০৫ জানুয়ারী ২০২৬, সোমবার, ০৩:৩৭:৩৩ অপরাহ্ন
ভাঙনের পথে ইয়েমেন, দক্ষিণাঞ্চলে গণভোটের ঘোষণা
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০১-২০২৬
ভাঙনের পথে ইয়েমেন, দক্ষিণাঞ্চলে গণভোটের ঘোষণা

ইয়েমেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আগামী দুই বছরের মধ্যে গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি)। এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন গত মাসে এসটিসির দখলে যাওয়া অঞ্চল পুনরুদ্ধারে সৌদি আরব সমর্থিত বাহিনী দক্ষিণ ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও গভীর হয়েছে।


শুক্রবার সৌদি সীমান্তঘেঁষা হাজরামাউত প্রদেশে সৌদি সমর্থিত গভর্নরের বাহিনী ও এসটিসির অনুগত যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। এসটিসির অভিযোগ, সৌদি আরব সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াদি হাজরামাউত ও হাজরামাউত মরুভূমি অঞ্চলের এসটিসি প্রধান মোহাম্মদ আব্দুলমালিক জানান, আল-খাশা এলাকার একটি ক্যাম্পে চালানো সাতটি বিমান হামলায় সাতজন নিহত এবং ২০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।


তবে হাজরামাউতের গভর্নর সালেম আল-খানবাশি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এসটিসির কাছ থেকে সামরিক ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ কোনো যুদ্ধ ঘোষণা নয়। তার ভাষায়, এটি দক্ষিণ ইয়েমেনের সামরিক স্থাপনাগুলোকে ‘শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে’ পুনরায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই অভিযান উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য নয়, বরং নিরাপত্তা রক্ষা এবং বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।’


সানায় অবস্থানরত আল–জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ আলাত্তাব জানান, শুক্রবার সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি এসটিসির অবস্থানগুলোতে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে তিনি বলেন, ‘সেখানে আসলে কী ঘটছে, সে বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত তথ্যের অপেক্ষায় আছি।’ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় এসটিসি এখনো তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে।


এর মধ্যেই শনিবার ভোরে সৌদি আরব সব পক্ষকে একটি আলোচনামূলক ফোরামে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় সংকটের ন্যায্য সমাধানের জন্য একটি ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা’ তৈরির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। সৌদি আরব জানায়, সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমির অনুরোধেই এই বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।


এর আগে এক টেলিভিশন ভাষণে এসটিসি প্রেসিডেন্ট আইদারুস আল-জুবাইদি দুই বছর মেয়াদি একটি অন্তর্বর্তী পর্যায় শুরুর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে দক্ষিণ ও উত্তর ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চান তারা। তবে একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, যদি কোনো সংলাপ শুরু না হয় কিংবা দক্ষিণ ইয়েমেন আবারও হামলার শিকার হয়, তবে তার দল ‘অবিলম্বে’ স্বাধীনতা ঘোষণা করবে। তার ভাষায়, ‘যদি এই আহ্বানে সাড়া না দেওয়া হয় অথবা দক্ষিণের মানুষ, তাদের ভূমি কিংবা বাহিনীর ওপর সামরিক হামলা চালানো হয়, তবে এই সাংবিধানিক ঘোষণাটি নির্ধারিত সময়ের আগেই সরাসরি কার্যকর হবে।’


দোহা থেকে আল–জাজিরার আলি হাশেম জানান, এই ঘোষণা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার কিংবা উত্তর ইয়েমেন ও রাজধানী সানা নিয়ন্ত্রণকারী হুতি আন্দোলনের কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। হাশেম বলেন, ‘এই ঘোষণা কার্যত ২৬ বছর ধরে টিকে থাকা ইয়েমেনের ঐক্য ও একক রাষ্ট্র কাঠামোর অবসান ঘটাবে। তাই এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুতিদের কাছেই একটি রেড লাইন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।’


এদিকে রিয়াদ ও তাদের সমর্থিত ইয়েমেন সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে এসটিসিকে অস্ত্র দেওয়ার এবং গত মাসে হাজরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশের কিছু অংশ দখলে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। সৌদি আরব সতর্ক করে বলেছে, এসব প্রদেশে এসটিসির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


শুক্রবার সংযুক্ত আরব আমিরাত নিশ্চিত করেছে, তাদের সর্বশেষ সেনাদল ইয়েমেন ত্যাগ করেছে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বানের এক সপ্তাহ পর এই ঘোষণা আসে। আমিরাতের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনীর উপস্থিতির সমাপ্তি ঘটিয়েছে।’ তিনি যোগ করেন, টেকসই শান্তির একমাত্র পথ হিসেবে তাদের দেশ সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত প্রক্রিয়ার পক্ষেই রয়েছে।


উল্লেখ্য, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং এসটিসি—তিন পক্ষই রিয়াদের নেতৃত্বাধীন সেই সামরিক জোটের অংশ, যা এক দশক আগে ইয়েমেনে হুতি আন্দোলনের বিরুদ্ধে গঠিত হয়েছিল। তবে এসটিসির বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং এর পেছনে আমিরাতের সমর্থনের অভিযোগ এই জোটের ভেতরেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।


সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি সতর্ক করে বলেছেন, দেশকে নতুন করে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষায়, ‘আমিরাতের সামরিক উপস্থিতি শেষ করার সিদ্ধান্ত জোটের সমন্বিত কাঠামোর মধ্যেই নেওয়া হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রের বাইরের কোনো শক্তিকে সমর্থন দেওয়ার পথ বন্ধ থাকে।’


এসটিসি জানিয়েছে, সৌদি আরব ও বর্তমান ইয়েমেন সরকার সরে যেতে বললেও তারা দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখবে। শুক্রবার ইয়েমেনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আল-জাবের অভিযোগ করেন, এসটিসি নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি সৌদি প্রতিনিধি দলবাহী একটি বিমানকে এডেনে নামার অনুমতি দেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরব উত্তেজনা নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু আইদারুস আল-জুবাইদির পক্ষ থেকে একগুঁয়েমি ও প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়েছে।’


এর জেরে বৃহস্পতিবার থেকে এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে, যা শুক্রবারও অব্যাহত ছিল। দুই পক্ষই এই অচলাবস্থার জন্য একে অপরকে দায়ী করছে। এসটিসি নিয়ন্ত্রিত পরিবহন মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিমান অবরোধের অভিযোগ তুললেও সৌদি সূত্র তা অস্বীকার করে জানিয়েছে, প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের নির্দেশেই সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটগুলোকে জেদ্দায় তল্লাশির জন্য নামতে বলা হয়েছে। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা সাবেত আল-আহমাদি আল–জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন, এসটিসির অর্থ পাচার ঠেকাতেই এডেন বিমানবন্দর থেকে নির্দিষ্ট রুটে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।


শেয়ার করুন