২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় সংসদে। শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপির নাম ও তাদের ঋণের পরিমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
সোমবার (৬ এপ্রিল) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে কুমিল্লা-৪ আবুল হাসনাত এর লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান। অর্থমন্ত্রীর প্রকাশিত শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান হলো-
১। এস. আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড ২। এস. আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড ৩। সালাম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ৪। এস. আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড ৫। সোনালী ট্রেডার্স ৬। বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ৭। গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড ৮। কেমন ইস্পাত লিমিটেড ৯। এস. আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড ১০। ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১১। কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড ১২। দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড ১৩। পাওয়ার প্যাক মুতিারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড ১৪। পাওয়ার প্যাক মুতিারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড ১৫। প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড ১৬। কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড ১৭। মুরাদ এন্টারপ্রাইজ ১৮। সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ১৯। বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স লিমিটেড ২০। রংধনু বিল্ডার্স (প্রা.) লিমিটেড
খেলাপী ঋণ আদায়ে সরকার নানাবিধ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে
১। ১০% এর অধিক শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকসমূহের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা এবং শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে প্রতিবন্ধকতা খুঁজে বের করে তা সমাধানের জন্য ব্যাংক থেকে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
২। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আয়োজিত প্রতিটি ব্যাংকার্স সভায় ব্যাংক ভিত্তিক শীর্ষ ২০ ঋণ খেলাপী/শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের অগ্রগতি যাচাই।
৩। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক শ্রেণিকৃত ঋণের হার অধিক এরূপ ব্যাংকসমূহের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন।
৪। ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধিত) আইনে সংজ্ঞায়িত ইচ্ছাকৃত খেলাপীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৬; তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৪ এর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপী শনাক্তকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে গৃহীতব্য ব্যবস্থাদি সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
৫। বিআরপিডি সাকুলার নং-১৪/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকের বিদ্যমান লিগ্যাল টিম/আইন বিভাগ শক্তিশালীকরণের জন্য ব্যাংকসমূহকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
৬। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি অনুসরণের মাধ্যমে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের খেলাপী ঋণস্থিতির ন্যূনতম ১% নগদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার জন্য বিআরপিডি সাকুলার নং-১১/২০২৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকসমূহকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
৭। ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদকরণ।
৮। IFRS 9 অনুযায়ী Expected Credit Loss ভিত্তিক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনার সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং ঋণ ঝুঁকি প্রশমন; বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত মূল্যায়ন করার জন্য উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে তালিকাভুক্তিকরণ।
অর্থমন্ত্রী জানান, এসব ছাড়াও খেলাপী ঋণ সমস্যা সমাধানে নিম্নোক্ত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে;
১। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক খেলাপী ঋণ সমস্যা সমাধানে এতদসংশ্লিষ্ট বিদ্যমান আইনসমূহ (ব্যাংক কোম্পানি আইন, Negotiable Instrument Act, অর্থ ঋণ আদালত আইন, Bankruptcy Act) সংশোধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
২। স্বল্প মেয়াদী কৃষি ঋণের পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা পর্যালোচনাপূর্বক হালনাগাদকরণ।
৩। খেলাপী ও ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ।
৪। দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন অর্থাৎ ভালো ঋণগ্রহীতাদেরকে চিহ্নিতকরত তাদেরকে প্রণোদনা প্রদান সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা পর্যালোচনাপূর্বক হালনাগাদ করা।
৫। একজন ঋণ গ্রহীতা কর্তৃক সমগ্র ব্যাংকিং খাত হতে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ।
৬। ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাসমূহের কিছু কিছু খেলাপী ঋণ গ্রহীতাদের জন্যেও আরোপের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ।

