৩০ মে ২০২৬, শনিবার, ১২:০৮:২৩ পূর্বাহ্ন
শতভাগ সক্রিয় প্রধানমন্ত্রী, বর্জ্য অপসারণে কতটা সফল দুই সিটি করপোরেশন?
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৫-২০২৬
শতভাগ সক্রিয় প্রধানমন্ত্রী, বর্জ্য অপসারণে কতটা সফল দুই সিটি করপোরেশন?

পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণ পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যা দেশের মানুষের কাছে একেবারেই নতুন দৃশ্য। স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীকে পুঙ্খানুপুঙ্খ নজরদারি করতে দেখে মুগ্ধ সাধারণ জনগণ। তবে পশুবর্জ্য অপসারণে কতটা সফল দুই সিটি করপোরেশন? এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।



কোরবানির পশুবর্জ্য ১২ ঘণ্টার মধ্যেই সরিয়ে ফেলার সরকারি ঘোষণা থাকলেও শুক্রবার (২৯ মে) রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কোরবানির বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে।



এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণের জন্য ৮ ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্ধারিত সময়ের আগেই এই পশুবর্জ্য অপসারণের কাজ শেষ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল।



তবে দুই সিটির বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কোনো স্থানে দেখা গেছে পশুবর্জ্যের স্তূপ আবার কোনো স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পশুর উচ্ছিষ্ট অংশ। এতে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় এসব বর্জ্য থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এ ছাড়া বেশ কিছু এলাকায় মাংস কাটার চাটাই, পশুর খাদ্য খড়-ভুসি, পশুর লেজ, খুর, আংশিক চামড়া, মাড়ি, শিং, ভুড়ির বর্জ্য ও খুলি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। আবার কোথাও কোথাও পশুর রক্ত জমে থাকতেও দেখা যায়।


বাস্তবে এমন চিত্র দেখা গেলেও বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাত ৯টায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালামের বক্তব্যে রয়েছে ভিন্নতা। তিনি দাবি করেন, কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।




তার ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৭১টি ওয়ার্ড শতভাগ বর্জ্যমুক্ত করা হয়েছে এবং বাকি চারটি ওয়ার্ড- ৮, ১১, ১৮ ও ৫৩ নম্বরে প্রায় ৯০ শতাংশ বর্জ্য অপসারণ সম্পন্ন হয়েছে।



তবে এই দক্ষিণ সিটির- ১৪, ২২, ২৭, ৩৫ ও ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডগুলোতেও পাওয়া গেছে কোরবানি বর্জ্য। যা আগের রাতেই শতভাগ বর্জ্যমুক্ত বলে দাবি করেছিলেন প্রশাসক।



এ বিষয়ে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান কালবেলাকে জানান, শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ডিএসসিসি এলাকার মোট ১৯ হাজার ৬৪১ টন বর্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে চূড়ান্ত ডাম্পিং করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল শুক্রবার রাত ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ডাম্পিং হয়েছে ৪ হাজার ৮২৭ টন বর্জ্য।



অন্যদিকে, ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন কালবেলাকে জানান, গত বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ১ হাজার ৮৮২টি ট্রিপে মোট ৮ হাজার ৭৬ টন বর্জ্য অপসারিত হয়েছে। শুক্রবার (২৯ মে) রাত ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৬টি ট্রিপে ৫ হাজার ৯১৩ টন বর্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ডাম্পিং করা হয়েছে।



এদিকে শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পশুর বর্জ্য অপসারণ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে পশুবর্জ্য ও পূর্বের জমে থাকা ময়লা রাস্তায় পড়ে থাকায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার (উপসচিব) বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন প্রধানমন্ত্রী। দুজনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করার নির্দেশ দেন তিনি।



শাস্তিপ্রাপ্ত আঞ্চলিক কর্মকর্তারা হলেন- ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (জোন-৫) আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান (উপ সচিব) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (জোন-১) আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির (উপসচিব)।



ওই এলাকাগুলোর স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, 'কোরবানির পশুবর্জ্য অপসারণে দুই সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন নিজে রাজধানীর বিভিন এলাকা পরিদর্শন শেষে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন তখন নিশ্চয় তাদের কাজে গাফলতি ছিল। প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাগ্রহণে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে আমরা সাধুবাদ জানায়।'



বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পশুবর্জ্য বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘ সময় কোরবানির পশুবর্জ্য পড়ে থাকলে সেখান থেকে দুর্গন্ধ, ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি বা জমে থাকা রক্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে পরিবেশ দূষণ তৈরি করতে পারে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার আশঙ্কাও বাড়ে।



তবে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় শুধু সিটি করপোরেশনের একার নয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবার সার্বিক সহযোগিতা ব্যতীত দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষে শতভাগ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত অসম্ভব হয়ে পরে। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণে কাজ করলেও নাগরিকদের অসচেতনতার কারণেও অনেক এলাকায় এসব বর্জ্য দেখা গেছে। তাই দায় শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, সাধারণ নাগরিকেরও।


শেয়ার করুন