১৭ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, ০৩:১৮:২৪ অপরাহ্ন
‘সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, অনলাইন জুয়া বন্ধ করুন’
স্টাফ রিপোর্টার :
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৭-০৭-২০২৬
‘সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, অনলাইন জুয়া বন্ধ করুন’

একটি স্মার্টফোন ও কয়েকটি ক্লিক। শুরুতে সামান্য লাভ, এরপর আরও বেশি জেতার আশায় বাড়তে থাকে বিনিয়োগ। কিন্তু একসময় সব হারিয়ে ঋণের বোঝা, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক অবসাদে শেষ পর্যন্ত কারও কারও জীবনেরও ইতি। ঠাকুরগাঁওয়ে নীরবে বিস্তার ঘটছে অনলাইন জুয়ার জাল।

শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন অনলাইন বেটিং অ্যাপ ও ক্যাসিনো। সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় তরুণ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই ফাঁদে। গত দুই বছরে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্বজনদের বুকফাটা কান্না, স্ত্রীর অসহায়ত্ব আর কবরের পাশে মায়ের আহাজারি যেন জানিয়ে দিচ্ছে, এটি আর কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, ধীরে ধীরে একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। এই মৃত্যুর তালিকায় সর্বশেষ নাম ২০ বছর বয়সী নাহিদ রানার। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পশ্চিম বেগুনবাড়ি ভূজারীপাড়া গ্রামের এই তরুণ ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে অনলাইন জুয়ায় কয়েকবার টাকা জেতেন নাহিদ। সেই সাফল্যই তাকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল অর্থ হারান। ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও পরিবারের কাউকে নিজের কষ্ট বুঝতে দেননি। অবশেষে হতাশা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দুই মাস আগে গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।

ছেলের মৃত্যুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই কবরের পাশে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নাজি। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, আমার ছেলেকে অনলাইন জুয়াই কেড়ে নিয়েছে। টাকা হারিয়ে ও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি, ও এত বড় বিপদে ছিল। সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, এই অনলাইন জুয়া বন্ধ করুন। আমার ছেলের মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়।

নাহিদের স্বজন খুশি মনি বলেন, নাহিদের এক বছরের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী খুব সুখেই সংসার করছিল। কিন্তু অনলাইন জুয়া সেই সুখের সংসার শেষ করে দিয়েছে। এখন শিশুসন্তানকে নিয়ে তার স্ত্রী বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। একটি পরিবারের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।

আরেক স্বজন মুন্না হাসান বলেন, শুরুতে কয়েকবার টাকা জেতার পর নাহিদ ভাবছিল আরও বেশি টাকা আয় করবে। এরপর টাকা হারতে হারতে একসময় সে কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলত না। শুধু নাহিদ নয়, এলাকায় আরও অনেকেই অনলাইন জুয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।


জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়া আইনে দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ জুয়ার সাতটি মামলায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সদর উপজেলার হরিহরপুর নয়াপাড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৩০) অনলাইন বেটিং সাইটে অর্থ হারানোর পর আত্মহত্যা করেন বলে তার পরিবারের দাবি। এর আগে গত জানুয়ারিতে পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম (৫০) বসতবাড়ি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। পরে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে স্বজনরা জানান।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী এবং ২০২৪ সালের মে মাসে একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজুও অনলাইন জুয়ার কারণে নিঃস্ব হয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে পরিবারের দাবি।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে পরিবারগুলো মাদক নিয়ে যতটা চিন্তিত ছিল, এখন তার চেয়েও বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে অনলাইন জুয়া। কারণ, এই নেশা ঘরের ভেতরেই একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, কখন তাদের সন্তান বা স্বজন ভয়ংকর এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ওয়াহিদ হোসেন বলেন, আজ অন্যের সন্তান মারা যাচ্ছে, কাল হয়তো আমার সন্তানও একই পথে যাবে। সরকার যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পুরো যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

আরেক বাসিন্দা সোহাগ আলী বলেন, অনলাইন জুয়া একজন মানুষকে নয়, একটি পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই ভয়াবহ ব্যাধির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারের কঠোর অভিযান প্রয়োজন।

জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণদের হাতেও পৌঁছে গেছে বিভিন্ন অনলাইন বেটিং অ্যাপ। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের গোপন গ্রুপের মাধ্যমে স্থানীয় এজেন্টরা নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করছেন। শুরুতে অল্প টাকায় খেলিয়ে কয়েকবার জিতিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়।

এরপর বড় অঙ্কের বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় অনেকে ধার-দেনা, ঋণ এমনকি জমি-সম্পত্তি বিক্রি করেও খেলতে থাকেন। একপর্যায়ে ঋণের বোঝা, পারিবারিক কলহ, মানসিক অবসাদ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, সারা দেশেই অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ, নগদ, রকেট, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং বিদেশভিত্তিক পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে এই অর্থ হাতবদল হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় এজেন্টরা খেলোয়াড়দের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে মূল নেটওয়ার্কে পাঠিয়ে দেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিবারকে সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। সবাই একসঙ্গে এগিয়ে এলে এই অনলাইন জুয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।


শেয়ার করুন