২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১০:৩৪:৪৩ অপরাহ্ন
রাজশাহীর পবায় প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক ও দুঃস্থদের সহায়তা বিতরণ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৫-০৬-২০২৬
রাজশাহীর পবায় প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক ও দুঃস্থদের সহায়তা বিতরণ

রাজশাহীর পবা উপজেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ভিক্ষুক পুনর্বাসন, দুঃস্থ পরিবার ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসব সহায়তা দেওয়া হয়। 


অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন।  সকাল থেকেই উপজেলা পরিষদ চত্বর ও অনুষ্ঠানস্থলে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সুবিধাভোগীরা আসতে থাকেন। কেউ এসেছিলেন চলাচলের সহায়তা হিসেবে হুইল চেয়ার নিতে, কেউ ঘর মেরামতের জন্য টিন ও নগদ অর্থের আশায়, আবার কেউ এসেছিলেন ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে নতুন জীবিকার স্বপ্ন নিয়ে। সহায়তা হাতে পেয়ে অনেকের চোখে ছিল আনন্দের অশ্রু, মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। অনুষ্ঠানে পবা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে হুইল চেয়ার দেওয়া হয়। ভিক্ষুক পুনর্বাসন সহায়তার আওতায় ২৫ জনকে পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৪২ জন দুঃস্থ ব্যক্তি ও ১০ জন দরিদ্র শিক্ষার্থীর মধ্যে মোট ৭৮ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ১০ জন সুবিধাভোগীকে দুই বান্ডিল করে ঢেউটিন ও নগদ ছয় হাজার টাকা দেওয়া হয়। নগদ অর্থ পেয়ে হড়গ্রাম ইউনিয়নের দরিদ্র শিক্ষার্থী ইয়ামিন আসলাম সানি বলেন, “আমার পড়াশোনার খরচ চালাতে পরিবারকে অনেক কষ্ট করতে হয়। আজকের এই সহায়তা আমার পড়াশোনার পথে নতুন সাহস জোগাবে। আমি ভালোভাবে পড়াশোনা করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চাই।” পবা উপজেলার নওহাটা পৌর এলাকার কাদো বেওয়া টিন ও নগদ অর্থ পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “বৃষ্টির সময় ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত, অনেক কষ্টে দিন কাটত। আজ টিন ও টাকা পেয়ে মনে হচ্ছে, এবার মাথার ওপর একটু ভালো ছাউনি দিতে পারব। এই সহায়তা আমার মতো অসহায় মানুষের জন্য অনেক বড় পাওয়া।”


ভিক্ষুক পুনর্বাসন সহায়তা পাওয়া নওহাটা পৌর এলাকার জমেলা বলেন, “আমি আর ভিক্ষা করতে চাই না। একটি ছাগল, নগদ অর্থ ও ছাগল পালনের উপকরণ পেয়ে নতুন করে বাঁচার আশা পেলাম। এই ছাগল পালন করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। ভিক্ষুক পুনর্বাসন সহায়তার অংশ হিসেবে সুবিধাভোগীদের একটি করে ছাগল এবং নগদ অর্থের পাশাপাশি ছাগল পালনের উপকরণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল ঔষধ, মাল্টিভিটামিন পাউডার, প্লাস্টিকের গামলা, বেলচা, ঝাড়ু, ১৫ বর্গফুট ত্রিপাল ও ১ কেজি ভূষি। আয়োজকেরা জানান, এসব সহায়তা শুধু তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নয়, বরং সুবিধাভোগীদের স্বনির্ভর করে তোলার একটি উদ্যোগ।


প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “সরকার সবসময় অসহায়, দুঃস্থ, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশে রয়েছে। মানবিক সহায়তার মূল উদ্দেশ্য শুধু অনুদান দেওয়া নয়, বরং সুবিধাভোগীদের আত্মনির্ভরশীল করে সম্মানজনক জীবনের পথে এগিয়ে নেওয়া। যারা আজ হুইল চেয়ার, টিন, নগদ অর্থ ও পুনর্বাসন সহায়তা পেয়েছেন, তাঁরা যেন এসব সহায়তা সঠিকভাবে কাজে লাগান।”


জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে এনে কর্মমুখী জীবনে যুক্ত করা সম্ভব। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে পবা উপজেলার অসহায় মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে।” উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, “পবা উপজেলার অসহায়, দুঃস্থ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রশাসন আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আজকের এই সহায়তা শুধু সাময়িক অনুদান নয়, বরং সুবিধাভোগীদের স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি মানবিক উদ্যোগ। সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় এবং তাঁরা যেন তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন নজর রাখবে।”


দিনের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে দুপুর ১২টায় জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম পবা উপজেলা ভূমি অফিস পরিদর্শন করেন। বেলা সাড়ে ১২টায় উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন করেন তিনি। এতে উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাব সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটররা অংশ নেন। দুপুর ২টায় জেলা প্রশাসক পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বৈরাগীর খাল পুনঃখনন কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন।  দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে বিকেল ৩টায় উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলার উন্নয়ন, জনসেবা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নাগরিক সমস্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, পবা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন খান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল ইসলামসহ উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন