ভোট কে চাইছে আর কে চাইছে না


, আপডেট করা হয়েছে : 17-06-2023

ভোট কে চাইছে আর কে চাইছে না


জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর ছয় থেকে সাত মাস। ভোটের যুদ্ধে নেমে পড়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোসহ সব পক্ষের প্রস্তুতি প্রায় শেষের পথে থাকার কথা। অথচ ভোটের মাঠে প্রধান দুই পক্ষের বক্তব্য কেমন যেন এলোমেলো। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে, নির্বাচনে না যাওয়ার ছুঁতো খুঁজছে বিএনপি। কিন্তু বিএনপির অভিযোগ, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকার বিএনপিকে মাঠছাড়া করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কাজেই ভোট কে চাইছে আর কে চাইছে না, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে সামনে আসছে।


আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এমন বিপরীত অবস্থান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝেও। নির্বাচন সামনে রেখা বিএনপিকে মাঠছাড়া করার চেষ্টা চলছে—এমন দাবিকে কেউ কেউ যৌক্তিক মানছেন। অন্যদিকে নির্বাচনের বছরে বিরোধীদের ওপর মামলা-হামলার ঘটনা দেশীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ বলে বলে দাবি করেছেন কেউ কেউ।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীনেরা যদি সত্যিকারভাবেই বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে চায়, তাহলে তাদের কাছে সেই আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। কিন্তু পুরোনো মামলাগুলোকে যেভাবে সামনে আনা হচ্ছে, সেটা দেখে ধারণা করা যেতেই পারে যে, বিএনপিকে মাঠছাড়া করতে কাজ করছে সরকার।’


যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী মনে করেন, ‘যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ নাই, নির্বাচন এই সরকারের অধীনেই হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে—এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও সরকার বোঝাতে সক্ষম হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমার ধারণা, এই ব্যাপারটি বিএনপি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এটা বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে বিএনপি তাদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছে। এখন তারা অন্যভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।’


চার দিনের সফরে সুইজারল্যান্ড গিয়ে গত বৃহস্পতিবার সেখানে এক নাগরিক সংবর্ধনায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘নিজেদের অপকর্মের জন্য ভোট পাবে না জেনেই বিএনপি নির্বাচন থেকে পিছটান দিতে ছুঁতো খুঁজছে। কীভাবে পিছটান মারবে (নির্বাচন থেকে) সেই তালেই তারা আছে।’


জেনেভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি যেদিন এ মন্তব্য করছেন, সেদিনই ঢাকায় বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীদের নামে হওয়া পুরোনো মামলাগুলোকে সামনে আনা হচ্ছে, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চলছে। উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের আগে বিএনপিকে মাঠছাড়া করে দেওয়া। লক্ষ্য একটাই—আবারও বিনা ভোটে, কারচুপি করে যেনতেনভাবে ক্ষমতা দখল করা।’


দুই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতার এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর তাঁদের সমর্থনে বলে যাচ্ছেন দলের অন্য নেতারাও। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। সংবিধানসম্মতভাবে আগামী নির্বাচন এই সরকারের অধীনেই হবে।


তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার সুযোগ নেই। সেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে সরকার বদ্ধপরিকর। ভোটে জয়ী হওয়ার মতো সাংগঠনিক দক্ষতা না থাকায় বিএনপি নির্বাচনে আসতে ভয় পাচ্ছে। এ কারণে তারা নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া এবং নির্বাচন বানচালের জন্য নানা তৎপরতা চালাচ্ছে। বিএনপি এমন কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি যে, তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা হতে পারে। যেকোনো ধরনের আন্দোলন মোকাবিলার সক্ষমতাও আওয়ামী লীগের আছে।


বিএনপিকে মাঠছাড়া করতে সরকার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় সংসদের উপনেতা মতিয়া চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রত্যেক দিন কাগজে থাকতে হবে। তাই তারা (বিএনপি) এমন কথা বলছে। এটা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কে তাদের নিষেধ করছে নির্বাচন না করতে। কোনো ঝামেলা থাকলে তারা বলুক। কাউকে আসতে (নির্বাচনে) তো নিষেধ করা হয়নি।’


জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা মনে করি বিএনপিসহ যেসব দলের নির্বাচন করার সক্ষমতা আছে, তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিএনপি মুখে মুখে যাই বলুক না কেন, তাদের নেতারা ভেতরে-ভেতরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং আমরা মনে করি, তারা নির্বাচনে আসবে।’


বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থানের বিপরীতে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বিএনপি নয়, আসলে আওয়ামী লীগই যেনতেনভাবে একটা নির্বাচন করার ছুঁতো খুঁজছে। বিরাজমান পরিস্থিতিতে সরকার নানাভাবে বেকায়দায় আছে। দেশে-বিদেশে তাদের বিষয়ে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনকেও তারা ভয় পাচ্ছে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা আসার পরে সম্প্রতি মার্কিন ভিসা নীতির ঘোষণায় সরকার অনেকটাই বেসামাল হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কোনো দিক থেকে সুবিধা করতে না পেরে তারা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছে। বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো সরকার ভোট চুরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। তারা যদি বিএনপিকে নির্বাচনে আনার বিষয়ে আন্তরিকই হতো, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো দূর করার চেষ্টা করত। সেটা না করে সরকারের মন্ত্রীরা একেক সময় একেক কথা বলে একটা ধোঁয়াশা তৈরির চেষ্টা করছেন। জেনেভায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যেও তারই প্রতিফলন ঘটেছে।


বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য খন্দকার মোশাররফ গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘এখন সরকার বেসামাল হয়ে পড়েছে। বিভিন্নজন বিভিন্ন রকমের কথা বলে। কেন বলছেন? আসলে বাংলাদেশে জনগণের আন্দোলনের মুখে এই সরকার কিন্তু বিচলিত। আজকে তারা ভয়ে ভীত এবং কম্পমান। এগুলো বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তাদের কথাবার্তার মধ্যেই।’


প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘সত্যের অপলাপ’ আখ্যা দিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিএনপি একটা ভালো নির্বাচনে যেতে চায়। আর আওয়ামী লীগ চায় ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো যেনতেন একটা নির্বাচন। কিন্তু তেমন নির্বাচনে বিএনপি আর যেতে চায় না।


  • সম্পাদক ও প্রকাশক: ইঞ্জিনিয়ার মো: রায়হানুল ইসলাম

  • উপদেষ্টাঃ মোঃ ইব্রাহীম হায়দার