১৪ জানুয়ারী ২০২৬, বুধবার, ০১:১৫:৫২ পূর্বাহ্ন
নির্বাচন সামনে রেখে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় কঠোর হচ্ছে সরকার
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০১-২০২৬
নির্বাচন সামনে রেখে অন-অ্যারাইভাল ভিসায় কঠোর হচ্ছে সরকার

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশ, অবস্থান ও প্রস্থানের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে সরকার। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করতে বিদেশি নাগরিকদের স্পন্সরকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, হোটেল বা আবাসস্থল, আগমনের উদ্দেশ্য এবং ফিরতি টিকিটসহ সামগ্রিক গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও জারি করেছে সরকার। ঢাকা পোস্টের হাতে আসা নথি ও দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। তবে বৈধ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে যেন অযথা বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি বলেও মত দিয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ভিসা ব্যবস্থাপনায় একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন ও সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন চায় বিদেশি পর্যবেক্ষকরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করুন, তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় শর্ত ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় যা রয়েছে

নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন-অ্যারাইভাল ভিসাসহ সব ধরনের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘ভিসা নীতিমালা-২০০৬’ ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এ সময় বিদেশি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগমনী ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগমনের উদ্দেশ্য, স্পন্সরকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, আবাসস্থল এবং ফিরতি টিকিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো অনিয়ম বা সন্দেহ দেখা দিলে ভিসা প্রদান করা যাবে না।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ’ সিলযুক্ত ভিসা দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের সুপারিশে পর্যবেক্ষকদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা ফি মওকুফের সুযোগও রাখা হয়েছে।

নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সব স্থল ও নৌ-বন্দরে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা, আগমন ও প্রস্থানের বিস্তারিত তথ্য প্রতিদিন এক্সেল ফরম্যাটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন এই কড়াকড়ি

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, নির্বাচন ও গণভোটের মতো সংবেদনশীল সময়ে বিদেশি নাগরিকদের চলাচল নিয়ে বাড়তি সতর্কতা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরি। তিনি জানান, বিশেষ করে বিদেশি সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আগমনের ক্ষেত্রে পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

সাবেক আইজিপি ও কূটনীতিক নূর মোহাম্মদ বলেন, বিদেশি নাগরিকদের আগমন, অবস্থান ও প্রস্থানের তথ্য সমন্বিতভাবে নজরদারিতে না রাখলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি মনে করেন, আগমনী ভিসায় কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত যথাযথ।

অন্যদিকে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ভিসা নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান বা বাতিল করার পূর্ণ আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তে লিখিত রেকর্ড রাখা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি প্রশ্ন উঠলে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈধ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের কাজের সুযোগ বজায় রাখাই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই নির্বাচন ও গণভোট আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে।

শেয়ার করুন