এ কোন বাংলাদেশ ! এ কেমন জাতি !


, আপডেট করা হয়েছে : 21-05-2026

এ কোন বাংলাদেশ ! এ কেমন জাতি !

বাংলাদেশ আজ এক ভয়ংকর সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক বাস্তবতায় আমরা এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে একটি শিশুও আর নিরাপদ নয়। রামিসার মতো নিষ্পাপ শিশুদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি মানবতা, সভ্যতা ও বিবেকের বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ।


একটি শিশুকে ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা, এরপর মরদেহ টুকরো করে গুমের চেষ্টা- এসব কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। এরা মানুষরূপী হিংস্র প্রাণী, সমাজের অভিশাপ। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, অপরাধীরা অনেক সময় অপরিচিত কেউ নয়; তারা প্রতিবেশী, আত্মীয়, পরিচিত কিংবা বিশ্বাসভাজন মানুষ। বাবা-মায়েরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সন্তানকে কার কাছে রেখে নিরাপদে থাকবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর হারিয়ে গেছে। সমাজে বিশ্বাসের জায়গাগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পারস্পরিক সম্পর্কের পবিত্রতা ভেঙে পড়ছে। মানবিকতা ও নৈতিকতার জায়গায় জন্ম নিচ্ছে বিকৃত মানসিকতা ও নিষ্ঠুরতা।


বর্তমান সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা। সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, পর্নোগ্রাফির বিস্তার, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মিলিয়ে এক অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। শিশুদের প্রতি যৌন বিকৃতি বা পেডোফিলিয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ক্রমেই সামাজিক মহামারির রূপ নিচ্ছে।


সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো- অনেক অপরাধী পূর্বে অপরাধ করেও সহজে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। একজন অপরাধী যখন বুঝতে পারে যে তার অপরাধের পরিণতি ভয়াবহ নয়, তখন সে আবারও অপরাধ করতে সাহস পায়। এখানে রাষ্ট্রের বড় ব্যর্থতা হলো দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে না পারা। একটি শিশু ধর্ষণের মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে। সাক্ষীরা ভয় পায়, পরিবার ভেঙে পড়ে, আর অপরাধীরা নানা উপায়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। এতে মানুষের আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়।


রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে বিচার বিলম্ব মানেই অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া। প্রত্যেক অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে—এটাই আইনের মূলনীতি। তাই একজন আইনজীবী অভিযুক্তের পক্ষে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু সমাজের সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- শিশু ধর্ষক বা খুনির পক্ষে দাঁড়াতে একজন মানুষের বিবেক কীভাবে অনুমতি দেয়? এখানে বিষয়টি শুধু আইনের নয়; নৈতিকতারও। আইন যেন অপরাধীকে রক্ষা করার হাতিয়ার না হয়ে যায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিচারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে যারা অপরাধীকে পালাতে সাহায্য করে, অপরাধ গোপন করে বা নীরব থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ অপরাধের সহযোগীও সমান অপরাধী। রামিসার ঘটনায় যেভাবে অপরাধীদের পালাতে সাহায্য করা হয়েছে, তা সমাজের জন্য আরেকটি ভয়ংকর বার্তা বহন করে।যখন একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু একজন অপরাধী নয়, একটি অসুস্থ সামাজিক পরিবেশও দায়ী থাকে।


সন্তান নিরাপত্তা এখন জাতীয় সংকট। আজকের বাস্তবতায় সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে পড়ালেই হবে না; তাকে সচেতনও করতে হবে। “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। শিশু যেন ভয় ছাড়া নিজের কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কিন্তু শুধু পরিবার সচেতন হলেই চলবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্কুলে শিশু নিরাপত্তা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পাশাপাশি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ, মাদক নির্মূল ও অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় বন্ধ করতে হবে।


মানুষ আজ কঠোর শাস্তি চায়। অনেকেই প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড বা “ক্রসফায়ার” দাবি করছেন। কারণ সমাজে এমন এক ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে, যেখানে মানুষ মনে করছে, ভয় সৃষ্টি না হলে অপরাধ বন্ধ হবে না। রাষ্ট্রের উচিত শিশু ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। অপরাধী যেন বুঝতে পারে- এই অপরাধের পরিণতি অনিবার্য।


রামিসা আজ শুধু একটি শিশুর নাম নয়; সে বাংলাদেশের প্রতিটি অসহায় শিশুর প্রতীক। তার রক্তাক্ত দেহ আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও বিবেককে প্রশ্ন করছে- আমরা কেমন মানুষ হয়ে যাচ্ছি? যে দেশে শিশুরা নিরাপদ নয়, সে দেশ কখনো সভ্য হতে পারে না।

যে সমাজ ধর্ষকের ভয়ে কাঁপে, সেখানে মানবতা টিকে থাকে না।


আজ প্রয়োজন দল-মত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে শিশু নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া। বিচার যেন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে; বাস্তবেও কার্যকর হয়। অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের আড়ালে লুকাতে না পারে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের শেষ আবেদন একটাই- দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং নিরাপদ বাংলাদেশ। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামীকাল এই অমানবিকতার আগুন পৌঁছে যাবে আমার, আপনার এবং প্রতিটি ঘরে ঘরে। তাই আজই আওয়াজ তুলুন এখনি- ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই ক্রসফায়ার।


লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক, জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।



  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার