ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে ঘিরে উদ্বেগে থাকা ইসরায়েলিদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। তাদের দাবি, নানা মতপার্থক্য থাকলেও ওয়াশিংটন-তেল আবিবের সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য মতবিরোধ সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারক তেহরানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত করবে।
এদিকে, জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা কৌশলের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোববার জেরুজালেমে এক পররাষ্ট্রনীতি সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা যে বেড়েছে, সেটি আমরা বুঝতে পারছি।’
ফক্স নিউজের রক্ষণশীল ভাষ্যকার ও ট্রাম্প-সমর্থক মার্ক লেভিনও ইরান চুক্তির সমালোচনা করলেও ট্রাম্পের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘ইরানি শাসনব্যবস্থার অবসান হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তবুও স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদিধর্মের প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন প্রশংসার দাবিদার।’
ইরান চুক্তির পাশাপাশি লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার জন্য ট্রাম্পের চাপ এবং নেতানিয়াহুর অবস্থানের প্রতি তার কঠোর ভাষাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘প্রতিবার কাউকে খুঁজতে গিয়ে পুরো একটি ভবন ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই।’ এমনকি লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের পরিবর্তে সিরিয়াকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও প্রকাশ্যে বিবেচনা করার কথা বলেন তিনি।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তুলনামূলক সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ট্রাম্পই বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল।’ তবে তিনি এও বলেন, ‘ইসরায়েলের সব ধরনের সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষ বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।’
রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকে এমন অবস্থান আসা ইসরায়েলের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে।
রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপক সিড রোজেনবার্গ ইসরায়েলিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ট্রাম্প নিয়ে যতই উদ্বিগ্ন থাকুন না কেন, তিনিই এখনও সবচেয়ে ভালো বিকল্প। আপনারা জেডি ভ্যান্সকেও পেতে পারতেন। তখন কী হতো, তা ভেবে দেখুন।’
মার্চে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৫৭ শতাংশ রিপাবলিকান ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, যা এক বছর আগে ছিল ৫০ শতাংশ।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিক ও প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, এমনকি ট্রাম্পের রক্ষণশীল সমর্থকদের মধ্যেও।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ভিক্টোরিয়া কোউটস বলেন, দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি হলেও তা আবারও স্বাভাবিক পথে ফিরে আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প ও ভ্যান্সের মন্তব্যকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন না ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তার ধারণা, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের মনোভাব বিবেচনায় রেখেই এসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
তবে ইসরায়েলের ভেতরে এখন এমন মতও জোরালো হচ্ছে যে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন নাও থাকতে পারে। সে কারণে নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে এবং নতুন কূটনৈতিক জোট গড়ে তুলতে হবে।

