০১ অক্টোবর ২০২২, শনিবার, ০৩:৪৭:৪২ পূর্বাহ্ন
রাজশাহীতে দাদনের চড়াসুদে সর্বশান্ত কয়েক গ্রামের মানুষ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৬-২০২২
রাজশাহীতে দাদনের চড়াসুদে সর্বশান্ত কয়েক গ্রামের মানুষ

পান বরজ তৈরী করার জন্য ২০১৬ সালের ১৫ আগাস্ট স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা আশার আলো সমবায় সমিতি থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গনিপুর গ্রামের কৃষক সোরাব আলী। ছয় বছরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা সুদ ও জরিমানা নিয়েছেন। তার পরও পরিশোধ হয়নি তার এক লাখ টাকা। তার কাছে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি সমিতির লোকজনের।


সোরাব আলী বলেন, এক লাখ টাকা ঋনের বিপরীতে তাকে সুদ দিতে হয়েছে প্রতি সপ্তাহে দুই হাজার টাকা। কোন সপ্তাহে দিতে না পারলে আবার ২০০ টাকা জরিমানা ধরা হয়েছে। এক লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ছয় বছরের পাঁচ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে তার পরিশোধের জন্য সমিতির লোকজন ভয়ভিতি দেখাচ্ছে।


রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গনীপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে এমন অনুমোদনহীন শতাধিক সমবায় সমিতি। পাড়া-পাড়ায় গড়ে উঠা নামে বে-নামে এসব সমিতির মাধ্যমে চলছে কোটি কোটি টাকার দাদন বা ঋণের কারবার। স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণাধীন এসব অবৈধ সমিতির উচ্চ সুদের ঋণের জালে সর্বশান্ত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। ঋণ দিতে না পেরে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে অনেক পরিবার।




শিক্ষক স্বামীর চিকিৎসার জন্য ২০১৭ সালে আশার আলো এবং পদ্মা সঞ্চয় ও ঋণ সমবায় সমিতি থেকে ২ লাখ ২২ হাজার টাকা ঋণ নেয় আক্কেলপুর গ্রামের আসমানি বেগম। বর্তমানে তার ঘাড়ে ঝুলছে ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণের বোঝা। এর মধ্যে আশার আলো সমিতির খাতায় এক লাখ ২২ হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে পাওনা ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর পদ্মা সঞ্চয় ও ঋণ সমবায় সমিতি থেকে নেয়া এক লাখ টাকার বিপরীতে তাদের দাবি ছয় লাখ টাকা।


আসমানি বেগম বলেন, স্বামীর চিকিৎসার জন্য ঋণ নেয়া হয়েছিল। প্রথম দিকে নিয়মিত সুদ দেয়া হয়েছে। তিন বছর আগে স্বামী মারা গেছে। এর পর আর নিয়মিত দিতে পারিনি। তবে দুই সমিতির এখন দাবি করছে তার কাছে ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাবে।


তিনি আরও বলেন, সমিতির লোকজনের অত্যাচারে পালিয়ে পালিয়ে থাকি। বাড়িতে গেলেও বের হয়না। সমিতির লোকজন জানতে পারলে টাকার জন্য চাপ দেয় এবং ভয়ভীতি দেখায়।


রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে বাগমারা উপজেলার দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে লাল-কাল রং এর টিন সেডের আধা-পাকা ঘরটি আশার আলো সমবায় সমিতির কার্যালয়। সাইনবোর্ড হীন এই ঘরটি সারাদিন বন্ধ থাকলেও সন্ধ্যার পর সেখানে চলে লাখ লাখ টাকার ঋণ ও সুদ লেনদেনের কারবার।


এই গ্রামে এ ধারণে সাতটি সমিতি রয়েছে বলে জানান স্থানীয় এক বৃদ্ধ। এসব সমিতিতে কি হয় তা বললে গায়ের লোম একটিও থাকবে না দাবি করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বৃদ্ধ জানান, স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব সমিতি পরিচালনা করেন। তাই তাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।


দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রাম থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে রয়েছে আক্কেলপুর চৌরাস্তা মোড়। সেই মোড়ে বেশকিছু দোকান পাট রয়েছে। সেখানে রয়েছে পদ্মা সঞ্চয় ও ঋণ সমবায় সমিতি, বারনই ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ও জনসমস্টি উন্নয়ন সংস্থাসহ বেশ কয়েকটি সমিতির কার্যালয়। দিনে বন্ধ থাকলেও এসব সমিতির কার্যালয় খোলা হয় সন্ধ্যার পর। যাদের মধ্যে তিনটি কার্যালয়ে সমিতির সাইনবোর্ড রয়েছে। এই গ্রামে এ ধারনের ১০টি সমিতি গড়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয়রা।


সেখান থেকে কাচাঁ রাস্তা হয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে গনিপুর গ্রামে রয়েছে একটি ছোট্ট বাজার। সেই বাজারের নাম সাহেববাজার। সেখানে রয়েছে তিনটি চায়ের স্টল ও একটি পল্লী চিকিৎসকের ওষুধের দোকানসহ ১৮টি দোকান। যার মধ্যে ছয়টি মুদি দোকান বন্ধ।


পল্লী চিকিৎসক রহিদুল ইসলাম বলেন, সাহেববাজার এখন ফকির বাজারে পরিণত হয়েছে। এ বাজারের প্রায় সবাই দাদনের ঋণের জালে জড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমি নিজেও ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছিলাম। ঋণ মুক্ত হয়ে আমাকে দিতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। গ্রামের লোকজন না বুঝে ঋণ নিয়ে উচ্চ হারের সুদ দিতে গিয়ে সর্বোশান্ত হচ্ছেন। ঋণের সুদের টাকা দিতে এই বাজারে বন্ধ হয়ে গেছে ছয়টি দোকান।


তিনি আরও বলেন, সমিতির লোকজনের অত্যাচারে বর্তমানে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে রয়েছে গনিপুর, দক্ষিণ দৌলতপুর ও আক্কেলপুর গ্রামের প্রায় ২০ থেকে ২৫টি কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। পালানোর পর টাকার জন্য তাদের পরিবারের সদস্যদেরও হুমকি-ধামকি দিচ্ছে সমিতির লোকজন।


তিনি বলেন, আক্কেলপুর ও দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামেই গড়ে উঠেছে ১৭টি অবৈধ সমিতি। এর মধ্যে আক্কেলপুরে ১০ ও দক্ষিণ দৌলতপুরে ৭টি। এই দুই গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ জড়িয়ে পড়েছে এইসব অবৈধ সমিতির ঋণের জালে।


ঋণ দিয়ে উচ্চ হারে সুদ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে সংবাদ কর্মীদের উপর রেগে যান আক্কেলপুর মোড়ে গড়ে উঠা পদ্মা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির কর্ণধর আলাউদ্দিন। পরে তিনি তার সমিতির মাধ্যমে ঋণ কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে অস্বীকার করেন।


তিনি বলেন, আমার সমিতি অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এখনো অনুমোদন পায়নি। তাই ঋণ কার্যক্রম চালায় না। তবে কিছু লোক সমিতির সদস্য আছে। তারা কোরবানীর জন্য প্রতি সপ্তাহে সঞ্চয় জমা করছে। ঈদের আগে তারা টাকা তুলে নিয়ে কোরবানীর পশু কিনবে।


দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামের আশার আলো সমবায় সমিতি পরিচালনা করেন আখিদুল ও জাকিরুল ইসলাম। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি। আর একই এলাকার অর্জন সমবায় সমিতি নামের একটি সমিতি পরিচালনা করেন কলেজ শিক্ষক আব্দুল রাজ্জাক ও আব্দুল হাকিম এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম। এদের মধ্যে রাজ্জাক হাটকানপাড়া ডিগ্রী কলেজ এবং হাকিম মোহনগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক।


মুঠোফোনে হাকিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তিনি ফোন ধরেননি। তবে আব্দুল রাজ্জাক ফোন ধরলেও সাংবাদিক পরিচয় শুনে ঋণ কার্যক্রম বিষয়ে কোন কথা না বলেই লাইন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।


এদিকে, অনুমোদনহীন এসব সমিতির কার্যক্রম বন্ধ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে গত ৩১ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সমবায় অফিসারের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করেন গনিপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান নামের এক ভূক্তভোগি। এ অভিযোগের পর উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের পরিদর্শক মাইনুল ইসলাম তদন্ত করে এসব সমিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।


এর পর গত ২২ মার্চ আব্দুল মান্নান আবারও জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবার অভিযোগ দেন। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২৭ মার্চ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।


এ সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২ জুন রাতে বাগমারা থানা পুলিশ আক্কেলুপর গ্রামের অভিযান চালিয়ে ঋণ ও সুদ লেনদেনের সময় হাতে নাতে গ্রেপ্তার করে বারনই সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ শাহীন আলমকে। পরে সমিতির সভাপতি রাকিব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক জাকিরুল ইসলামসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। গনিপুর গ্রামের আশরাফুল ইসলাম এই মামলার বাদি হন। মামলায় সমিরি আরও ছয় সদস্যকেও আসামী করা হয়।


এ মামলা কেন্দ্র করে বাগমারা থানার ওসি মোস্তাক আহমেদের বিরুদ্ধে দাদন ব্যবসায়ী রাকিব হোসেন ও জাকিরুল ইসলাম গত ০৯ জুন রাজশাহী পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে অভিযোগ আনা হয় ওসি অর্থের বিনিময়ে তাদের হয়রানি করছেন। পরের দিন গত ১০ জুন এ অভিযোগের তদন্তে যান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তি। তার সঙ্গে ছিলেন বাগমারা থানার এসআই মানিক মিয়া ও এএসআই রাজু আহমেদ।


এই তদন্তের সময় দাদন কারবারিরা বাদি ও ভুক্তভোগিদের উপর হামলা চালায়। এ সময় লাঞ্ছিত করা হয় পুলিশ সদস্যদের। এতে তদন্ত কার্যক্রম পন্ড হয়ে যায়। এর ফলে ১৩ জুন তাদের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ভুক্তভোগিদের জবানবন্দি নেয়া হয়।


রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তি বলেন, দাদন কারিবারি ও ভুক্তভোগিদের দুটো পক্ষ হয়ে গেছে। দুই পক্ষের মধ্যে এলাকায় উত্তেজনা চলছে। তদন্ত গিয়ে দুপক্ষের উত্তেজনার কারণে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে ভুক্তভোগিদের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডেকে এনে তাদের জবানবন্দি গ্রহন করা হয়েছে।

শেয়ার করুন