টানা মুষলধারে বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। এমন পরিস্থিতিতে বুধবারের (৮ জুলাই) এইচএসসি ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা ঘিরে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই পরীক্ষার্থী ৭০ হাজার ৯৭৪ জন। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর নিরাপদে ও সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়েই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের তথ্য পাওয়া গেছে।
অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে চকবাজার, কাতালগঞ্জ, শোলকবহর, রহমতগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, জিইসি মোড়, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, কুসুমবাগ, ইপিজেড, হালিশহর, রামপুর, বাকলিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক ও রেললাইন ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
মুরাদপুর, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও চকবাজারের মতো নিচু এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকায় যানবাহনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রিকশা ও অটোরিকশা পাওয়া গেলেও কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এতে পরীক্ষার্থীদের নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী রাতভর মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়েছেন।
চট্টগ্রামের বাংলাদেশ মহিলা সমিতি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হাসবুন নাহার বলেন, ‘আমাদের বাসার চারপাশে এক কোমর পানি। গত রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করছি। আমার পরীক্ষার কেন্দ্র সিএমপি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পানি পেরিয়ে কীভাবে পরীক্ষা দিতে যাব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।’
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজে চলমান ক্লাস ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ের এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা শাখার সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেসব তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলেও শুধু একটি বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করার সুযোগ নেই। পরীক্ষা স্থগিত বা পেছানোর সিদ্ধান্ত হলে সেটি সারাদেশের জন্যই কার্যকর হবে। বোর্ড এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।’
এদিকে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রায় এক লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণ কীভাবে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিভাবকদের দাবি, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে দ্রুত বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
রেকর্ড বৃষ্টিতে যখন চট্টগ্রাম কার্যত পানিবন্দি, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রায় এক লাখ এইচএসসি পরীক্ষার্থী কি নিরাপদে ও সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

