ভারতের দিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। ভারত সরকারের পূর্বের আশ্বাস সত্ত্বেও এই ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ এটিকে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমানের আখ্যা দিয়েছে। একইসঙ্গে এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে বলা কোনো বক্তব্য সমর্থন করে না। এতে দুই দেশের মধ্যে আস্থা সংকট তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়টি।
গত পাঁচই অগাস্টের ওই সংবাদ সম্মেলনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি-না, সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়ে যেতে পারে কি-না- এসব প্রশ্ন এখন উঠছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।এমতাবস্থায় বিএনপি নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-দিল্লি, দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়।
তবে এরইমধ্যে গত ৫ আগস্ট ভারতে আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনার নয়া দিল্লিতে গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা ভিন্ন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
জানা যায়, গত ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) এই সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করেছিল।
এদিকে এ ঘটনাটিকে ঘিরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ঢাকা। শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে কথা বলার দিনেই রাতে কড়া ভাষায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার।
দুই দেশের সম্পর্কউন্নয়নের চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। এরপরেও ভারতের মাটিতে এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় গভীর হতাশা প্রকাশ করছে ঢাকা।
নয়া দিল্লিতে সেই সংবাদ সম্মেলনের একদিন আগেই শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করতে না পারে, সে বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে দেশটির সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশের সরকার।
এরপরও যখন শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি কথা বলেছেন, তাতে বাংলাদেশ সরকার যেমন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, একইসঙ্গে সরকারে থাকা বিএনপি নেতাদেরও অনেকে ভারত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন।
বিএনপির নেতারা জানান, তাদের সরকার আসলে ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি ও কর্মকাণ্ড বন্ধ চায়।
এ প্রসঙ্গে এক প্রেসব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়া যদি দেশটি এখনই বন্ধ না করে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সেটি উদ্বেগ তৈরি করে।
জানা যায়, দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও সাংবাদিকরা প্রশ্ন তুলেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে। জবাবে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ বসতে চায়। তবে ভারতকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে, এই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন সাবেক কূটনীতিকেরা।
নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের এই ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা ছিল, সেটি আর অনুকূল ভূমিকা পালন করছে না বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে?
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তিনি দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নেওয়াকে ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়। বিভিন্ন সময়ে শেখ হাসিনাকে প্রত্যপর্ণের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে অনুরোধও জানানো হয়।
জুলাইয়ের আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বা ফেরাতে ভারত সরকারকে 'নোট ভারবাল' পাঠিয়ে সেসময়ও অনুরোধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেময় ইতিবাচক কোনো জবাব দেয়নি ভারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক একেবারেই তলানীতে গিয়ে ঠেকেছিল বলে সেসময় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছিলেন।
তবে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির রাজনৈতিক সরকারের শুরুতেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়।
এর আগে, গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লী সফর করেছিলেন।
তবে ভারতে থাকা শেখ হাসিনার বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়াসহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখা এবং তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময় দিল্লিকে অনুরোধ জানানো হয় বলে জানান ঢাকায় কর্মকর্তারা।
কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে বার বারই বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশের অনুরোধ খতিয়ে দেখছে তারা।
এরইমধ্যে নয়া দিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে সরাসরি কথা বলার ঘটনা এখন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বড় ইস্যু হয়েছে।
এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের সমর্থন ছিল অভিযোগ করে বাংলাদেশ সরকার বলছে, ঘটনাটি দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় বাধা তৈরি করছে, এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

