১৩ জানুয়ারী ২০২৬, মঙ্গলবার, ০৯:৫৩:৩৬ অপরাহ্ন
ট্রাম্পের উৎখাতের হুমকির মুখেও অনড় খামেনি, বললেন ‘পিছু হটব না’
স্টাফ রিপোর্টার :
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৯-০১-২০২৬
ট্রাম্পের উৎখাতের হুমকির মুখেও অনড় খামেনি, বললেন ‘পিছু হটব না’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, চলমান বিক্ষোভের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান পিছু হটবে না। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভের মধ্যেই নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার দেশটির ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সরকারি ভবন ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’, ‘খামেনির মৃত্যু চাই’সহ নানা স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। বৃহস্পতিবার রাতভর তেহরানসহ বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন।

ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানায়, বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানজুড়ে পুরোপুরি ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটি টানা অন্তত ১২ ঘণ্টা অফলাইনে ছিল।

চলমান এই বিক্ষোভকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সাড়ে চার দশকের ইতিহাসে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যেই ধর্মতান্ত্রিক শাসনের অবসান দাবি করছেন।

গত ৩ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ নিয়ে এই প্রথম প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে খামেনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে বিক্ষোভকারীদের ‘ধ্বংসকারী’ ও ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, শত সহস্র মানুষের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নাশকতাকারীদের সামনে তারা কখনো পিছু হটবে না।

ভাষণে খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, তার হাত ‘এক হাজারের বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত’। তিনি অভিযোগ করেন, জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছে এবং সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছে। খামেনি বলেন, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ক্ষমতাচ্যুত ইরানের সাম্রাজ্যবাদী রাজবংশের মতোই ‘অহংকারী মার্কিন নেতারাও’ একদিন উৎখাত হবেন।

সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, তেহরানে একটি ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি করার জন্য। এ সময় সভাস্থলে উপস্থিত অনেকে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান দেন।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাতে ‘অবিশ্বাস্য উদ্দীপনা’ দেখা যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তেহরানের আয়াতুল্লাহ কাশানি বুলেভার্ডে বিপুল জনসমাগম হয়। বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে গাড়ির হর্ন বাজাতে শোনা যায় এবং ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’ স্লোগানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ৮৬ বছর বয়সী খামেনিকে লক্ষ্য করেই এসব স্লোগান দেওয়া হয়।

এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের তাবরিজ, পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদ, পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত কেরমানশাহ এবং কেন্দ্রীয় শহর ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভের ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। ইসফাহানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রবেশপথে আগুন দেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। তবে এসব ভিডিওর সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি।

অন্য এক ভিডিওতে ইরানের মধ্যাঞ্চলের মারকাজি প্রদেশের রাজধানী শাজান্দে শহরে গভর্নরের ভবনে অগ্নিসংযোগের দৃশ্য দেখা গেছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, ২০২২–২৩ সালে দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন। সে সময় কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, চলমান বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। তবে সর্বশেষ কিছু ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি দমনপীড়নের দৃশ্য দেখা যায়নি।

এদিকে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে উৎখাত হওয়া ইরানের শেষ শাহর ছেলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রেজা পাহলভি বৃহস্পতিবার বড় বিক্ষোভের আহ্বান জানান। শুক্রবার নতুন এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের সমাবেশ প্রমাণ করেছে—বৃহৎ জনসমাগম দমনকারী শক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে। তিনি আরও বড় আন্দোলনের ডাক দিয়ে বলেন, জনসমাগম যত বাড়বে, শাসকদের দমনক্ষমতা তত দুর্বল হবে।

শেয়ার করুন