০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, সোমবার, ০৮:০১:৩১ অপরাহ্ন
ভুয়া সংগঠনে কোটি কোটি টাকা মেরে বিদেশ পাড়ি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০৭-২০২৩
ভুয়া সংগঠনে কোটি কোটি টাকা মেরে বিদেশ পাড়ি

জালিয়াতি করে শেখ রাসেলের নামে ভুয়া শিশু সংগঠনের নিবন্ধন নিয়ে নিজেকে সেই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বানিয়ে পাতেন প্রতারণার জাল। চাকরি, বদলি, পদোন্নতি, তদবির, সংগঠনের কমিটি-বাণিজ্য এবং শিশুদের পুরস্কার দেওয়ার নামে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।


এমনকি শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদকে দেওয়া সরকারি জমি বিক্রির জন্য একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বায়না করে পকেটে পুরেছেন প্রায় ২ কোটি টাকা। তিনি মজিবুর রহমান হাওলাদার।


মামলার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বিদেশে পলাতক। তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরাও বিদেশে।


মজিবুর রহমান হাওলাদার ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক ছিলেন। শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন দপ্তর সম্পাদকও ছিলেন। এই সংগঠনের করা মামলার তদন্তেই তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি, প্রতারণার অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শেষে গত ১৮ জুন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে।


পিবিআইপ্রধান বনজ কুমার মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, তদন্তে মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে জাল, জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিকবার অভিযান চালানো হয়। তবে তিনি পলাতক রয়েছেন।


পিবিআই, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মজিবুর রহমান হাওলাদারের বিরুদ্ধে নিজেকে শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। এই পরিচয়েই তিনি প্রভাব খাটাতেন। তিনি কয়েকজন আমলার কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন। তিনি ভুয়া সংগঠনের জেলা, উপজেলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি-বাণিজ্য করেছেন।


শিশুদের পুরস্কার পাইয়ে দিতে তাঁর কাকরাইলের অফিসে রসিদ দিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁর অফিস এখন নেই।


জানা যায়, মজিবুর রহমান হাওলাদারের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার কাজিরহাটের আন্দারমান ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামে। বরিশালের পাতারহাট এমসি ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন।


১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে ঢাকায় আসেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক। লায়ন্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নামের আগে যুক্ত করেন লায়ন।


বিভিন্ন সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে মজিবুর রহমান প্রতারণা শুরু করেন। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত রকিবুর রহমান, মহাসচিব ছিলেন প্রয়াত সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কে এম শহীদুল্লা। ২০২১ সালে মাহমুদ উস সামাদ করোনায় মারা গেলে ওই বছরের ৮ মে শহীদুল্লাকে মহাসচিব করা হয়। শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুদানে চলে।


জালিয়াতি করে শেখ রাসেলের নামে সংগঠন সূত্র জানায়, সংগঠনকে ব্যবহার করে মজিবুরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তৎকালীন চেয়ারম্যান রকিবুর রহমান ও মহাসচিব মাহমুদ উস সামাদ তাঁকে কয়েকবার সতর্ক করেন।


তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কার্যকরী কমিটির সভাও ডাকেন। তাঁকে সরানোর বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি গোপনে সংগঠনের কাগজপত্র হাতান। কমিটির কয়েকজন নেতার সই জাল করে একটি ভুয়া মিটিং রেজল্যুশন ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করেন। নকল কাগজপত্রে মুজাহিদুর রহমান হেলো সরকার নামের একজনকে সভাপতি ও নিজেকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ‘শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদ’ নামের সংগঠনের নিবন্ধন নেন। অফিসের ঠিকানা কাকরাইলের পাইওনিয়ার সড়কের নির্মাণ সামাদ ট্রেড সেন্টার।


জালিয়াতি করে মজিবুরের একই নামে সংগঠনের নিবন্ধন নেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয় ২০২০ সালে। ওই বছরের ১৫ মার্চ তাঁকে সংগঠন থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর সমাজসেবা অধিদপ্তর মজিবুরের সংগঠনটির নিবন্ধন বাতিল করে। তবে তিনি গত বছর শেখ রাসেলের জন্মদিন পালন উপলক্ষে করা লিফলেটও নকল করে নিজেকে সাধারণ সম্পাদক প্রচার করেন।


যেভাবে ধরা পড়ল জালিয়াতি

শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের মহাসচিব কে এম শহীদুল্লা ২০২১ সালের ১০ আগস্ট ডিএমপি কমিশনারের কাছে মজিবুর রহমানের অপকর্মের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি কমিশনার বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন মতিঝিল বিভাগকে। পুলিশ তদন্ত করে মজিবুরের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ, জাল-জালিয়াতি করে জমি বিক্রির প্রমাণ পায়।এরপর গত বছরের ২৭ অক্টোবর রমনা থানায় মজিবুরের বিরুদ্ধে মামলা করেন সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক সজল মাহমুদ।


মামলায় অভিযোগ করা হয়, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের নামে সরকারের বরাদ্দ দেওয়া জমি নিজের বলে বিক্রির জন্য বায়না দলিল করেন মজিবুর রহমান হাওলাদার। সূত্র বলেছে, তিনি একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে বায়না বাবদ প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।


মামলার বাদী আজকের পত্রিকাকে বলেন, মজিবুর হাওলাদার ভুয়া সংগঠন করে কয়েক কোটি টাকা বাগিয়েছেন। চাকরি, পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির কথা বলেও লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন।


মামলাটি তদন্ত করে পিবিআই। ১৮ জুন মজিবুরকে একমাত্র আসামি করে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের নামে বরাদ্দকৃত জমির দলিল, সংগঠনের অন্যান্য কাগজপত্র চুরি ও জালিয়াতি করেন মজিবুর।


মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মাসুদ রানা আজকের পত্রিকাকে বলেন, মজিবুর রহমান ভুয়া সংগঠন করে চাঁদাবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, বদলি-বাণিজ্য করতেন। অনেকের কাছ থেকে তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। কয়েকজন আমলার কাছ থেকেও তিনি ৫ লাখ, ১০ লাখ টাকা করে নিয়েছেন। তবে তাঁরা সাক্ষী হতে চান না।


জানা যায়, এই মামলা হওয়ার পরের মাসে গত বছরের নভেম্বরে উচ্চ আদালত থেকে প্রথমে ছয় সপ্তাহের ও পরে আরও দুই সপ্তাহের আগাম জামিন নেন মজিবুর। পরে গত বছরই তিনি কানাডায় অধ্যয়নরত বড় ছেলের কাছে যান। সেখান থেকে দুবাই গেছেন। বর্তমানে দুবাইয়ে ব্যবসা করছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। তাঁর একমাত্র মেয়ে মাস তিনেক আগে পড়ালেখা শেষে যুক্তরাজ্যে গেছেন। গত ২০ জুন মজিবুরের স্ত্রী শামীমা রহমান শাম্মী ছোট ছেলেকে নিয়ে দুবাই চলে গেছেন। ছোট ছেলে মতিঝিল আইডিয়ালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। 


প্রতারণার আরও অভিযোগ

কাকরাইলের নির্মাণ সামাদ ট্রেড সেন্টারের সপ্তম তলায় ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অফিস ছিল মজিবুরের। সেই অফিসে পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে রসিদের মাধ্যমে শিশুদের অভিভাবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হতো। এঁদের একজন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর বাবা ৩ লাখ টাকা দেন মজিবুরকে। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের খরচ বাবদ এই ডোনেশন নেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি জেনেছেন, ওই পুরস্কার নিতে টাকা লাগে না। মজিবুরের সংগঠনটি ভুয়া।


রসিদ দিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়টি পিবিআইয়ের তদন্তেও উঠে এসেছে। পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই অফিস থেকে চাঁদাবাজি, চাকরির তদবির, বদলি-বাণিজ্যসহ অসৎ কার্যক্রম চালাতেন মজিবুর। তাঁর নামে গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অনেক ভুক্তভোগী।


এ ছাড়া মজিবুরের বিরুদ্ধে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে বাড়ি দখল, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর উপদেষ্টার নাম ব্যবহার করে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে একটি কোম্পানির কাছ থেকে নগদ ১০ লাখ টাকা ও চেকের মাধ্যমে মোটা টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।


কয়েক দিন আগে কাকরাইলের ওই ভবনে খোঁজ নিতে গেলে নিরাপত্তাকর্মী আমিনুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মজিবুর রহমানের অফিসে অনেক মানুষ আসত। কেউ কেউ শিশুদের নিয়ে আসত। গত বছরের শুরুর দিকে তিনি অফিস ছেড়ে দেন। এর আগে পুলিশ আসছিল। টাকা পাবে বলে অনেকে খুঁজে গেছে। তবে তিনি কোথায় আছেন আমরা জানি না।’


জানা যায়, শান্তিনগরের সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার সড়কের ৬৯-৭১ বাড়ির নিচতলায় ১১৭৫ স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে মজিবুর রহমানের। ২০০১ সালের দিকে ফ্ল্যাটটি কেনেন তিনি। বর্তমানে এর দাম প্রায় কোটি টাকা। গত শুক্রবার সেখানে গিয়ে মজিবুরের ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ দেখা যায়। বাড়ির ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বলেন, মজিবুর রহমানের এক ভাতিজা মাঝেমাঝে এসে দেখে যান। মজিবুরের পরিবার বিদেশে চলে গেছে। 


সংসদ নির্বাচনের জন্য গণসংযোগ

মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা ও কাজিরহাট থানা নিয়ে বরিশাল-৪ সংসদীয় আসন। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশায় গত তিনটি সংসদ নির্বাচনের আগে মজিবুর গণসংযোগ করেন। কাজিরহাটের আন্দারমান ইউনিয়নের বাসিন্দা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২১ সালের আগপর্যন্ত মজিবুর প্রতিবছর শীত ও ঈদের সময় এলাকায় এসে মানুষকে পোশাক দিতেন, পোস্টার দিতেন।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজিমপুর গ্রামে মজিবুরের ৪০ শতাংশের মতো জমি আছে। কোনো ঘর নেই। তাঁর বাবার নাম আফসার উদ্দিন হাওলাদার। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মজিবুর চতুর্থ। চার ভাই মারা গেছেন। বাড়িতে ভাইয়ের ছেলেরা থাকেন।


আন্দারমান ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ওয়াসিম শিকদার জানান, ‘শুনেছি মজিবুর দুবাই আছেন।’


শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার এইচ সাগর বলেন, মজিবুর একজন প্রতারক। তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য বলতে কিছু নেই। মানুষ ঠকিয়েছে। এখন পালিয়েছে। 


শেয়ার করুন