এক দিনের ব্যবধানে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবাল। অল্প অল্প করে হাঁটাহাঁটি করতে পারছেন এবং খাওয়া-দাওয়াও করছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এই অবস্থায় গতকাল গাজীপুরের কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে তামিমকে। চিকিৎসকরা ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন তাকে। অবস্থার উন্নতি হলে পরিবারের সম্মতিতে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। সুস্থ হওয়ার পরে ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন তিনি। সংকট মুহূর্তে সকলে তার জন্য যেভাবে প্রার্থনা করেছেন, সেটিতে সিক্ত হয়েছেন তামিম।
সুস্থ হয়েই তামিম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, 'দিনটি শুরু করার সময় কি আমি জানতাম, আমার সাথে কী হতে যাচ্ছে? আল্লাহতাআলার অশেষ রহমত আর সকলের দোয়ায় আমি ফিরে এসেছি। আমার সৌভাগ্য, এই বিপদের সময়ে আমি পাশে কিছু অসাধারণ মানুষকে পেয়েছিলাম, যাদের বিচক্ষণতা ও আপ্রাণ প্রচেষ্টায় আমি এই সংকট কাটিয়ে ফিরে এসেছি।'
শঙ্কা রয়েছে এখনো
তামিম এই মুহূর্তে সুস্থ হয়ে উঠলেও শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। গতকাল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেছেন, 'আমরা এমন ক্ষেত্রে পাঁচ দিন পরে রোগীদের ছেড়ে দেই। তবে সপ্তাহখানেক ঘরের মধ্যে বিশ্রামের পরামর্শ দেই। এই সময়ে বাইরে যাওয়া যাবে না। ঘরের মধ্যেই হাঁটাচলা করতে হবে। তারপরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিকভাবে বাইরে বের হওয়া যাবে। শরীরের মধ্যে যেটি স্থাপন করা হয়েছে (রিং পরানো), তার সঙ্গে শরীরে মানিয়ে নিতে হবে। সেজন্য সময় দিতে হবে।
এখানে জোর করা যাবে না। তিন মাসের মধ্যে শরীর এই স্টেন্টকে (রিং) নিজের করে নিবে। এর ওপরে শরীর তার নিজস্ব সেলের প্রলেপ তৈরি করবে।' বঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, 'পথ খুলে গেছে। তবে পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণগুলো এখনো রয়ে গেছে, চর্বি জমে বন্ধ হওয়া। তার উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল রয়েছে। এই বিষয়গুলো না কমালে তার আবারও হতে পারে। পথ খুলে দেওয়া মানেই তার চিকিৎসা শেষ না। তামিমকে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, এটা বোনাস জীবন। সবকিছু মেনে চলতে হবে।'
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও জানাচ্ছে ঝুঁকির কথা
গতকাল দুপুরে তামিমকে দেখতে গাজীপুর গিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল-ক্লিনিক শাখা) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানসহ আরো অনেকে। সে সময়ে ডা. মো. আবু জাফর বলেছেন, 'সার্বিক অবস্থা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু যে প্রাথমিক পিসিআই হয়েছে, এটা একটা ফরেইন বডি, কখনো কখনো অ্যাকশন-রিঅ্যাকশন হতে পারে। যে রিংটা লাগানো হয়েছে, সেখানে সাময়িকভাবে কোনোভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমরা থম্বোসিস বলি, সেই ঝুঁকিটা রয়েছে।
যদিও পরিসংখ্যান খুবই কম, শঙ্কা কম। তবে ঝুঁকিটা রয়েছে। সেই ব্যাপারে উনার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি।' তিনি আরো বলেছিলেন, 'এই মুহূর্তে মুভ করাটা তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই জিনিসটা তামিম ইকবালের সঙ্গেও আলাপ করেছি। এটাই স্বাভাবিক সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা যেখানে আছে, সবাই সেখানেই যেতে চাইবে। তবে
তার জন্য যাওয়াটা কতটা নিরাপদ, সেটা আলাপ করেছি। যদিও এটা তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে আমাদের চিকিৎসকদের নির্দেশনা থাকবে সবসময়।'
সিপিআর যেভাবে কাজে লেগেছে
জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেছেন, 'যারা তাকে আধাঘণ্টা সিপিআর (কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন) দিয়েছেন (বুকে পাঞ্চ করা), সেটি না দিলে তার শরীরের কার্যক্রম ভালো থাকত না। শরীরের বাঁপাশের কার্যক্ষমতা বন্ধ হয়ে যেত। হয়তো ব্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এই সিপিআর ব্যাপারটি আমাদের স্কুল-কলেজে শেখানো উচিত। আগে তো স্কাউটে এগুলো শেখানো হতো। এখন সেভাবে দেখা যায় না।'
সিপিআরের গুরুত্ব নিয়ে ডা. আব্দুল ওয়াদুদ বলেছেন, 'সিপিআরের মাধ্যমে রোগীকে সাময়িকভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। তার পরে উপযুক্ত জায়গায় গেলে চিকিৎসকরা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার এক মিনিট পরে রোগী জ্ঞান হারায়। তিন মিনিট পরে অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো বন্ধ হওয়া শুরু করবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ব্রেন ও হৃদপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নয় মিনিট পরে বেঁচে ফেরার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এর মধ্যে সিপিআর শুরু করা গেলে কিছুটা হলেও আশা বেঁচে থাকে।'
সোমবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন তামিম। হৃদস্পন্দন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সে সময়ে ট্রেনার ইয়াকুব চৌধুরী ডালিম ও বিকেএসপির চিকিৎসকরা তামিমের বুকে পাঞ্চ করেছেন। বারবার পাঞ্চ করার কারণে হৃদক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। ৩২ মিনিট ধরে তারা সেটি করেছেন। চিকিৎসকরা পরের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কেপিজে হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট মনিরুজ্জামান মারুফ ও তার দল এরপরে রিং বসিয়েছেন।
তামিমকে দেখতে গেলেন সাকিবের বাবা-মা
জাতীয় দলের সতীর্থ ও বন্ধু সাকিব আল হাসান থেকে শুরু করে সকলে তামিমের জন্য প্রার্থনা করেছেন। সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন অঙ্গনে ভক্তরাও তার সুস্থতা কামনা করেছেন। গতকাল গাজীপুরে গিয়েছিলেন সাকিবের বাবা মাশরুর রেজা ও মা শিরীন আক্তার। তামিম দ্রুত সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরবেন এমন আশাবাদ তারা ব্যক্ত করেছেন। মাশরুর রেজা বলেছেন, 'তামিমের বাবা ইকবাল ভাই আমার খেলার বন্ধু। তামিমের মায়ের বিয়ের আগে তার বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। তামিমকে দেখলাম। তার জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করছি।'
কেপেজি হাসপাতাল পরিচালক ডা. রাজিব বলেছেন, 'তামিম সুস্থ আছেন, খাওয়া-দাওয়া করছেন, কথা বলছেন, উনার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আগামী তিন মাস ওনাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। উনি নিজেই চেকআপে থাকবেন। তার হার্ট কি আরো ভালোর দিকে যাচ্ছে, নাকি খারাপের দিকে যাচ্ছে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষায় থাকবেন। এরপর ডাক্তাররা তাকে খেলার অনুমতি দিলে তিনি খেলতে পারবেন, তবে এর আগে উনাকে নিয়মের মধ্যেই থাকতে হবে।'
মোহামেডানের কর্মকর্তা মাসুদুজ্জামান জানিয়েছেন, 'কেপিজেতে তামিমের খুব ভালো চিকিৎসা হয়েছে। পরিবারের সম্মতিতে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সকলে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেছেন, সেটি আমাদের খুব ভালো লেগেছে।'