০৮ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০২:১০:১২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
এলএনজিতে বাড়ছে ব্যয়, কাটছে না গ্যাস-সংকট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৭-১০-২০২৬
এলএনজিতে বাড়ছে ব্যয়, কাটছে না গ্যাস-সংকট

গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বাড়ছে ভর্তুকির চাপ। কিন্তু ব্যয় বাড়লেও শিল্পকারখানায় বা বাসাবাড়িতে প্রয়োজনীয় গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না। কোথাও সরবরাহ কম, কোথাও চাপ এত কম যে দরকারের সময় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া বা রান্নার চুলা জ্বালিয়ে রাখা কঠিন। ফলে সরকারকে জ্বালানি কিনতে বাড়তি অর্থ জোগাতে হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের গুনতে হচ্ছে উৎপাদন কমে যাওয়ার মাশুল। বাসাবাড়িতে শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি।


এই সংকটের মধ্যে চড়া দামের খোলা বাজারে (স্পট মার্কেটে) কেনাকাটা কমিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি কেনার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। এতে খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সরবরাহে বাধা, ভাসমান টার্মিনালের সমস্যা এবং জরুরি মজুতের ঘাটতি আমদানিনির্ভর গ্যাসব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন না বাড়ালে শুধু আমদানি দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।


তিন মাসেই শেষ এক বছরের ভর্তুকি


পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এলএনজিতে ভর্তুকির বরাদ্দ ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে—জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ কার্গো এলএনজি কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসের এ এলএনজি কিনতেই অর্থবছরের ভর্তুকির প্রায় সমপরিমাণ টাকা খরচ হয়ে গেছে।


গত অর্থবছরে এ খাতে ভর্তুকি ছিল ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের ভর্তুকি আগের পুরো বছরের প্রায় ৭১ শতাংশ। একই হারে ব্যয় চললে বছরে ভর্তুকির প্রয়োজন ৪১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক দাম, আমদানির পরিমাণ ও চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ বদলালে বছরের মোট হিসাবও বদলাবে। চলতি অর্থবছরের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের প্রয়োজন জানিয়ে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংশোধিত বাজেটের আগে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ নেই বলে অর্থ বিভাগ জানিয়ে দিয়েছে বলে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান। তিনি বলেন, বছরের বাকি সময়ে আমদানির আর্থিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।


আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে এলএনজির দাম। বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হলে অতিরিক্ত দাম বাড়ে এ জ্বালানির। এছাড়া শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও দাম বাড়ে। যার চাপ পড়ে দেশের অর্থনীতির ওপর। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১০ কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪১ কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।


দাম বাড়লেও সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই


তাত্ক্ষণিক বা দ্রুত চাহিদা মেটাতে এলএনজি কেনার স্পট মার্কেটে দাম দ্রুত ওঠানামা করে। যুদ্ধ বা সরবরাহে বাধা দেখা দিলে আমদানিকারক দেশকে বেশি দাম দিতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে আগে বাংলাদেশ এই বাজার থেকে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউ এলএনজি প্রায় ১০ থেকে ১২ মার্কিন ডলারে কিনত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ দাম প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ডলারে উঠেছে।


চলতি অক্টোবরের জন্য কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দাম প্রায় ২৭ থেকে ২৯ মার্কিন ডলার পড়েছে। একই সময়ে কিছু স্বল্পমেয়াদি ও চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে কেনা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ২৫ দশমিক ২৬ থেকে ২৫ দশমিক ৩৫ ডলার খরচ হয়েছে। স্পটের চেয়ে চুক্তিভিত্তিক কেনাকাটায় খরচ কম। তবে ক্রয়ের সময়, সরবরাহের শর্ত ও দামের সূত্র ভিন্ন হওয়ায় সব কার্গোর জন্য একইরকম সাশ্রয় ধরে নেওয়া যায় না। কম দামের নির্ধারিত সরবরাহ ব্যাহত হলে বিকল্প উত্স থেকে বেশি দামে কিনতে হয়। আবার কার্গো এলেও টার্মিনালে কারিগরি বা পরিবেশগত সমস্যা হলে সেই জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানো যায় না। ফলে বেশি অর্থ ব্যয় করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।


স্পট থেকে ক্রয় কমানোর উদ্যোগ


পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পেট্রোবাংলা। এটি করা গেলে দেশের অনেক অর্থ সাশ্রয় হবে। এজন্য বিশ্বব্যাপী অপেক্ষাকৃত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু বড় কোনো সরবরাহকারী প্রতিশ্রুত কার্গো দিতে না পারলে আবার চড়া দামের স্পট মার্কেটে কেনাকাটা বাড়াতে হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে বর্তমানে এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকলেও আগামী বছরের শুরুতেই চুক্তির আওতায় আমদানি শুরু করা যাবে বলে আশাবাদী জ্বালানি বিভাগ।


তবে স্পট বাজারে কেনাকাটা কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন এলএনজি সরবরাহকারী তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াও চালু রেখেছে পেট্রোবাংলা। গত ২৯ আগস্ট সম্ভাব্য সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদনের শেষ সময় প্রথমে ১৫ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ২২ সেপ্টেম্বর, ৬ অক্টোবর এবং সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারীকে অন্তত একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং ন্যূনতম ৫ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। একক প্রতিষ্ঠান বা যৌথ উদ্যোগ আবেদন করতে পারবে। আগে থেকে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না।


কারখানায় উৎপাদন কমছে


বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-এর একাধিক ব্যাবসায়িক নেতা জানিয়েছেন, আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি সংকটের মূল্য দিচ্ছে দেশের শিল্প খাত। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতিতে পোশাক খাতের উৎপাদন একপর্যায়ে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। কারখানাগুলোকে উৎপাদন পরিকল্পনা বারবার বদলাতে হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে রপ্তানির পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া কোনো কোনো নিটওয়্যার কারখানায় উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অনেক কারখানায় কয়েক ধাপে কাজ করতে হচ্ছে। এতে সময় বাড়ছে, খরচও বাড়ছে। এই তথ্য নির্দিষ্ট কারখানার পরিস্থিতির বর্ণনা; পুরো শিল্প খাতের উৎপাদন একই হারে কমেছে—এমন হিসাব নয়।


দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। স্থানীয় উৎপাদনে বড় সমস্যা বা এলএনজি আমদানিতে বাধা তৈরি হলে এ সরবরাহ ২২৫-২৩০ কোটি ঘনফুটেও নেমে আসছে।


গ্যাস না পেলে কিছু কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে। আবার উৎপাদন কমলেও কারখানার অনেক স্থায়ী খরচ থেকে যায়। কম পণ্যের ওপর সেই খরচ ভাগ হওয়ায় প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে রপ্তানির প্রতিযোগিতা, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। খুচরা দাম একই রেখে স্থানীয় পণ্যের সাইজ ও পরিমাণ কমিয়ে বাজার চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে অনেক কোম্পানি।


শেয়ার করুন