্ডে নিজের প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে পারবেন।


এই বোর্ডে সদস্যপদ পাওয়ার শর্ত এবং আমন্ত্রিত দেশগুলোর তালিকা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাশিয়া, চীন এবং বেলারুশের মতো দেশকে এই শান্তি বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার সাফ জানিয়েছেন, যারা বর্তমানে যুদ্ধ চালাচ্ছে, তাদের ‘শান্তি’ শব্দযুক্ত কোনো সংস্থায় থাকা মানায় না। 


অন্যদিকে, এই বোর্ডে একটি স্থায়ী আসন পেতে হলে দেশগুলোকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দিতে হবে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, এই অর্থ গাজা পুনর্গঠনে ব্যয় করা হবে, তবে অনেক বিশ্লেষক একে ট্রাম্পের মার-এ-লাগো ক্লাবের সদস্যপদ কেনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।


ফ্রান্সের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে এই বোর্ডে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের মতে, এই বোর্ডের সনদ কেবল গাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি জাতিসংঘের বিকল্প একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা। আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টি বলেছেন, জাতিসংঘের একটি অনন্য ম্যান্ডেট রয়েছে এবং একে দুর্বল করা ঠিক হবে না। 


অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ট্রাম্পের বোর্ড কখনোই জাতিসংঘের স্থলাভিষিক্ত হতে পারবে না। সাবেক মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ১৯৪৬ সাল থেকে টিকে থাকা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য সমৃদ্ধ জাতিসংঘের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া বা একে প্রতিস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়।


বোর্ড অব পিস নিয়ে এই সপ্তাহের শেষের দিকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে ট্রাম্প একটি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেন। ইতিমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলো এতে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অংকটি অনেক দেশের জন্যই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


অনেক কূটনৈতিক মনে করছেন যে, ট্রাম্প এই বোর্ডকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্যকে ভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। এই সংস্থাটি শেষ পর্যন্ত গাজায় শান্তি আনতে পারবে নাকি কেবল একটি অকার্যকর ব্যয়বহুল সংস্থায় পরিণত হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।



  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার