২৪ মে ২০২৬, রবিবার, ১২:২৪:০১ অপরাহ্ন
জলরাশির জনপদে জীবিকার অনিশ্চয়তা
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৫-২০২৬
জলরাশির জনপদে জীবিকার অনিশ্চয়তা

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরী উপজেলায় বর্ষার পানি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। নিচু এলাকার রাস্তাঘাট ও গ্রামীণ সংযোগ সড়কের অংশ ইতোমধ্যে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের ধারণা, বর্ষার স্বাভাবিক নিয়মে অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে পানি থৈ থৈ অবস্থার সৃষ্টি হবে।


তবে হাওরের মানুষের কাছে এবার বর্ষা শুধু প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ নয়, বরং জীবিকা ও টিকে থাকার নতুন দুশ্চিন্তার নাম। কারণ একদিকে বোরো ফসলের বড় ক্ষতি, অন্যদিকে কমে যাওয়া দেশীয় মাছ সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো।


এক সময় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লে হাওরের মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। নানা প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যে পরিচিত ছিল খালিয়াজুরীর হাওর।


কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, জলাশয় শুকিয়ে ফেলা, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ শিকার ও পোনা মাছ নিধনের কারণে হাওরের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে।


খালিয়াজুরী উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুকনো মৌসুমে এ উপজেলার জলাভূমির আয়তন প্রায় ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর হলেও বর্ষা মৌসুমে তা বেড়ে হয়ে যায় প্রায় ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টর। চলতি অর্থ বছরের পরিসংখ্যান তৈরি না হলেও বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় উৎপাদিত মাছ ও শুটকির পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৭৪৯ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭৩ মেট্রিক টন। এতে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।


এছাড়া হাওরাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত। শুধুমাত্র বোরো ফসলের বাইরে নির্ভরযোগ্য আয়ের ক্ষেত্র না থাকায় বর্ষা মৌসুমে অনেক পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।


স্থানীয়রা জানান, এবার অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তারা বলছেন, , প্রায় ৮০ শতাংশ ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। উপজেলার ২৫ হাজার ২২২ কৃষক পরিবারের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার হলো প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার। তবে সরকারি সহায়তা পাবেন ৭ হাজার ৮৩১ পরিবার।


খালিয়াজুরীর লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা ফুলু মিয়া বলেন, “আগে বর্ষায় পানি আসলে আনন্দ হতো, এখন ভয় লাগে। মাছও নাই, কাজও নাই—সংসার কেমনে চলবো বুঝতেছি না।”


কৃষক জাকির হোসেন বলেন, “এবার যে ক্ষতি হইছে, আমাদের জীবনে বড় ধাক্কা। একমাত্র বোরো ফসলই ছিল ভরসা, সেটাও ডুবে গেছে।”


নয়াপাড়া গ্রামের প্রবীণ জেলে পতাকী বর্মণ বলেন, “১০ বছর আগেও দিনে ১০-১৫ কেজি মাছ ধরতাম। অহন ২-৩ কেজির বেশি পাই না। অনেকে বিষ ছিটাইয়া মাছ ধরে—এতে মাছ যেমন মরতাছে, তেমন হাওরের প্রাণও শেষ হইয়া যাইতাছে।”


একই গ্রামের জেলে হীরন বর্মণ, জয়কিশোর বর্মণ ও পানু বর্মণের ভাষ্য, আগের মতো মাছ না পাওয়ায় এখন মাছ ধরে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।


খালিয়াজুরী বাজারের পুরনো মৎস্য আড়ৎদার আক্তার হোসেন তালুকদার বলেন, “আগে প্রতিদিন আড়তে কয়েক মণ দেশীয় মাছ আসতো। এখন মোট মাছ মণখানেকের বেশি হয় না। বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ না হলে হাওরের মাছ টিকবে না।”


স্থানীয় সাংবাদিক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, “নিষিদ্ধ উপায়ে মাছ ধরা হলেও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। সচেতনতা বাড়াতেও তেমন উদ্যোগ নেই।”


আরেক সাংবাদিক সোহান-বিন-নবাব বলেন, “জলাশয়গুলো ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। সরকার জলমহাল থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও খনন বা রক্ষণাবেক্ষণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।”


উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, খালিয়াজুরীতে ২০ একরের বেশি ৩৮টি এবং ২০ একরের নিচে ৩৩টি ইজারাযোগ্য সরকারি জলমহাল রয়েছে। গত অর্থবছরে ৪৭টি জলমহাল ইজারা দিয়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে।


উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও সম্প্রসারণে উপজেলার মরা ধনু, নামাবাজজুয়াইল, সিন্ধুকের বাগ, বাদিয়ারচর ও টানচুনাই—এই পাঁচটি জলাশয়কে অভয়াশ্রম ঘোষণার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অভয়াশ্রম ঘোষণা হলে ২৫ দশমিক ৫ হেক্টর এলাকায় মাছের


শেয়ার করুন